আর ব্যক্তিগতভাবে আমি ভেবেছিলাম লেখালেখি ছাড়া আমার করণীয় আর কিছু নেই। প্রয়াত ফনীভূষণ মজুমদার আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ বেতারে যোগ দিতে বলেছিলেন। সেখানকার পরিবেশ সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা ছিল না। দেখেছিলাম, এতবড় সগ্রামেও কোন্দল আর দলাদলি এবং শেষ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন স্বাধীন বাংলা বেতারে। আমার পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
এই পটভূমিতে আমি বাংলাদেশে ফিরেছিলাম। আমাদের অন্যতম নেতা রুহুল আমিন কায়সার চির অসুস্থ মানুষটি তখন ঢাকা ছেড়ে অনেক দূরে আশ্রয় নিয়েছেন। আমাদের আহ্বায়ক খান সাইফুর রহমান তখন বরিশালে। অনেকদিন তাদের কোনো খবর পাচ্ছি না। তাদের খবর পাওয়া দরকার। সকলকে সঙ্গে নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।
প্রকৃতপক্ষে ঢাকা শহরে আমাদের নেতৃস্থানীয় কেউ সক্রিয় ছিল না। যারা ছিল তারা দুরে সরে গিয়েছে। একমাত্র নগর আহ্বায়ক কমরেড মোহাম্মদ হোসেন সক্রিয় আছে সব ক্ষেত্রে।
ঢাকায় এসে যুদ্ধের তেমন কোনো খোঁজখবর পেতাম না। লুকিয়ে ভয়েস অব আমেরিকা ও বিবিসি ধরতে হতো। সেকালে যুদ্ধের কতোগুলো নাম আমার যেনো মুখস্তু হয়েছিল। উত্তরের ভুরুঙ্গামারী, দক্ষিণের মিয়াবাজার বিবিরবাজার ও সুয়াগাজী এবং সিলেটের সালুটিকার বিমানবন্দরের নাম। প্রায় প্রতিদিন স্বাধীন বাংলা বেতারের বুলেটিনে থাকত।
তবে যুদ্ধ সম্পর্কে আমার একটা নিজস্ব ভাবনা ছিল। আমার ধারণা হয়েছিল বছর শেষে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। বর্ষায় যুদ্ধ তীব্র হবে। ডিসেম্বরে গিয়ে চরম যুদ্ধ হবে। কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ হলেও এটা ভারত পাকিস্তান যুদ্ধও হবে। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হলে ভারতকে বিশ্ব জনমত গড়তে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি সমন্বয় ঘটাতে হবে। বিশ্ববাসীর কাছে এ যুদ্ধ অনিবার্য বলে বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে।
এ কাজ সময় সাপেক্ষ। আমি ঢাকা থেকে নবাবগঞ্জ গেলাম। রুল আমিন সাহেবকে নবাবগঞ্জে পেলাম। রুহুল আমিন সাহেব নবাবগঞ্জে থাকেন। তাঁর সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ হলো। আমরা একমত হলাম যে এ যুদ্ধের সুযোগে যতোদূর সম্ভব তরুণদের যুদ্ধে প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধে ঠেলে দেয়াই একমাত্র কাজ। এ যুদ্ধে গেলে তাদের একটি সংগ্রামী মানসিকতা গড়ে উঠবে। এছাড়া দলের আহ্বায়ক খান সাইফুর রহমানকে বরিশাল থেকে ভারতে নিয়ে যেতে হবে। আমাকে সকলের সঙ্গে আলোচনা করেই ৩১ জুলাই-এর মধ্যে ত্রিপুরার উদয়পুরে পৌঁছতে হবে। ৩১ জুলাই উদয়পুরে ভারতের বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দলের (আরএসপি) সাধারণ সম্পাদক কমরেড ত্রিদিব চৌধুরী উদয়পুরে আসবেন। তিনি আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেই উদয়পুর আসছেন।
ঢাকায় এসে আমি সহজভাবে সকল কাজ করতে পারলাম না। এর মধ্যে অদ্ভুত অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটে গেল। আমি ভারত থেকে ফিরে মোহাম্মদ হোসেনের বাসায় ঢুকতেই তাঁর স্ত্রী আমাকে বললেন, আমি আপনাকে চিনে ফেলেছি। ভারতে যাবার আগে আমি তাদের বাসায় গৃহশিক্ষক হিসেবে ছিলাম। আমার দায়িত্ব ছিল রোজা নামাজ শেখাবার। আমি শুধু ঐ কাজটাই করতাম না। ছেলেমেয়েদের গল্পে গল্পে ভুলিয়ে রাখতাম। কিন্তু ভুল হলো ভারতে যাওয়ার সময়। মোহাম্মদ হোসেনের স্ত্রী আসামের অধিবাসী। তাঁর দু’ভাইয়ের নাম আলাউদ্দিন ও মতিন। তারা আসামের হুজাউ শহরে থাকে। আমি ভারত যাবার কালে মোহাম্মদ হোসেনের স্ত্রীকে বললাম, আমি হুজাউতে আপনার ভাইদের খবর দেব। ভদ্রমহিলা চমকে গেলেন। তিনি স্বামীর কাছে জানতে চাইলেন। সাহেব, এ মওলানা সাহেব কে। তিনি কী করেন এবং শেষ পর্যন্ত আমার পরিচয় জেনে গেলেন। তাই ভারত থেকে এবার ফিরতেই তিনি এবার বললেন, আপনাকে কিন্তু আমি চিনি। এতে আমিও একটু স্বস্তি পেলাম। কারণ যে বাড়িতে থাকি সে বাড়ির গৃহকত্রীর সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে লুকোচুরি করা বেশ কঠিন। তাই এবার পরিবেশ অনেকটা স্বাভাবিক হলো।
কিন্তু বিপদ হলো পরবর্তী শুক্রবার। রায়েবাজার মসজিদের ইমাম অসুস্থ। তিনি জুম্মার নামাজ পড়াতে পারবেন না। সুতরাং একজন ইমাম চাই। সকলেই জানে মোহাম্মদ হোসেনের বাড়িতে একজন মাওলানা আছেন। তাই সবাই মিলে আমার খোঁজে এলো। বিব্রত মোহাম্মদ হোসেন বললেন, এ মাওলানা সাহেব বিদেশী। তিনি পরহেজগার মানুষ। বাড়িতেই আল্লাবিল্লা করেন। বাইরে কোথাও যান না। সেদিনের ফাড়া কাটা গেল। দ্বিতীয় বিপদ হলো আমার এক ছাত্রকে নিয়ে। ১৯৫৪ সালে এসেছিলাম খুন মামলার ফেরারি আসামি হিসেবে। আমাকে পাঠিয়েছিল প্রখ্যাত সাংবাদিক মরহুম মুহাম্মদ মোদাব্বের। দীর্ঘদিন তার বাসায় শিক্ষকতা করেছি। কিভাবে যেন খোঁজ করে বের করেছে আমার ঠিকানা। সে গাড়ি নিয়ে রায়েরবাজার হাজির। আমাকে তাদের বাসায় যেতে হবে। তার মায়ের নির্দেশ।
আমার অবস্থা তখন বিব্রতকর। পরনে লুঙ্গি, গায়ে হাওয়াই শার্ট। মাথায় জিন্না টুপি। মুখ ভর্তি দাড়ি। আমি ঘর থেকে কোথাও যাই না। কিন্তু মন্টি আমাকে জোর করে নিয়ে গেল তাদের মগবাজারের বাসায়। তারা মোহাম্মদপুর থেকে বাসা পাল্টিয়েছে। মন্টির মা বললেন, তোমার জন্যে ভিন্ন ব্যবস্থা আছে। তুমি আর কোথাও যেতে পারবে না। আমার বলার কিছু ছিল না। মন্টির মায়ের চোখে জল দেখলাম। আমাকে বাঁচালেন মোদাব্বের সাহেব। বললেন, নির্মল মুক্তিযোদ্ধা নিতে এসেছে। টাকা সংগ্রহ করতে এসেছে। কততদিন তুমি তাকে আটকে রাখবে? ওকে আটকে রাখা যায় না।
