আমাদের হয়েছে ভিন্ন ধরনের বিপদ। আমরা আওয়ামী লীগ করি না। ন্যাপ কিংবা কমিউনিস্ট পার্টিও করি না। স্বাধীন বাংলা সরকারের কাছে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা কম। আমাদের আগরতলার বন্ধুরা আরএসপি করে। তাদের সঙ্গে আগরতলার কংগ্রেসের সম্পর্কও ভালো নয়। তাই সেদিক দিয়েও আমাদের প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলা করতে হয়েছে।
আমাদের ঘরের পেছনে একটি পুকুর আছে। আমি ইচ্ছা করলেও ওই পুকুরে স্নান করতে পারি না। পুকুরের তিন দিকে আবাসিক এলাকা। পুকুরের ঘাটে ছেলে মেয়েদের ভিড় থাকে। আমাদের বন্ধু শ্রমিক নেতা মিসির আহমদ নির্বিঘ্নে ওই ঘাটে গিয়ে স্নান করে আসেন। কিন্তু আমার পক্ষে বিপদ। আমার পরনে লুঙ্গি এবং মুখ ভর্তি দাড়ি। একেবারে মাওলানা সাহেব। আমাকে কিছু দূর হেঁটে কলেজ টিলায় গিয়ে স্নান করে আসতে হয়।
আগরতলার একটি ভিন্ন রূপ আছে। এককালে রাজাদের শাসনে ছিল। সড়কগুলোর একটি ভিন্ন রূপ আছে। এই সড়কগুলোর নামের মধ্যে চৌমুহনী শব্দটি থাকে। যেমন আমরা ছিলাম মঠ চৌমুহনীতে। তেমনি নাম আছে কামান চৌমুহনী। আগরতলায় আমার বেশি কাজ ছিল না। নেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করা ছাড়া। দুশ্চিন্তা ছিল অনেক। দেশ থেকে লোক আসছে। কিন্তু ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করতে পারছি না। এর মধ্যে একদিন শ্রমিক লীগের আব্দুল মান্নান এবং আদমজীর সাদুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ওদের সঙ্গে ওদের ক্যাম্পে চলে গেলাম। এক সময় এ দুজনই আমাদের দলের লোক ছিল। বলা যেতে পারে এদের রাজনৈতিক জীবন আমাদের হাতেই শুরু। আওয়ামী লীগ ৬ দফা দাবি পেশ করার পর এদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শিথিল হয়। তবে ছিন্ন হয়নি। সাদু বলল, মুক্তিযুদ্ধে যেতে হলে আমাদের কাছে লোক পাঠাবেন। আমরা শ্রমিক লীগের কোটায় ভর্তি করাব। আপনার নাম করে কেউ এলে কোনো অসুবিধা হবে না।
সাদুদের ক্যাম্পে ভাত খেয়ে নিজের এলাকায় ফিরলাম। এরকম ভাত খাওয়ার বহু বাড়ি আমার ছিল। কিন্তু বন্ধুদের ছেড়ে আমি কোথাও যেতাম না। খাবার সময় কোনোদিন ডিম জুটলে ভাবতাম খুব ভালো খেয়েছি।
একদিন রাস্তায় প্রকৌশলী মানিক গাঙ্গুলীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কুমিল্লার অধিবাসী মানিক গাঙ্গুলীর প্রকৃত নাম তুষার গাঙ্গুলী, ওয়াপদা প্রকৌশলী। মানিক বাবুর সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমার পরিচিতির পরিধি বাড়ল। দেখা হলো জগদীশ কুণ্ডের সঙ্গে। জগদীশ বাবুর স্ত্রী চিত্রা। শ্যালিকা উত্তরা। জগদীশ বাবুর শাশুড়ি আমরা বাঙালি সংগঠনের সদস্য। আমরা বাঙালি সংগঠন আগরতলায় খুব পরিচিত। ওরা বাংলা ছাড়া কোনো ভাষাকেই পাত্তা দেয় না। জানি না, বাঙালি রাজ্যের পত্তন করাই ওদের লক্ষ্য ছিল কিনা। আগরতলার এ কাহিনী ১৯৭১ সালে। তারপর ২৬ বছর কেটে গেছে। আগরতলা যাওয়া হয়নি। সেখানকার মানুষের নামগুলো মনে আছে। জানি না লোকগুলো কেমন আছে।
মঠ চৌমুহনীতে আমাদের ঘরের সামনে একটি সড়ক। সড়কের শেষে একটি হোস্টেল। সেই হোস্টেলে কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপের বন্ধুরা আছে। তাদেরও চা খেতে হলে আমাদের এলাকায় আসতে হয়।
আমি ভোর থেকেই দুয়ার খুলে পড়তে বসি। নিজেকে সড়কের পাহারাদার মনে হয়। সামনের বাড়িতে এক দম্পত্তি থাকে। ছেলেটি বাঙালি, মেয়েটি চাকমা। মাঝে মাঝে তাদের হাসতে এবং রাগতে দেখি। মঠ চৌমুহনীর মোড়ে প্রতিদিন ভোরের দিকে এক সুশ্রী তরুণী এসে দাঁড়ায়। বাসে সে কয়েরপুর যায়। আবার নির্ধারিত সময়ে বিকালে সে ফিরে আসে। শুনেছি সে মাস্টারি করে। আগরতলায় এভাবে কারো সম্পর্কে শুনতে এবং জানতে গেলে জানা যাবে এরা প্রায় সকলেই এককালের বাংলাদেশের লোক। প্রায় সকলেরই বাড়ি ছিল আখাউড়া বা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এদের পেশা ব্যবসা, গাড়ি চালানো বা শিক্ষকতা।
তখন আগরতলা কেন্দ্রীয় শাসিত রাজ্য। নিজস্ব আয় দুই কোটি টাকা। বার্ষিক ব্যয় হচ্ছে ৪২ কোটি টাকা। ৪০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিত কেন্দ্রীয় সরকার। আগরতলায় কোনো মৌলিক শিল্প কারখানা নেই। শিক্ষকতা, সাধারণ ব্যবসা বা বাস ট্রাকের মালিক হওয়া বা মালিকের পরিবহনে শ্রমিক হওয়াই একমাত্র পেশা ছিল আগরতলায়। আমার চেনা জগদীশ বাবু চিত্রা কিংবা উত্তরা সকলেই শিক্ষক।
আজ ২৬ বছর পরেও দু’টি ঘটনা আমার খুব মনে পড়ে। তখন ঢাকায় প্রতিকাপ চা ছিল দুই আনা। আগরতলায় ৩০ পয়সা আমার চা খাওয়ার নেশা ছিল। কিন্তু পয়সা কোথায়। মঠ চৌমুহনীর মোড়ে দু’তিনটি চায়ের দোকান। ভাবলাম ওদের সঙ্গে ভাব করা যায় কিনা। আমি সারাদিন বই পড়ি বলে এলাকায় একটি পরিচিতি আছে। তাদের বিস্ময় যে একজন মাওলানা সারাদিন কী করে বই পড়ে। একদিন এক রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই একটি ছেলে বলল আপনি কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হেড মাস্টার? বুঝলাম ছেলেটির বুদ্ধির দৌড় সীমাবদ্ধ। তারপর প্রশ্ন হলো, আপনাদের আল্লাহতো আপনাদের রক্ষা করতে পারল না। আপনাদেরতো ইসলামিক রাষ্ট্র। আমি বললাম, তোমাদের কালীও কিছু করতে পারল না। শুনেছি গৌরনদী থানার বার্থি কালীবাড়ির কালীকে পাঞ্জাবিরা গুলি করেছে। তোমাদের কালী তাদের কিছুই বলেনি। ছেলেটি একটু মুষড়ে পড়ল। বললো ধর্ম নিয়ে আলোচনা ভালো নয়। আমি বললাম, আমি ধর্ম মানি না। ধর্ম বিশ্বাসও করি না। ছেলেটি বলল, আপনাকে একটি বই পড়তে দিবো। এই বই আমার গুরুদেবের। গুরুর নাম স্বামী স্বরূপানন্দ। তিনি সাক্ষাৎ দেবতা। পৃথিবীতে কী হতে পারে বা হবে সবকিছুই নাকি তাঁর বইতে লেখা আছে। আমি ছেলেটির কাছ থেকে স্বরূপানন্দের রচনাবলি নিলাম। ছেলেটি খুশি হলো। সে বলল, এবার প্রতি কাপ চায়ের জন্যে আপনাকে ৩০ পয়সা দিতে হবে না। ২০ পয়সা দিলেই চলবে।
