রাতে তেমন ঘুম হলো না। একের পর এক মুক্তিবাহিনীর দল আসছে। এক দলের নেতা আমার পাশেই শুয়ে পড়ল। ওরা নাকি ইলিয়টগঞ্জের সেতু ভাঙতে যাবে। ওরা জোরেশোরেই কথা বলছিল। আমার তেমন ভালো লাগছিল না।
এমনি করে ভোর হয়ে গেল। আমাদের প্রায় কেউই ঘুমায়নি। সড়কে উঠতে হলে আমাদের গোমতী পার হতে হবে। কিন্তু কোনো খেয়া নৌকা নেই। অতিকষ্টে একখানি ডিঙ্গি পাওয়া গেল। ডিঙ্গিতে আমরা চারজন। হঠাৎ দেখলাম এক মাওলানা সাহেব আমাদের সামনে হাজির। ছয়ফুট দীর্ঘ। মুখ ভর্তি সাদা দাড়ি। তিনিও এসেছেন সেতু ভাঙতে। কিন্তু পথ চেনে না। তিনি রেকি করতে বেড়িয়েছেন। তিনি আমাদের সঙ্গী হলেন। তাঁকে সিঅ্যান্ডবি সড়ক পর্যন্ত পথ দেখিয়ে নিয়ে এলাম।
আজ ২৬ বছর পর সে ছবিও স্পষ্ট। যেন চোখের সামনে জলজল করছে। ভোরের বেলা শিশির তখনো শুকায়নি। আমরা কারো বাড়ির পেছন দিয়ে কারো বাড়ির সামনে দিয়ে এগোচ্ছি। আমাদের পিঠে ব্যাগ। বিপর্যস্ত চেহারা। রাস্তায় রাস্তায় ভিড় জমেছে। বাচ্চারা আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছে। গৃহবধুরা ঘরের বার হয়েছে আমাদের দেখতে। প্রবীণেরা আমাদের দেখে দূরে সরে যাচ্ছে। সর্বত্র একটা ভয়, আনন্দ, আশা এবং প্রত্যাশা। আর সেদিন পথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছে এটা বুঝি ভিয়েতনামের দৃশ্য। আমরা বুঝি ভিয়েতনামের পথ দিয়ে হাঁটছি।
হাঁটতে হাঁটতে দুপুরে আমরা দীঘিরপাড় পৌঁছলাম। দীঘিরপাড় চান্দিনা ও দেবিদ্বার থানার মাঝামাঝি এলাকায়। দীঘিরপাড় থেকে ক্যান্টনমেন্ট বেশি দূরে নয়। ৭১ এর যুদ্ধে দীঘিরপাড় একটি অভূতপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কুমিল্লার বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ঢুকেছে। কেউ এসেছে নৌকায়। কেউ এসেছে হেঁটে। সন্ধ্যার পর সবাই জমেছে দীঘিরপাড়ে। আবার বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌকায় সারাদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধারা এসেছে। সবাই মিলেছে দীঘিরপাড়ে। সন্ধ্যার পরে সেখানে যেন একটি মুক্তিযোদ্ধার বাজার। একটি মুক্ত এলাকা। আমরা সেখানে পৌঁছলাম দুপুরে। কিন্তু আমরা যাব কোথায়?
এবার দেলোয়ার পথ নির্দেশ করল। সে বলল, দীঘিরপাড় থেকে নৌকায় গৌরীপুর যেতে হবে। গৌরীপুরে নৌকা পাল্টাতে হবে। নতুন নৌকা নিয়ে মতলব থানার বেলতলি যেতে হবে। রাতে থাকতে হবে আবুল হোসেনদের বাড়িতে। আবুল হোসেন ব্যাংকে চাকরি করে ঢাকায়। ন্যাপ নেতা। এলাকায় সকলের সঙ্গেই পরিচিত। দেলোয়ারের কথা অনুযায়ী আমরা দীঘিরপাড়ের নৌকা নিলাম। নৌকায় গৌরীপুর থেকে বেলতলী। বেলতলী পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো।
অবাক কাণ্ড। আবুল হোসেন বাড়িতে নেই। ঢাকা থেকে সেই বাড়ি হয়ে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা যাচ্ছে সীমান্তে। ফিরছে ওই পথে। আবুল হোসেন কখনো আগরতলা যাচ্ছে। কখনো ঘুরছে গ্রাম-গ্রামান্তরে। তবে সে বাড়িতে যেই আসুক না কেন থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। আবুল হোসেনের বৃদ্ধ পিতা সন্তানের মতো সবাইকে স্নেহ করেন। বৃদ্ধের বড় আক্ষেপ। তিনি বলেছেন, সব বাপের পুতেরা এমন করে যুদ্ধে গেলে দেশটা স্বাধীন হয়ে যেত। আমরা বেলতলিতে রাত কাটালাম। ভোরবেলা লঞ্চে উঠে মুন্সিগঞ্জে হয়ে ঢাকা পৌঁছলাম।
ঢাকার অবস্থান আমি জানি না। এবার আমি একা। দেলোয়ার মুন্সিগঞ্জ থেকে গেছে। আতাউর আর শহিদুল্লাহ ঢাকায় এসে নিজের আশ্রয়ে চলে গেল। আমি একটি রিকশা নিলাম। সদরঘাট থেকে রায়েরবাজার। রায়ের বাজারের জাফরাবাদ। বাড়িটা যেন চিনতে পারছিলাম না। সবাইকে সন্দেহ হচ্ছিল। কাউকে জিজ্ঞাসা করতে ভয় পাচ্ছিলাম। আমার হাতে ব্যাগ। পরনে লুঙ্গি ও হাওয়াই শার্ট। মুখে দাড়ি। ওপাড়ায় এককালে আমি বড্ড পরিচিত ছিলাম। অনেক খুঁজে জাফরাবাদের ৮০ নম্বর বাড়িতে পৌঁছলাম। মোহাম্মদ হোসেন আমাকে দেখে হেসে ফেললেন। বললেন, আইছেন ভালো কাজ হইছে। অনেক কথা আছে। ইন্ডিয়া কিছু করে না কেন কইতে পারেন। আমরা এখানে মৰুম নাকি।
জুলাই মাসে ঢাকায় পৌঁছলাম। ৭১ সালের জুলাই। আমি কেন ঢাকায় এলাম সে প্রশ্ন সবার মনে। কেউ তখন ঢাকায় আসে না। আমি আগরতলা ও কলকাতায় গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ঢাকা ফিরলাম। কারো বিশ্বাস হচ্ছিল না। তখন চারদিকে যুদ্ধ আর যুদ্ধ।
কেন চাকায় এলাম? ২৬ বছর পর সে প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে। আমি পেশায় রাজনীতিক এবং সাংবাদিক। হয়তো সাংবাদিক মনের একটা চাহিদা ছিল। হয়তো ভেবেছিলাম জীবনে এই অভিজ্ঞতা আর হবে না। ভারতে নিরাপদ আশ্রয়ের লোকগুলোকে দেখেছি। এবার ইচ্ছা হলো তঙ্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছবি দেখবার। কেমন আছে সে অবরুদ্ধ মানুষগুলো। কী করছে। কিভাবে বেঁচে আছে। তখন ঢাকায় থাকার যে কী বিপদ আমি ঢাকায় না এলে বুঝতে পারতাম না। এ প্রেক্ষিতে বলা যায়, হয়তো বা দেশের মানুষগুলোকে দেখার জন্যেই সাংবাদিক হিসেবে আমি ঢাকায় এসেছিলাম।
কিন্তু রাজনীতিক হিসেবেও আমার একটি অভিজ্ঞতা ছিল। সে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি ভারতে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম সেনাবাহিনীতে আমার যোগ দেয়া সম্ভব হবে না। গ্রহণযোগ্য হবে না। যুদ্ধে যেতে হলে কতগুলো পদ্ধতি আছে। ওই পদ্ধতি মোটামুটিভাবে আওয়ামী, ন্যাপ এবং কমিউনিস্ট পার্টির দখলে। আমি ভারতে গিয়ে লক্ষ্য করেছি আমি ভারতে পৌঁছবার আগে যে বামপন্থী তরুণেরা প্রশিক্ষণ নিয়েছিল তাদেরকেও কোথাও যেতে দেয়া হচ্ছে না। আমার কাছে খুব স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে আমাদের দলের কেউ সরাসরি কোথাও গিয়ে ভর্তি হতে পারবে না। ভর্তি হতে গেলে গোপনে ভর্তি হতে হবে। অথবা নিজের উদ্যোগে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ঢুকে নিজেদের বাহিনী গড়ে যুদ্ধ করতে হবে। সে অবস্থা তখন আমাদের ছিল না। দল গঠিত হয়েছিল ১৯৬৯ সালে ২৯ আগস্ট। যুদ্ধ শুরু হলো ১৯৭১ এর মার্চে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে দলের কাঠামো দেয়া সম্ভব হয়নি। সুতরাং ভিন্নভাবে বাহিনী গড়ে তোলাও মুশকিল। তাই আমার প্রথম লক্ষ্য ছিল শ্রমিকদের মুক্তিযুদ্ধে ঢুকিয়ে দেয়া। দেশে এসে কিছু মানুষকে নিয়ে আবার ভারতে চলে যাওয়া। সম্ভব হলে প্রশিক্ষণ দেয়া। প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব না হলে তাদের যে কোনো উপায়ে ৭১-এর সংগ্রামে যুক্ত করা। যুদ্ধের বিভিন্ন এলাকায় পাঠিয়ে দেয়া। আমার লক্ষ্য ছিল তরুণদের চোখের সামনে একটি মুক্তিযুদ্ধের ছবি এঁকে দেয়া। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাদের বুঝতে শেখানো যে এ যুদ্ধ কঠিন। এ যুদ্ধ ঝুঁকিপূর্ণ এবং এ যুদ্ধে গেলে পেছনে তাকানো যায় না।
