আগরতলায় থাকতে এই একটি দোকানে ২০ পয়সায় চা খেতাম এবং লক্ষ করেছি স্বামী স্বরূপানন্দ হিন্দুদের মধ্যে বিশেষ পরিচিত। বিশেষ করে এককালের বাংলাদেশের অধিবাসীরা স্বরূপানন্দের অনুরক্ত। স্বামীজী লিখেছেন, এককালে বাংলাদেশ যাওয়া নাকি সহজ হবে। এটাই ওদের চরম পাওয়া। যারা এই চরম পাওয়ার প্রশ্নটি না বুঝছেন, তাঁদের পক্ষে স্বরূপানন্দের প্রতি এই গভীর অনুরাগের মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না।
আগরতলায় গিয়ে আমার নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে নতুন ধারণা হয়েছিল। আমার সঙ্গে সর্বক্ষণ থাকত শহিদুল্লাহ। শহিদুল্লার বাড়ি ভোলা। এক সময় দৈনিক পূর্বদেশ ও দৈনিক পাকিস্তানে চাকরি করত। ১৯৭১ সালে শহিদুল্লাহ বারবার আগরতলায় যাতায়াত করেছে। আগরতলায় সে আমার সঙ্গে কলেজ টিলায় স্নান করতে যেত। একদিন আমি স্নান করতে যাইনি। শহিদুল্লাহ স্নান করতে গিয়ে ছুটতে ছুটতে ফিরে এল। এসে বললো, স্যার তাজ্জব কাণ্ড। একেবারে অবাক কাণ্ড। একি দৃশ্য দেখলাম স্যার।
আমি শহিদুল্লাহর কথা তেমন বিস্মিত হলাম না। শহিদুল্লা সাধারণ ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য করার জন্যে অনেক বিশেষণের আমদানি করে। ছোটখাটো ঘটনাকেও বড় করে তোলে। শহিদুল্লাহর কাহিনী হচ্ছে সে মঠ চৌমুহনী থেকে কলেজ টিলায় স্নান করতে যাচ্ছিল। কলেজ টিলায় যাওয়ার পথে সড়কের পাশে একটি প্রেস আছে। সড়ক থেকে দেখা যায় যে ওই প্রেসে কম্পোজিটররা কাজ করছে। আমরা নিত্যদিন ঐ ছবি দেখছি। কিন্তু শহিদুল্লাহ আজ ভিন্ন ছবি দেখেছে। শহিদুল্লাহ লক্ষ করেছে যে একজন মহিলা কম্পোজিটর কাজ করেছে। এমন তাজ্জব কাণ্ড শহিদুল্লাহ জীবনে দেখেনি। এ কথা শহিদুল্লাহ জীবনেও ভাবেনি।
২৬ বছর আগের কথা। আমাদের সমাজে তখন বোরখার একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। আর্থিক দুর্নীতি তখনো ঘরের মেয়েকে ঘরের বাইরে বের করেনি। ভারতে তখন ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরা নেমেছে জীবনযুদ্ধে।
আগরতলায় প্রতিদিন কোনো রেস্টুরেন্টে বা কোনো বাসায় এক ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি হতো। ওরা আমাদের গাড়ি দেখে অবাক হতো। আমাদের দেশের অনেক নেতা গাড়ি নিয়ে আগরতলা গিয়েছিল। জাপানি সুন্দর গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে আগরতলার লোক বিস্মিত হতো। তাদের দেশ অর্থাৎ ভারতে তেমন গাড়ি নেই। তখন ভারতে বিদেশ থেকে গাড়ি আমদানি নিষিদ্ধ ছিল। তকন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু প্রণীত নীতি অনুসৃত হচ্ছিল। নেহরুর নীতি হচ্ছে কোনো আমদানি নয়। দেশে মূল, বৃহৎ শিল্প স্থাপন করো। নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণ করো। এ লক্ষ্য নেহরু নিয়েছিলেন বিশ্বের পরাশক্তির দ্বন্দ্বের কারণে। এই দ্বন্দ্বের ফলে পুলিশি এবং সমাজতন্ত্রী উভয় শিবিরই ভারতকে সাহায্য সহযোগিতা করতে এগিয়ে যেত তার অবস্থান এবং জনসংখ্যার জন্যে। তাই ভারতে আলপিন থেকে গাড়ি পর্যন্ত সকলই ছিল নিজস্ব। আমদানি ছিল নিষিদ্ধ।
আগরতলার মানুষ প্রথম আমাদের গাড়ির বাহার দেখে চমৎকৃত হতো। তারপর তর্ক জুড়ে দিত। বলত, আমাদের নিজেদের বলে কিছু নেই। সবকিছু জাপানি আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। আপনারা স্বাধীনতা যুদ্ধ করবেন কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়াবেন কী করে? এ প্রশ্নে আমি ভারতীয়দের একটি প্রচ্ছন্ন গর্ব দেখেছি। আর এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে ভারত সীমান্তের একজন ভারতীয় জোয়ানের কথা। তিনি ভারত সীমান্তে একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে আটক করেছিলেন। পরে শুনলেন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। শুনলেন তাঁর ঢাকায় বাড়ি আছে, গাড়ি আছে। টেলিভিশন আছে। সেই অধ্যাপককে সসম্মানে ছেড়ে দিতে গিয়ে সেই জোয়ান জিজ্ঞাসা করেছিলেন–তা হলে আপনারা লড়াই করবেন কেন? কেন স্বাধীনতা চাচ্ছেন। আমাদের দেশের অধ্যাপকদের এতো সুযোগ-সুবিধা নেই। ভারতে বিপাকে পড়তাম ধর্মীয় চর্চা নিয়ে। রাস্তাঘাটে সর্বত্রই কোনো না কোনো আশ্রম বা পূজার ব্যবস্থা। আমাদের দেশে শনিবার হিন্দুরা শণিপূজা করে থাকে। কিন্তু কোথাও শণিতলা দেখিনি। আগরতলায় দেখেছি সড়কের পাশে কোনো একটি গাছ ঘিরে বেড়া দিয়ে শণিতলা বানিয়েছে। ওই এলাকা দিয়ে যেতে গেলে এদের দেখে পথচারিদের কাছে পয়সা চাইবে। না দিলে মস্তানদের মতো আচরণ করবে। ধর্মের এমন মাস্তানিরূপ এর আগে আমার কোথাও চোখে পড়েনি। তবে এই হামলা দেখে আমরা সাহস করে কথা বলতে পারলে মাফ পেয়েছি। বলেছি আমরা জয়বাংলার লোক। ব্যাস। সব সমস্যার সমাধান। জানি না এখনো আগরতলায় শণিতলার হামলা আছে কিনা।
জুলাই শেষ হতে চলেছে। আমাদের সংগ্রাম নিয়ে নানা কথা উঠেছে। একদিন সুখময় বাবু আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আপনারা শ্ৰীমতী গান্ধীকে, সমালোচনা করছেন বাংলাদেশে অভিযান না চালাবার জন্যে। কিন্তু আপনারা কি কথা দিতে পারেন যে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানকে আক্রমণ করলে আপনাদের জনগণ আমাদের মেনে নেবে? একদিন আমাদের আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত করবে না তো? যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আমাদের মানসিকতা থাকবে কি? আমাদের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক কোনোদিন ভালো ছিল না। একটি বিশেষ মানসিকতায় পরিবেশে দু’দেশের সাধারণ মানুষ ১৯৪৭ সালের পর বেড়ে উঠেছে। এ ইতিহাস বাদ দিয়েও ভারত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। এতে ঝুঁকি অনেক।
