শহিদুল্লাহ ও মাঝি নৌকায় ফিরে এলে আমি দীঘিরপাড় বাজারে গেলাম। বাজারের পুলের কাছে একটি রেস্টুরেন্ট আছে। ওই রেস্টুরেন্টের মালিক মনে হয় আমাকে চিনত। রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই জিজ্ঞাসা করলো স্যার কোনো গাইড লাগবো কিনা। একা কী করে যাবেন। আমি বললাম, একজন গাইড আমার প্রয়োজন। শেষ রাতে যেন গাইড আমার নৌকায় যায়। ওই গাইডকে নিয়ে আমাকে বলধাবাজার যেতে হবে।
ভোররাতে গাইড এসে হাজির। গাইডের নাম ইয়াকুব। বাড়ি ঘোষপাতি। শেষরাতেই আমরা নৌকা হতে উপরে উঠে যাত্রা শুরু করলাম। দেখলাম মাঝির চোখে জল। সে জানে না আমি কোথায় যাব। মাঝি ইয়াকুবকে বলল, আমি নাকি একেবারে সাক্ষাৎ আল্লাহর ওলি। আমাকে যেন সাবধানে নিয়ে যাওয়া হয়।
যাত্রা শুরুতেই বৃষ্টি। আমাদের কাছে কোনো ছাতা নেই। আমরা খালপাড় দিয়ে ছুটছি। দেখছি অসংখ্য মুক্তিবাহিনীর লোক রাইফেল মেশিনগান নিয়ে নৌকায় দীঘিরপাড়ের দিকে যাচ্ছে। তাদেরও ছাতা নেই। মাথায় বড় মানকচুর পাতা। এসময় যাওয়ার পথে আমাদের কিছু নাম মুখস্থ করে যেতে হলো। কারণ রাস্তায় যে কেউ আমাদের গ্রাম পরিচয় জিজ্ঞাসা করতে পারে। সঠিক পরিচয় দিতে না পারলে বিপদ অনিবার্য। তাই প্রথম নাম মুখস্থ করেছিলাম ফুলতলির খালেক সরকারের। ফুলতলির পর কংসনগর। কংসনগরের পর গোমতি নদী। গোমতির ওপারে চণ্ডীপুর। সেখান থেকে বলধাবাজার। তাই পরিচয় দেওয়ার তেমন অসুবিধা ছিল না। কংসনগরে গোমতির ফেরি। ফেরিওয়ালা ছাড়া কেউ নেই। ফেরিতে আমরা মাত্র দুজন যাত্রী। স্বাধীন বাংলা বেতারে চরমপত্র শোনানো হচ্ছে। শুনেছিলাম আগের দিন ওই ফেরিতে পাকবাহিনী হানা দিয়েছিল। মারা গিয়েছিল অনেক। তাই কৌতূহলও ছিল এপথে যাবার। ফেরিওয়ালা বলল, তেমন কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি। মাত্র তিনজন আহত হয়েছে।
চণ্ডীপুরে এসে বিপদে পড়ে গেলাম। চারদিকে পানি। হাঁটাপথে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। চণ্ডীপুর থেকে নৌকা যাচ্ছে বলধাবাজার। নৌকার মাঝি সিদ্দিক ও আলাউদ্দিন। কিন্তু নৌকা নিয়ে বেশি দূর এগুনো গেল না। দেখলাম বলধাবাজারের দিক থেকে নৌকা ফিরে আসছে। তারা বলছে ওপথে যাওয়া যাবে না। ভারতে যাবার শেষ পথ পাকিস্তানিরা বন্ধ করে দিয়েছে। মুক্তিবাহিনীরা আটকা পড়ে গেছে। গোলাগুলি হচ্ছে। আপনারা সামনে যেতে পারবেন না।
কিন্তু আমার উপায় ছিল না। তখন বেলা দশটা বাজে। আমাকে চারটার আগে উদয়পুর পৌঁছতে হবে। উদয়পুরে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আছে। কিন্তু মাঝি যেতে নারাজ। বলধাবাজারে গিয়ে ভিন্ন নৌকা নিলাম। বললাম, যত টাকা লাগে সীমান্তে যেতে হবে। কিন্তু কিছুদূর যেতেই বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু হলো। নৌকার মাঝি কিছুতেই এগুতে রাজি নয়। শহিদুল্লাহ কান্নাকাটি শুরু করেছে। ইয়াকুবও যেতে রাজি নয়। এমনি করে নাঘির-এ পৌঁছলাম। একদল মুক্তিবাহিনীর ছেলে এল। ওরা আমাকে কিছুতেই এগুতে দিবে না। ওরা কেউ আমাকে চিনে না। তবুও আমার নৌকা ফিরিয়ে দিল।
নৌকা ফিরে এল বলধাবাজার। কিন্তু কোথায় যাব? এ এলাকায় কাউকে চিনি না। কিছুদূরে একটি স্কুলে কিছু হিন্দু শরণার্থী আছে। আর সব দিকে চুপচাপ। পথে এক বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা হলো। বৃদ্ধ বলল, বাবা কোথায় যাবে? সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আজকেতো যেতে পারবে না। তোমরা আজকে আমার বাড়িতে থাকবে। কাল ভোরে চলে যাবে।
বুড়োর বাড়িতে আশ্রয় পেলাম। সন্ধ্যার পরে ছোট চিংড়ি ভাজা ও ভাত বুড়ো দিয়ে গেল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর চমকে গেলাম একটি পোস্টার দেখে। ও বাড়ির চালায় একটি পোস্টারে লেখা আছে, যা করে আল্লায় ভোট দিবো পাল্লায়। এক খাটে আমি আর শহিদুল্লাহ শুয়ে আছি। আমাদের কাছে একটি কালো ব্যাগ। মনে হলো শহিদুল্লাহ ভয়ে ঘুমিয়ে গেছে। হঠাৎ রাত ১২টার দিকে চারজন যুবক আমাদের ঘরে এসে ঢুকল। তারা কর্কষ ভাষায় জিজ্ঞাসা করল আপনারা কোথায় যাবেন? আমি বললাম, আপনারা নিশ্চয়ই জানেন আমরা কোথায় যাব। ওরা বলল, এ মুহূর্তে আপনারা ঘর থেকে বেরিয়ে যান। কারণ আমাদের মেহমান আছে। আমি বললাম, আমরাও আপনাদের মেহমান। আর এ কথাগুলো আপনাদের সন্ধ্যাবেলায় বলা উচিত ছিল। এই দুপুররাতে এখান থেকে আমরা কোথাও যাব না।
ওই চার যুবকের সঙ্গে সেই বৃদ্ধও দাঁড়িয়ে ছিল। আর হাতে ছিল একটি কেরোসিনের ল্যাম্প। তিনি ইশারায় আমাকে বাইরে ডেকে নিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, আপনি বুঝতে পারছেন না, তারা জামায়াতের লোক। আপনাদের বাইরে নিতে পারলে খুন করে ফেলবে। আপনারা এখান থেকে বেরিয়ে আসুন। আমি আপনাদের সঙ্গে নিয়ে যাব। আমি ও শহিদুল্লাহ বুড়োকে অনুসরণ করলাম। বৃদ্ধ এক কৌশল করল। সে বেশ কিছুক্ষণ চারদিকে আমাদের ঘোরাল। পরবর্তীকালে তার নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল। তার দেয়াল ঘরের একপাশে কিছু কাঠ ছিল। সেই কাঠ সরিয়ে নিয়ে আমাদের একটি পাটি বিছিয়ে দিল। বলল, রাত শেষ হওয়ার আগে এখান থেকে চলে যাবেন। আমাদের ঘুম হলো না। রাত চারটার দিকে উঠে পড়লাম। বুড়োর সঙ্গে কথা না বলেই বলধাবাজারে এলাম। কিন্তু কোথায় যাব? আমাদের একমাত্র চেনা আগের দিনের নৌকার মাঝি সিদ্দিক ও আলাউদ্দিন সিদ্দিকের বাড়ি চণ্ডীপুরে। সে বাড়িও আমরা চিনি না। বলধাবাজারে এক মাঝিকে সিদ্দিকের বাড়ির কথা জিজ্ঞাসা করলাম। বললাম, আমাদের সিদ্দিকের বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে।
