দেখলাম মোদাব্বের সাহেব বড় ব্যস্ত। তিনি রেড ক্রসের নেতা। রেড ক্রসের সব সহায়-সম্পদ মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে দিচ্ছেন। আমাকে বললেন, মানিকগঞ্জের ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীকে একটি স্পিড বোট দিয়েছেন। তার এলাকা প্রায় মুক্ত। মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাচ্ছিলেন আর বলছিলেন পাকিস্তানিদের নির্যাতনের কথা। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাচ্ছিলাম। মাত্র কয়েক বছর আগে রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকারী নিয়ে তাঁর সঙ্গে তুমুল বিতর্ক হতো। তিনি বলতেন–নির্মল তোমার যুক্তি আমি মানি। কিন্তু জীবন সায়াহ্নে এসে সবকিছু মেনে নিতে বড় কষ্ট হয়। তুমি বিশ্বাস কর আর নাই কর পাকিস্তান আমাদের স্বপ্ন ভেঙে খান খান করে গেছে। আজকের মোহাম্মদ মোদাব্বের মুক্তিযুদ্ধের এক বড় সহায়ক। প্রকৃতপক্ষে তিনি এক বড় মুক্তিযোদ্ধা।
মগবাজারের বাসায় এক রাত থেকে রায়েরবাজার বাসায় ফিরলাম। সেখানে তখন আর এক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। মে মাসে নরসিংদীর কাজী হাতেম আলী আমার সঙ্গে ভারতে গিয়েছিল। আমি জুলাই মাসে ফিরলাম। কিন্তু সে ফিরল না। হাতেম আলীর বাবা মা কারওয়ানবাজার থাকেন। তাদের ধারণা হাতেম আলী মারা গেছে। কিন্তু আমি কী করে প্রমাণ করব হাতেম আলী মারা যায়নি। তাদের দাবি হচ্ছে আমাকে হাতেম আলীর বাড়িতে যেতে হবে। তার বাবা মার সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমি না গেলে কেউ বিশ্বাস করবে না হাতেম আলী বেঁচে আছে। আমার উপায় ছিল না। একদিন ভোরে মোহাম্মদ হোসেনের হোভার পেছনে বসলাম। চলে গেলাম কারওয়ানবাজার। কিছুক্ষণ হাতেম আলীর বাবা মা ভাই বোনদের সঙ্গে আলাপ করে ফিরলাম রায়েরবাজার। আমার এ যাওয়া আসা মোহাম্মদ হোসেনকে বিপদে ফেলল। আমি চলে যাবার পর সেনাবাহিনী দু’বার তার বাড়ি ঘেরাও করেছিল। কিন্তু মোহাম্মদ হোসেন এক সময় সামরিক বাহিনীতে ছিল বলে সে যাত্রায় বেঁচে গেল।
২৯ জুলাই আবার ভারত যেতে হবে। আমার সঙ্গে চিরপুরাতন শহিদুল্লাহ। শহিদুল্লাহ বলল, স্যার আপনার জিন্না টুপিটা ফেলে দেন। একটা কিস্তি টুপি পরেন। জিন্না টুপি পরলে আপনাকে বিহারী বিহারী লাগে। সেদিন নবাবগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসার সময় সবাই আমাকে বিহারী ভেবেছে। লঞ্চ কেরানীগঞ্জ পৌঁছার আগেই সবাই ভয়ে ভয়ে নেমে গেছে। এবার ওই টুপি পরে গেলে বিহারী হিসেবেই হয়তো আমরা মার খাব।
এবার ঢাকা থেকে কোন পথে যাব? কাজী হাতেম আলীর বাসার সমস্যা শেষ করেছি। মোদাব্বের সাহেবের বাসার চিত্র ভাসছে চোখের সামনে। বড় ছেলে হোসেন জামাল লাকী পাকিস্তান টেলিভিশনে চাকরি করে। আটকা পড়েছে সপরিবারে করাচিতে। সেজ ছেলে হোসেন ফারুক সানি চাকরি করে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে। সেও সপরিবারে আটকা পড়েছে পাকিস্তানে। বাড়িতে দুই ছেলে হ্যাপি-মন্টি। কন্যা শিরিন। এ নিয়েই তাদের সংসার। পাকিস্তানে ছেলেদের কথা ভাববেন, না মুক্তিবাহিনীর কথা ভাববেন। এ চিন্তা তাঁকে বিব্রত করছে। তখন ঢাকায় এ ধরনের অসংখ্য বিভক্ত পরিবার ছিল। তাদের ঝুঁকি ছিল দু’ধরনের। একদিকে দেশ স্বাধীন করবার সংগ্রাম। আর অন্যদিকে পাকিস্তানে আটকা পড়া সন্তান-সন্ততিদের জীবন হানি হওয়ার আশঙ্কা। যারা ঢাকায় ছিলেন না বা ৭১ সালে ঢাকায় আসেননি তারা এ পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পারবেন না। যারা কলকাতায় ছিলেন তাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় সে কালের এ মানুষগুলোর নিত্যদিনের কাহিনী। এদের অনেকে ঘৃণা করেছে, সমালোচনা করেছে, সাপ সাপান্ত করেছে। কিন্তু বুঝতে চায়নি এদের অবস্থা। এরা তখন ঢাকা ফরিদপুর বরিশাল বা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে না থাকলে আমাদের এখানে এসে আশ্রয় পাওয়া সম্ভব হতো না। মুক্তিযোদ্ধারা বিপর্যস্ত হতে প্রতি পদে পদে। আমরা যারা সেদিন শত ঝুঁকি নিয়েও ঢাকা এসেছিলাম একমাত্র আমাদের পক্ষেই সম্ভব ছিল সেদিনের বাস্তবতা বোঝা।
এ পরিস্থিতিতে সকলের এক কথা, কবে ভারতীয় সৈন্য আসবে। কেন ইন্দিরা গান্ধী কিছু করছেন না। ইন্দিরা গান্ধী কি আমাদের মারতে চান? কী চান তিনি। মোহাম্মদ হোসেনও বললেন, আপনি কলকাতায় যাবেন। দিল্লি যাকেন। শ্রীমতি গান্ধীর সঙ্গে কথা বলবেন। বলবেন, বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করতে। নইলে আমরা কেউ বাঁচব না।
আমি ভাবছিলাম ভিন্ন কথা। অনেক দুঃখে আমার হাসি পাচ্ছিল। অতি বিপদে পড়ে আমরা ভারতের সাহায্য চাচ্ছি। কিন্তু আমরা ভারতকে সহ্য করতে পারবো কি? গত ২৩ বছব্রের ইতিহাস সে সাক্ষ্য দেয় না। ১৯৪৭ সালের পর যাদের জন্ম, তারা ভারতকে শত্রু হিসেবে দেখেছে। তারা জেনেছে ভারতে দাঙ্গা হয়। মুসলমানরা নির্যাতিত হয়। মাত্র ৬ বছর আগে ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়েছে। আমি সে যুদ্ধের উন্মাদনা দেখেছি। আমাদের বন্ধু খালেকদাদ চৌধুরী প্রেস ক্লাবে এসে বলেছিলেন, ভাই, প্রতিদিন একটি আন্তর্জাতিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর শুনছি ভারত আর পাকিস্তানের বেতারে। বাংলাদেশের প্রতিটি গাড়িতে CRASH INDIA নামে স্টিকার লাগানো হয়েছে। ওই স্টিকার ছিঁড়তে গিয়ে বিপত্তি হচ্ছে। আমি বিভিন্ন বাসায় পড়াতে গিয়ে দেখেছি আমার প্রিয়তম ছাত্র-ছাত্রীটি আমাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে। আমি তখন দৈনিক পাকিস্তানে চাকরি করি। আমি ঝুঁকি নিয়ে সারারাত কাজ করি। তারপরও কেউ আমাকে বিশ্বাস করে না। সকলের ধারণা আমি ভারতের দালাল, রাতে দৈনিক পাকিস্তান থেকে ভারতে সকল খবর পাচার করে দিই। মাত্র ৬ বছর আগের কথা। সেই পাকিস্তানের মানুষ আমাকে বলছে দিল্লি যেতে। চাচ্ছে ভারতের হস্তক্ষেপ। আজকে তাদের ধারণা ভারতই শুধু তাদের বাঁচাতে পারে। আমি অবাক হয়ে ভেবেছি। সত্যি সত্যি ভারতীয় বাহিনী এলে কী হবে। এদেশের মানুষ কি তাদের মেনে নেবে? ক’দিন মেনে নেবে? আমাদের দীর্ঘদিনের মানসিকতা কি নয় মাসে কলুষমুক্ত হয়ে যাবে?
