এই পরাজয়ের পর সুভাষ চন্দ্র বসু ১৯৪০ সালের ১৯ মার্চ বিহারের রামগড়ে আপোষ বিরোধী সম্মেলন আহ্বান করেন। এই সম্মেরনে অনুশীলনের অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা যোগদান করেছিলেন। রামগড়ে অনুশীলনের বিপ্লবীরা নতুন দল গঠন করেন। দলের নাম Revolutionary Socialist Party R.S.P অর্থাৎ বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল। তবে দল গঠনের পর তাঁরা তেমন ভূমিকা রাখতে পারেননি। পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে নেতৃস্থানীয় সকল সদস্যই গ্রেফতার হয়ে যান এবং এক নাগাড়ে ৫ থেকে ৬ বছর জেলে থাকেন। অর্থাৎ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কারাগারে থাকতে হয়।
ছাত্রজীবনে বরিশাল জেলার কলসকাঠি স্কুলে পড়তাম। ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় কলসকাঠি ডাকঘর ও স্টিমার স্টেশন পুড়িয়ে দেয়া হয়। মুখ্যত এ আন্দোলন পরিচালনা করেছিল আরএসপি। তখন থেকে তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক। স্কুল জীবন শেষে বরিশালের বিএম কলেজে পড়তে এলাম। ১৯৪৫ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। কোলকাতায় মিছিলে পুলিশের গুলিতে মারা যায় রামেশ্বর বন্দোপাধ্যায়। সেও ছিল আরএসপির ছাত্র ফ্রন্টের সদস্য। যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরএসপির নেতারা মুক্তি পেতে থাকেন। তারা সবাই মুক্তি পান ১৯৫৬ সালে। তারপর ১৯৪৭ সাল। সংগঠন হিসেবে আরএসপির বিস্তার লাভের পূর্বেই দেশ ভাগ হয়ে যায়। অধিকাংশ নেতৃত্ব হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির হওয়ায় তারা প্রায় সকলেই দেশান্তর হয়। তাদের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয় ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে কলকাতায়। আমি ঢাকায় ফিরে গ্রেফতার হয়ে যাই ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে। জেলখানা থেকে বের হতে হতে ১৯৫৩ সাল। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার আমাকে পাসপোর্ট দেয়নি। তাই ৭১-এর পূর্বে কলকাতার আরএসপির কোনো বন্ধুর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।
দেখা হলো ১৯৭১ সালের এপ্রিলে। সীমান্ত পার হয়ে আগরতলা গিয়েছি। আগরতলা থেকে কলকাতা। আমার থাকার ব্যবস্থা হলো আরএসপির নেতাদের সঙ্গে ক্রান্তি প্রেসে। ক্রান্তি প্রেসে ঢুকে বুঝলাম বিপ্লব কথার কথা নয়। যাদের নিজের আচার আচরণে বিপ্লবের কোনো ছাপ নেই তাদের পক্ষে বিপ্লব করা সম্ভব নয়। ক্রান্তি প্রেসে ভাত খেতে গিয়ে বুঝতে পারলাম ভিন্ন জগতে এসেছি। খাবার সময় কমরেড মাখন পাল বললেন–কমরেড, খাবার পর থালা কিন্তু আপনাকেই ধুতে হবে। এখানে থালা ঘোয়ার জন্যে কোনো মানুষ নেই। সবাই এখানে স্বাবলম্বী। দেখলাম ত্রিদিব চৌধুরীসহ সকলেই থালা নিয়ে কলতলায় যাচ্ছেন। পরের দিন দেখলাম মাখন পাল ভোরবেলা উঠেই কাপড় কাঁচতে শুরু করেছেন। এখানে ক পড় পরিষ্কার করার সকল প্রক্রিয়া নিজেকে সম্পাদন করতে হবে। শুধুমাত্র ইস্ত্রি করার জন্যে কাপড় লন্ড্রিতে পাঠানো যায়। আমাদের ঘরে বাইরের কাউকে এক কাপ চা খাওয়াতে হলেও কোথা থেকে পয়সা আসবে তা আগে থেকে ঠিক করতে হয়। কারণ সাধারণ মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় রাজনৈতিক দল চলে। তাদের সাহায্য নিয়ে ব্যক্তিগত বিলাসিতার সুযোগ নেই। এ অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল প্রথমেই। প্রথমবারের অভিজ্ঞতা নিয়ে দ্বিতীয়বার ক্রান্তি প্রেসে গিয়ে আমার তেমন অসুবিধা হয়নি। অন্তত বুঝতে পেরেছি এ রাজনীতির টাকা যেনতেনভাবে খরচ করা যায় না।
এছাড়াও একটি ভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলাম এপ্রিল মাসে কলকাতায় গিয়ে। ক্রান্তি প্রেস থেকে বিকেলে লেনিন সরণিতে আরএসপির দফতরে গেলাম। সেখানে ত্রিদিব চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলতে হবে। কথায় কথায় শুনলাম বাংলাদেশের বিভিন্ন দলের নেতারা ইতোমধ্যে আরএসপি অফিসে এসেছেন। অনেক কথাবার্তা হয়েছে। তবে সেসব কথা তেমন এগোয়নি। তারা সকলে আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন বাংলাদেশের সঠিক পরিস্থিতি জানার জন্যে।
ত্রিদিব বাবুর কক্ষে ঢুকতেই তিনি আমাকে একটি অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের দেশে কি আত্মগোপনকারী চরমপন্থী কোনো দল আছে? গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকলেও এরা প্রকাশ্যে আসে না। এরা চরম জাতীয়তাবাদের শ্লোগান দেয়।
ত্রিদিব বাবুর কথা শুনে আমি খানিকটা বিস্মিত হলাম। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি আমাকে এ প্রশ্ন কেন করছেন? তিনি বললেন, অধুনা তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। চরম জাতীয়তাবাদী শ্লোগান দিয়ে দল উপদল গঠিত হচ্ছে। এরা কিছুতেই প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে রাজি নয়। আমাদের খবর হচ্ছে এ ধরনের দল উপদল মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী সিআইএ-এর সৃষ্টি। দেশে দেশে সমাজতন্ত্রের আন্দোলন ব্যাহত করার জন্যে সিআইএ-এর ভূমিকা দীর্ঘদিনের।
তখন বাংলাদেশের অনেক ঘটনাই আমার মনে পড়েছিল। আমাদের দল গঠনের পর আমরা প্রথম জনসভা করেছিলাম ১৯৭০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে। সভা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই খবর এল প্রেস ক্লাবের সামনে পাকিস্তান কাউন্সিলে বোমা হামলা হয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ পর দৈনিক মর্নিং নিউজের একজন রিপোর্টার আমাদের জনসভায় এল। আমাকে দূরে নিয়ে গেল। বলল, জনসভা ভেঙে দিয়ে কোথাও পালিয়ে যাও। কারণ বোমা হামলা করতে গিয়ে যারা ধরা পড়েছে তারা তোমার নাম বলেছে। সুতরাং তুমি গ্রেফতার হয়ে যেতে পার। আমরা তাড়াতাড়ি জনসভা শেষ করলাম। কিন্তু। আমি আত্মগোপন করলাম না।
