মাঝি রাজি হয়ে গেল। বলধাবাজার থেকে সিদ্দিকের বাড়ি এক ঘন্টা পথও নয়। কিন্তু সিদ্দিকের বাড়ি পর্যন্ত নৌকা পৌঁছাবে না। চারদিকে পাটক্ষেত। নৌকা থামিয়ে ওই পাটক্ষেতের মধ্যে দিয়ে সিদ্দিকের বাড়ি রওনা হলাম। কিছুদূর যেতেই সিদ্দিকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সে তো আমাদের দেখে অবাক। তার ধারণা আমি মুক্তিবাহিনীর মেজর জেনারেল। যে কোনো কারণেই হোক তাদের ওখানে এসেছি। একথা গোপন রাখতে হবে। সিদ্দিকের বাড়ি যাওয়ার পথে অনেকেই জিজ্ঞাসা করল আমাদের পরিচয়। সিদ্দিক বলল আমরা তাদের আলীর চরের আত্মীয়। এ পরিচয় দিয়েই সিদ্দিকের বাড়িতে ঢুকলাম।
সিদ্দিকের ঘর বলতে কিছু নেই। একখানা ঘরেই রান্না এবং শোওয়ার কাজ চলে। বাড়িতে স্ত্রী ও একটি বোন। ১৪/১৫ বছরের বোনটি অপূর্ব সুন্দরী। আমাদের দেখে তার আনন্দের সীমা নেই। মেয়েটি মুক্তিবাহিনীর লোকদের ভালোবাসে। আর আমার চিন্তা ছিল যাদের বাড়ি এলাম, তাদের খাবার সঙ্গতি আছে কিনা। সিদ্দিক নৌকা চালায়। সীমান্তে গোলাগুলি হওয়ার ফলে নৌকা চালানো বন্ধ। অর্থাৎ সিদ্দিকের কোনো রোজগার নেই। আমি শহিদুল্লাকে বাজারে পাঠালাম। চাল, ডাল, তেল সব কিনে আনবার জন্যে। এমনি করে প্রথম দিকে ভালোই কাটল। রাতে সিদ্দিকের বোন নাফিয়া চিৎকার করে। সীমান্তে গোলাগুলির শব্দ। ও বলে এবার থ্রি নট থ্রি তারপরে এলএমজি। তারপরে এইচএমজি। তারপরে মর্টার, তারপর পাঞ্জাবরা সব শেষ। নাফিয়া গুলির শব্দ শুনেই যন্ত্রের নাম বলতে পারে।
কিন্তু আমি কী করবো? ভারতে যেতে পারছি না। ঢাকা আসাও সহজ নয়। যেখানে আছি সেখানে প্রতিদিন সন্দেহ বাড়ছে। নাফিয়া বলছে, ভাই তুমি বাইরের লোক সামলাও, আমি ঘর সামলাব। চারদিকে ছড়িয়ে গেছে, মুক্তিবাহিনীর একজন জেনারেল এখানে আছে। তাই বিভিন্ন এলাকার তরুণরা আসছে সারা দিনরাত। আর ভয় পাচ্ছে মানুষ। বাড়ির লোক রাজি হচ্ছে না আমাকে রাখতে।
এমন সময় নাফিয়াদের এক আত্মীয় এল আড়জঙ্গল থেকে। আড়জঙ্গল সীমান্ত এলাকায়। আড়জঙ্গল পার হতে পারলে আগরতলা যাওয়া যাবে। কিন্তু আড়জঙ্গল যেতে মাঠের পর মাঠ পানি। পাকবাহিনীর ভয়ে নৌকা চলাচল বন্ধ। সাঁতার কেটে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। সাঁতার কেটে যেতে হলেও সীমান্তে একটি সেতু আছে। ওই সেতুতে রাজাকার পাহারা দেয়। সিদ্ধান্ত হলো, কৃষ্ণপক্ষের রাতে ওই সেতু পর্যন্ত সাঁতরে যাব। তারপর ডুব দিয়ে সেতু পার হব। কিন্তু রাজি হলো না শহিদুল্লাহ। সে কান্নাকাটি শুরু করল। তার কথা হচ্ছে ওখানে আপনি গুলিতে মারা গেলে লাশটা কোথায়ও নিয়ে যেতে পারব না। কেউ জানবে না আপনার মৃত্যুর কথা। আমরা কেউ ফিরতে পারব না। সুতরাং সে সিদ্ধান্ত বাতিল হলো।
এবার ঠিক হলো বুড়িচং থানার কাছে দিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিতে হবে। আমি আর সিদ্দিক রেকী করার জন্যে বের হরাম। ভাবখানা এমন আমরা কোথাও মেয়ে দেখতে যাচ্ছি। রাস্তায় এমন ধরনের কথা বলেই এগুচ্ছিলাম। বুড়িচং যাওয়ার আগেই বুঝলাম কাজ হবে না। কারণ বুড়িচং সীমান্তে সেদিন মুক্তিবাহিনী বারো জন পাকবাহিনীকে মেরে ফেলেছে। তাদের কবর দেয়া হচ্ছে বুড়িচং-এ। আমরা এবার বলধাবাজার হয়ে বাড়ি ফিরলাম। রাতে সিদ্ধান্ত নিলাম এবার ঢাকা ফিরতে হবে। ওই পথে আর সীমান্তে যাওয়া হচ্ছে না। আমরা চলে যাব। নাফিয়ার মোটেই ভালো লাগছিল না। তাই সে ঘুমে থাকতে ভোর রাতেই আমরা ঘর থেকে বের হলাম। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। আমাদের কাছে কোনো ছাতা নেই। সিদ্দিক আমাদের গোমতীর পাড় পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেল। বলে গেল নাফিয়ার কথা। সে কাহিনীতে পড়ে আসছি।
কলকাতায় এসে বিপদে পড়ে গেলাম। আগেই লিখেছি কলকাতা আগরতলা নয়। আগরতলার পথে সারাদিন মুক্তিযোদ্ধাদের দেখা যায়। তাদের সঙ্গে কথা বলা যায়। বাংলাদেশের খবর পাওয়া যায়। খবর পাওয়া যায় ঢাকা শহরে। কলকাতায় সে সুযোগ নেই। প্রথম সংবাদপত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। নইলে যেতে হয় মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে। সাতক্ষীরা সীমান্তে ৯ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর। সেখানে গেলে খবর পাওয়া যায়। প্রতিদিন মুক্তিবাহিনীর এলাকা থেকে কোলকাতার তরুণরা আসে। আমি ৩৭ নম্বর রিপন স্ট্রিটে ক্রান্তি প্রেসে থাকি। ক্রান্তি প্রেস থেকে আরএসপির মুখপত্র গণবার্তা প্রকাশিত হয়। ওই প্রেসের ভবনেই আরএসপির কেন্দ্রীয় নেতারা থাকেন। সর্বভারতীয় নেতাদের মধ্যে আছেন আরএসপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক কমরেড ত্রিদিব চৌধুরী, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক কমরেড মাখল লাল, কেন্দ্রীয় নেতা ননী ভট্টাচার্য, মৃন্ময় চক্রবর্তী, প্রধান নেতা মনি চক্রবর্তী প্রমুখ। এরা এক সময় সকলেই অনুশীলন সমিতির সদস্য ছিলেন। জেলখানায় তারা মার্কস ও লেনিনের বই পাঠ করেন এবং সাম্যবাদে দীক্ষিত হন। কিন্তু স্ট্যালিনের নেতৃত্ব সম্পর্কে তাদের দ্বিমত ছিল। তারা মনে করতেন স্ট্যালিনের পথে ভারতবর্ষে বিপ্লব করা যাবে না। ত্রিশের দশকে জেলখানায় থাকতেই তারা নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। এঁরা তখনো অনুশীলন সমিতির সদস্য হলেও প্লাটফর্ম হিসেবে কংগ্রেসের কাজ করতেন।
ত্রিশ দশকের শেষ দিকে কংগ্রেসের মহাত্মা গান্ধী বনাম নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর বিরোধ দেখা দেয়। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পথে। সুভাষ চন্দ্র বসু বলেছিলেন, যুদ্ধের সুযোগে ব্রিটিশকে আঘাত করতে হবে। কংগ্রেসের অন্যান্য নেতৃত্ব রাজি হলেন না। কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত গান্ধীর প্রার্থীকে হারিয়ে সুভাষ বস জয়লাভ করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন নিয়ে সুভাষ বসুর সঙ্গে গান্ধী গ্রুপের আবার মতান্তর হয়। এবার সুভাষ বসু ভোটে পরাজিত হন। সুভাষ বসুকে একমাত্র সমর্থন করেন ফরোয়ার্ড ব্লক এবং অনুশীলন সমিতির সদস্যরা (যারা পরবর্তীকালে আরএসপি গঠন করেন)। ভোটে নিরপেক্ষ থাকে জয় প্রকাশের সিএসপি ও কমিউনিস্ট পার্টি।
