সাংবাদিক বন্ধুর কথা আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। একথা সত্যি যে একটি আত্মগোপনকারী দল তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলেছিল। তাদের একটি সম্মেলনের জন্যে আমি একটি ছোট বক্তব্য লিখে দিয়েছিলাম। সেই বক্তব্যের মধ্যে তিনটি শ্লোগান ছিল। স্লোগান তিনটি হচ্ছে–আমার নাম তোমার নাম–ভিয়েতনাম। আমার বাড়ি তোমার বাড়ি–নকশালবাড়ি। আমার দেশ তোমার দেশ–বাংলাদেশ।
ত্রিদিব বাবুর প্রশ্ন শুনে আমার এই কথাগুলো মনে হলো। তবে আমি সরাসরি ত্রিদিব বাবুর প্রশ্নের জবাব দিলাম না। শুধু বললাম, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এখন একান্তই বাস্তব। এর পেছনে কারো ষড়যন্ত্র আছে কিনা তা একান্তই গৌণ।
এ ছিল ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের কথা। জুন মাসে কলকাতা থেকে আগরতলার ফিরে গিয়েছিলাম। জুলাইয়ের প্রথম দিকে গিয়েছিলাম বাংলাদেশে। আগস্টের শেষে বাংলাদেশ থেকে আগরতলায় ফিরেছি। অক্টোবরে আবার কোলকাতায়। আবার ক্রান্তি প্রেস। এবার ক্রান্তি প্রেসে অনেক বাংলাদেশের তরুণ দেখলাম। মুখ্যত এই তরুণরা এসেছে বরিশাল জেলা থেকে। বরিশালে এককালে আরএসপির শক্তিশালী সংগঠন ছিল। তরুণদের কাছে আরএসপির নাম পরিচিত। তাই ওরা খুঁজে খুঁজে আরএসপির প্রেসে এসেছে। আমার নাম করেছে। প্রেস থেকে ছাপিয়ে নিচ্ছে তাদের মুখপত্র।
১৯৭১ সালের সংগ্রামের কালে অসংখ্য সাপ্তাহিক বের হয়েছে সারা পশ্চিমবঙ্গে। এই পত্রিকাগুলো বের করত বাংলাদেশের তরুণরা। এতে মুক্তিযুদ্ধের খবর থাকত। বিপ্লবী বাংলাদেশসহ এ ধরনের অনেক সাপ্তাহিক ক্রান্তি প্রেসে ছাপা হতো। পত্রিকা ছাপার জন্যেই প্রতি সপ্তাহে তরুণদের ক্রান্তি প্রেসে আসতে হতো। আমার মনে হতো তারাই ছিল যুদ্ধের সঠিক সংবাদদাতা। তারা মুক্তিবাহিনীর তরুণদের মনের কথা জানত। শরণার্থীদের মনের কথা জানত। জানত বড় বড় নেতাদের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা।
বিপ্লবী বাংলাদেশের তরুণরা আসত বসিরহাটের টাকী থেকে। তাদের এলাকার সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মরহুম এমএ জলিল। জলিল সাহেবকে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তেমন পছন্দ করত না। পছন্দ করতেন না জেনারেল ওসমানী। বারবার তাঁকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জলিল সাহেব সরেননি। আমার যতদূর মনে হয় জলিল সাহেব কাউকে তোয়াক্কা করতেন না এবং তাঁর সেক্টরেই একমাত্র সংখ্যাধিক্য ছিল বামপন্থীদের। অন্যান্য সেক্টরে তখন বামপন্থীদের রিকুট প্রায় বন্ধ।
জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর। তিন মাসে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। এই তিন মাসের ঘটনার সঙ্গে আমার তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না। জুলাইয়ে আগরতলা থেকে ঢাকায় চলে যাই। ঢাকায় যাওয়ার লক্ষ্য ছিল বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা। যুদ্ধের জন্যে লোক সংগ্রহ, অর্থ সংগ্রহ এবং আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ করা। ভেবেছিলাম আগস্টের মধ্যে ভারতে ফিরতে পারব। কিন্তু তেমনটি হলো না। ফিরতে ফিরতে সেপ্টেম্বর। এই তিন মাসের মধ্যে মুজিববাহিনী গঠিত হয়েছে। গঠিত হয়েছে স্বাধীন বাংলা সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। আর ভারতে স্বাক্ষরিত হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি। ৭১-এর যুদ্ধের ইতিহাসে এ তিনটি ঘটনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
মুজিববাহিনী গঠন সম্পর্কে অনেক বিতর্ক আছে। অনেকের ধারণা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে এই বাহিনী গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনকে না জানিয়ে। তাজউদ্দিনকে নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। অনেকের ধারণা তিনি বামপন্থী। মার্কিন বিরোধী। তিনি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে তা নিয়ে ভারত সরকার চিন্তিত ছিল। ভারত সরকার কিছুতেই চাইবে না যে, তার পূর্বাঞ্চলে একটি বাম সরকার গঠন হোক।
এছাড়া প্রশ্ন ছিল পাকিস্তানে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে। পাকিস্তান থেকে শেখ সাহেব আদৌ ফিরবেন কি না, তা ছিল একান্তই অনিশ্চিত। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার বা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে শেখ সাহেব কী ভূমিকা নেবেন তাও ছিল বিতর্কিত। এছাড়া প্রশ্ন উঠেছিল শেখ সাহেব যদি আদৌ না ফিরে আসেন তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতির চিত্র কী হবে, নেতৃত্ব কে করবে। এদিকে বামপন্থী তাজউদ্দিন, অপরদিকে চরম কমিউনিস্ট বিরোধী তল্কালীন ছাত্রলীগের নেতৃত্ব। অনেকের ধারণা, এই বিবেচনা থেকেই ছাত্রলীগের নেতৃত্বে মুজিববাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। আগরতলায় সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে মুজিববাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনেছি। শুনেছি মুজিববাহিনীকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছে না। শুনেছি মুজিববাহিনীর দায়িত্ব হচ্ছে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজাকার, শান্তিবাহিনী এবং বামপন্থীদের নিশ্চিহ্ন করা। একথাটা এমনভাবে প্রচারিত ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক বামপন্থী নেতাকেই গা ঢাকা দিয়ে বাংলাদেশে ফিরতে হয়েছে। আমাদের দলের একমাত্র আমিই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সড়ক পথে দেশে ফিরেছি। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ভিন্নপথে বাংলাদেশে ঢুকতে হয়েছে। রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতে, মূলত মুজিববাহিনী গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশে বামপন্থীদের ঠেকাতে এবং আওয়ামী লীগের চিরাচরিত ডানপন্থী রাজনীতি অব্যাহত রাখার জন্যে। এ লক্ষ্যে ভারতের শাসক শ্রেণি ভারতে এই বাহিনী গড়ে তুলেছিল। আমি কলকাতায় গিয়ে একথাও শুনেছি যে, মুজিববাহিনী গঠনের বিরুদ্ধে তাজউদ্দিন প্রতিবাদ জানাবার পর নতুন রিক্রুট বন্ধ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে ভিন্নমত আছে ভিন্ন মহলের। দেশ স্বাধীন হওয়ার ২৬ বছর পরেও মুজিববাহিনী গঠন সম্পর্কে সঠিক কোনো মূল্যায়ন হয়েছে বলে আমার চোখে পড়েনি।
