এবার সুখময় সেনগুপ্তকে ভিন্ন মানুষ মনে হলো। এককালের কুমিল্লার একটি গ্রুপের নেতা তার প্রতিদ্বন্দ্বি গ্রুপের নেতা শচীন সিং এখন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী। আমার প্রথম সাক্ষাতের সময় তিনি আমাকে বলেছিলেন, সকল প্রশ্নের জবাব পেতে হলে নয়াদিল্লি যান। শ্রীমতী গান্ধীকে জিজ্ঞাসা করুন। এবার তিনি নিজেই কথা বললেন। জিজ্ঞাসা করলেন, বাংলাদেশের মানুষ কথা বলুন। বলুন, তারা এ যুদ্ধ কিভাবে নেবে। এ যুদ্ধ একদিন আসবে। কিন্তু এর প্রভাব থাকবে দীর্ঘদিন।
আমি সেদিন সুখময় বাবুর কথার জবাব দিইনি। এ প্রশ্ন তেমন করে ভেবে দেখিনি। তবে শ্রীমতী গান্ধী কেন পাকিস্তানকে আক্রমণ করছেন না এ জন্যে তার সমালোচনা শুনেছি। ঢাকা এবং আগরতলায় হা-হুঁতাশ শুনেছি। ঢাকার খেদোক্তি শুনেছি, শ্ৰীমতী গান্ধী কি আমাদের মেরে ফেলতে চান?
তখন আমার কাছে এ প্রশ্নের জবাব ছিল না। পরবর্তীকালে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী সুখময় সেনগুপ্তের কথা আমার কানে বাজছিল। তাঁকে বললাম, আমি ঢাকা যাচ্ছি। ফিরে এসে জবাব দেব।
আমি ১৯৭১ সালের জুলাই মাস আগরতলা থেকে ঢাকা ফিরব শুনে সকলে অবাক। এ সময় তো সকল নেতাদের পালাবার কথা। বাংলাদেশ থেকে আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে আসার কথা। এছাড়া আমি সাংবাদিক। নাম নির্মল সেন। কেউ হাতে পেলে ছাড়বে না। আর পরিবারের যারা দেশে ছিল তারা এখনো গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় আছে। বন্ধুরা রাজি হলেন না। তবে আমাকে আটকাবার সাধ্য কারো নেই। তাই জুলাই মাসে রওনা হলাম ঢাকার পথে। পরনে লুঙ্গি শার্ট। মুখে দাড়ি। সঙ্গে সঙ্গী জুটে গেল। তাদের কথায় পরে আসছি।
আগরতলা ছাড়বার আগে আ স ম আবদুর রবের সঙ্গে দেখা হলো। তাঁদের তিনটি ছেলে বাংলাদেশে আসবে। আমরা এক সঙ্গে রওনা হলাম। ওই তিনটি ছেলের মধ্যে একজন হচ্ছে গজারিয়ার আতাউর। দ্বিতীয় শেখর নগরের দেলোয়ার। আর তৃতীয় ঢাকার শহিদুল্লাহ। আতাউর আর দেলোয়ার ঢাকায় ফিরছে। কসিম বেপারী ও কফিলউদ্দীন চৌধুরীকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। এরা দু’জনে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। তাদের ধারণা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ আজকে বাংলাদেশে থাকলে ওরা আত্মসমর্পণ করবে। শহিদুল্লাহর এমন কোনো দায়িত্ব নেই। শহিদুল্লাহ মনমরা। সে ঢাকায় ফিরে যাচ্ছে, তাই তার আনন্দ আগরতলায় সে খুব কষ্টে ছিল। আগরতলায় আসাই তার নাকি ঠিক হয়নি।
জুলাই মাসের রোদ-বৃষ্টি ঝুঁকি নিয়ে আমরা বাসে সোনামুরায় এলাম। এখন হাঁটবার পালা। এবার পাহাড়ি সড়ক। চড়াই আর উত্রাই। মাঝে মাঝে বৃষ্টি নামছে। আমাদের সঙ্গে কোনো ছাতা নেই। আমরা ভিজে যাচ্ছি। আবার রোদ উঠছে। আমাদের জামা কাপড় শুকিয়ে যাচ্ছে। আমার মনে তখন ভিন্ন চিন্তা। কোনো কিছু ঠিক করে দেশের পথে পা বাড়াইনি। আগরতলা এসেছিলাম ভিন্ন। পথে। কুমিল্লার নবীনগর হয়ে। এবার যাচ্ছি আর এক পথে। সম্পূর্ণ অপরিচিত পথ। বুড়িচং থানা দিয়ে সীমান্ত পার হতে হবে। রাতে কোথায় থাকতে হবে জানি না। ঢাকায় গিয়েও কোথায় উঠব স্থির করিনি। ঢাকায় অনেক চেনা মানুষ আছে। কিন্তু কারো বাসায় যাওয়া যাবে না। যেতে হবে রায়েরবাজারের জাফরাবাদ। ওখানে শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের ঢাকা মহানগর কমিটির আহ্বায়ক কমরেড মোহাম্মদ হোসেনের বাড়ি। তার বাড়ি থেকে মাস দুই আগে ভারত যাত্রা করেছিলাম। জানি না ওই বাড়িতে কেউ আছে কিনা বা কেমন আছে। ঢাকার অবস্থাও জানি না। শুধু জানি রুহুল আমিন কায়সার ছাড়া সবাই অখুশি হবে। ভয় পাবে। ভাববে, আমি আবার ঢাকায় এলাম কেন।
ভাবতে ভাবতে পথ চলছি। জানি না কখন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদশে ঢুকেছি। সারাটা পথ দেলোয়ার কথা বলেছে। যতদূর মনে আছে বক্সগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছি। সেদিন বক্সগঞ্জের হাট। রাস্তায় অনেক লোক। ওই লোকদের সঙ্গে মিলেমিশে সন্ধ্যার দিকে গোবিন্দপুর পৌঁছলাম। মাইল খানেক দূরে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট। সন্ধ্যার আগে দোকান পাট বন্ধ। সর্বত্র একটা থমথমে ভাব। আমাদের ক্ষুধা পেয়েছিল। দীর্ঘদিন আগরতলায় ভালো কিছু খাইনি। ভাবলাম গোবিন্দপুর বাজারে ভালো কিছু খাবার পাওয়া যাবে। বাজারে একটি মাত্র দোকান খোলা। মাংস ভাত আর দুধ ছাড়া কিছুই মিলল না। ঐ সকল এলাকায় তখন সন্ধ্যার দিকে কেউ হাট বাজারে আসে না। আমাদের দেখে সকলের কৌতূহল হলো। লোক জমে গেল। বুঝতে পারলাম তারা ধরে নিয়েছে আমরা মুক্তিবাহিনীর লোক। আমাদের বলা হয়েছিল গোবিন্দপুর বাজারে গেলে আমরা আশ্রয় পাবো। এখানে আবদুল খালেক বলে আওয়ামী লীগের এক কর্মী আছে। তাকে খুঁজতে হবে।
আমাদের মধ্যে বেশি কথা বলে দেলোয়ার। সে দোকানীকে জিজ্ঞেস করল খালেকের কথা। তার প্রশ্নে সবাই চমকে গেলো। একজন বলে উঠল, খালেক ভারতে চলে গেছে। আমাদের প্রশ্নে ওব্রা নিশ্চিত হলো যে আমরা মুক্তিবাহিনীর লোক। মনে হলো ওরা ভয় পেয়েছে। বারবার আমাদের হাতের ব্যাগের দিকে তাকাচ্ছে। আমি এই ভয়ের সুযোগ নিলাম। একজনকে দোকানের পেছনে নিয়ে বললাম-আমার ধারণা আপনি মুক্তিবাহিনীর লোক। আজকের রাতের জন্যে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। লোকটি চমকে গেল। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো বাজারের গুদাম ঘরে।
