তবে আমার পক্ষে দিল্লি যাওয়ার কোনো প্রশ্ন ওঠে না। ভারতের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আমি চুনোপুটি মাত্র। আমি বড়জোর আগরতলায় বা কোলকাতায় নেতাদের বলতে পারি। কিন্তু নিজেই বিশ্বাস করি না যে, ভারতীয় বাহিনীকে বাংলাদেশের মানুষ বেশিদিন মেনে নেবে। তবুও দেখলাম ঢাকায় যেন ভারতীয় বাহিনীর জন্যে উন্মাদনা। সবাই ভারতীয় বাহিনীর জন্যে উন্মুখ।
এ পরিস্থিতিতে ত্রিপুরায় যেতে হবে। কিন্তু কী করে যাব। এবার সড়ক পথে যাওয়া যাবে না। সর্বত্রই পাকিস্তানি বাহিনী। রাজাকার, আলবদর শান্তিবাহিনীর লোক। ঢাকা থেকে বের হওয়া খুবই কষ্ট। ঠিক করলাম সেই পুরনো পথে বেলতলী, গৌরীপুর হয়ে যাব। বিকেল ২টায় লক্ষ্মীপুর নামে একটি লঞ্চ মাছুয়াখালী যায়। মাছুয়াখালী লঞ্চে বেলতলী নামব। বেলতলীতে আবুল হোসেনের বাড়ি। আবার আবুল হোসেনের বাড়ি যাব। সেখানে রাত থেকে ভোর বেরায় নৌকায় গৌরীপুর। সেখান থেকে নৌকায় দীঘিরপাড়। দীঘিরপাড়ে রাত কাটাব। পরের দিন হেঁটে সীমান্ত যাব। সীমান্ত থেকে আগরতলার উদয়পুর।
কিন্তু ঢাকার সদরঘাট টার্মিনাল থেকে লঞ্চে উঠতে গিয়ে চমকে গেলাম। দেখলাম বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর আর ফজল শাহাবুদ্দিন টার্মিনালে দাঁড়িয়ে। তাদের সঙ্গে বিরাট দাড়িওয়ালা কবি হাসান হাফিজুর রহমান। তিনিও আমার লঞ্চে যাচ্ছেন। তারা কেউ আমাকে চিনতে পারলেন না। লঞ্চে উঠে আমি দু’পয়সার বাদাম কিনলাম। চুপচাপ বসে থাকলাম বয়লারের কাছে। কিছুক্ষণ পর হাসান হাফিজুরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম তিনি যেন কাঁদছেন। জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন আছেন। তিনি আমাকে দেখে মলিন হাসি হাসলেন। বুঝলাম তিনি ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন। তাঁর দাড়ি হিন্দু সন্ন্যাসীর মতো। বললাম, আপনার আমার মতো সুন্নত দাড়ি করা উচিত ছিল। এ ধরনের দাড়ি নিয়ে ধরা পড়ে যাবেন। কোথায় যাবেন আপনি?
এমন সময় তাঁর গাইড আমার কাছে এলো। মনে হলো তারা সীমান্তের ওপারে যাচ্ছেন না। কাছাকাছি কোথাও যাবেন। আমি বললাম প্রয়োজন হলে আমার সঙ্গে যেতে পারেন। আমি সীমান্তের ওপারে যাব। হাসান সাহেবের গাইড আমার পরিচয় পেয়ে ঘাবড়ে গেলেন। তার বক্তব্য হলো, একে তো হাসান হাফিজুর রহমান তার ওপর নির্মল সেন যুক্ত হলে আর উপায় নেই। তাঁরা কালারবাজার নেমে গেলেন।
আমার সঙ্গে তখন শহিদুল্লাহ। আমরা সন্ধ্যার দিকে বেলতলী নামলাম। নৌকায় আবুল হোসেনের বাড়িতে গেলাম। কিন্তু আবুল হোসেন বাড়িতে নেই। আবুল হোসেন সালিশি করতে ছেঙ্গারচর গেছেন। রাতে ফিরবেন না। আমরা বিব্রত হলাম। কিন্তু উপায় আর নেই। আমাকে কিছুটা চেনেন আবুল হোসেনের পিতা। ইতোপূর্বে একবার ওই বাড়িতে গেছি। তিনি বললেন, বাইরের ঘরে শুয়ে থাক। ও বাড়িতে অসংখ্য লোকের ভিড়। কে কোথায় থাকবে, কে কোথায় ঘুমাবে কেউ জানে না। গভীর রাতে আবুল হোসেনের পিতা আমার ঘুম ভাঙালেন। তাঁর হাতে থালা ভর্তি ভাত আর ইলিশ মাছের ঝোল। বললেন, বাবা কত লোককে খাওয়াব। তুমি কার ছেলে জানি না। কোথায় কোনদিন মারা যাবে কেউ জানবে না। বাবা, তুমি বাড়ি ফিরে যাও। সেদিন গভীর রাতে আমার চোখের জল নেমেছিল। সারা জনম বাপ তাড়ানো মা খেদানো ছেলে হিসেবে ঘুরে বেড়িয়েছি। কেউ কোনোদিন আমাকে এমন কথা বলেনি।
ভোরে ওই বুড়ো মানুষটা আমাকে নৌকা করে দিলেন। আমি আর শহিদুল্লাহ নৌকায় গৌরীপুর রওনা দিলাম। আজকের সড়ক পথে সে গৌরীপুর আর সেদিনের গৌরীপুর নয়। তখন বেলতলী থেকে নদী পথে পূর্বে গিয়ে ডানে মাঠে ওঠা যেত। মাঠে তখন জল ছিল। অনেক দূর ঘুরে ঢাকা, কুমিল্লা সড়কের কোনো একটি সেতুর নিচে দিয়ে নৌকায় যেতে হতো। সতর্ক থাকতে হতো ওই সেতুটি কোনো রাজাকার পাহারা দিচ্ছে কিনা।
চারদিকে ধান গাছ। মাঝখানে নৌকায় চলা ডাঙ্গা। সারাটা দেশ যেন নিস্তব্ধ। সড়কে গাড়ি দেখা যায় না। মাঝে মাঝে দু-একটা নৌকা। দূরে দূরে বিদ্যতের খুঁটি। বিদ্যুতের খুঁটির দিকে তাকালে মন খারাপ হয়ে যায়। ভাবি ওই খুঁটিগুলো এখনো অক্ষত কেন। কেন মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা ওই খুঁটিগুলো উপড়ে ফেলেনি। সে এক অদ্ভুত পরিবেশ। মাঝে মাঝে বিপদ হতো নৌকার মাঝিদের নিয়ে। কেউ সন্দেহ করত। কেউ আবার ভালোবাসতো। এই সন্দেহ আর ভালোবাসার মধ্যে একদিন প্রায় ধরা পড়ে গেলাম গৌরীপুর।
গৌরীপুরে শহিদুল্লাহ ভাত কিনতে নেমেছিল। আমরা একটি নতুন নৌকা করেছিলাম। মনে হলো মাঝি কিছুটা ধর্মভিরু। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ শহিদুল্লাহর কোনো দেখা নেই। এক সময় শহিদুল্লাহ হাঁপাতে হাঁপাতে এল। গৌরীপুর বাজার তখন রাজাকারে ভরা। শহিদুল্লাহ ভোলার ভাষায় কথা বলে। তাই তাকে সন্দেহ করে দোকানদার জেরা শুরু করেন দেন। শহিদুল্লাহ ভাত না কিনেই চলে আসে। অন্য দোকান থেকে কিছু কলা ও রুটি কিনে নিয়ে নৌকায় ফিরে আসে। অর্থাৎ সেদিন আমাদের আর ভাত মিলল না।
নৌকায় উঠে মনে হলো, আমাদের মাঝিও পাকিস্তানপন্থী। তবে আমার দাড়ি ও লুঙ্গি দেখে সে বেশ খানিকটা আশ্বস্ত। আমি তার সঙ্গে ধর্ম নিয়ে কথা শুরু করে দিলাম। আমরা কখনো খাল, কখনো বিলের মধ্য দিয়ে চলছি। অসংখ্য নৌকা চলাচল করছে ওই পথে। কেউই সড়ক পথে সামরিক বাহিনীর ভয়ে যাই না। চারদিকে মাঠ আর মাঠ। কোথাও ধান, কোথাও শাপলা। কোথাও আবার জেলেরা মাছ ধরছে। আমি মাঝির সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছি। তাকে কলা ও রুটি খাওয়ালাম। বিকেল দিকে মনে হলো, মাঝি মানুষ ও আল্লাহর খাঁটি বান্দা। সন্ধ্যার দিকে দীঘিরপাড় বাজারে পৌঁছলাম। দীঘিরপাড় বাজারে তখন শত শত মুক্তিযোদ্ধা। দূর-দূরান্ত থেকে তারা সন্ধ্যার দিকে এই বাজারে আসে। তারপর বিভিন্ন এলাকায় অপারেশনে চলে যায়। শহিদুল্লাহকে বললাম, মাঝিকে নিয়ে দীঘিরপাড় বাজারে যেতে। মাঝিকে মাছ মাংস দুধ সব কিছু খাওয়াতে। কারণ তাকে হাতে রাখতে হবে। তার নৌকায় রাত কাটাতে হবে। সকালবেলা ছাড়া যাবার কোনো পথ নেই। শুনেছি কংসনগর, বলধাবাজার হয়ে সীমান্ত যাওয়া যায়। ওই পথ আদৌ আমার চেনা নেই। ওই পথ যেতে হলে গাইড প্রয়োজন।
