কলকাতা এক ভিন্ন জগত। ১৯৪৮ সালে কলকাতা ছেড়েছি। ২৩ বছর পর আবার কলকাতায় এলাম। খুব একটা অচেনা লাগেনি। শুধু বিব্রত হয়েছি মানুষের প্রশ্নে। সকলেই বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চায়। শেখ মুজিবুর রহমান তাদের কাছে এক কিংবদন্তী পুরুষ। বাংলাদেশের রাজনীতি তাদের কাছে বোধগম্য নয়। তারা বুঝতে পারছে না কী করে এমন হতে পারে। সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বিভক্ত একটি দেশের মানুষ কী করে একটি ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে সংগ্রামে নামতে পারে তাও মাত্র ২৩ বছরের মাথায়।
তবে এরপরেও কোলকাতার একটি ভিন্ন চিত্র আছে। বিরাট কোলকাতায় বাংলাদেশের যুদ্ধের কোনো ছাপ নেই। বাংলাদেশের যুদ্ধ আছে পত্রিকায় পাতায়, দেয়ালের প্রচারপত্রে, এককালের উদ্বাস্তুদের ঘরে ঘরে এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শরণার্থী শিবিরে। কলকাতা শহরে বাংলাদেশের সংগ্রাম অনুভব করা যায় না।
সেদিক থেকে আগরতলা অনেক ভালো। সীমান্তের কাছাকাছি আগরতলার অসংখ্য চেনা মানুষ আছে। মুক্তিবাহিনীর লোক আছে। আবহাওয়ায় একটি যুদ্ধের ছাপ আছে। আগরতলার আলোচনা একটিই–বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ। যুদ্ধ আর যুদ্ধ। বাংলাদেশ নিয়ে যুদ্ধ।
বুঝলাম কলকাতায় থাকা হবে না। যুদ্ধের কাছাকাছি যেতে হবে। ফিরে যেতে হবে আগরতলায় আর বাংলাদেশে। সম্ভব হলে কলকাতার কিছু আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে। যাওয়া যাবে না আসানসোলে।
এ কথা ভেবেই একদিন বিকেলে বড় বোনের বাসায় গেলাম। ২৩ বছর বড় বোন আমাকে চিনতেই পারলেন না। চিনল তার প্রথম সন্তান। আমাকে না জানিয়ে বড় বোন ট্ৰেলিগ্রাম করেছিল আসানসোলে। আরএসপি অফিসে এসে শুনলাম আসানসোল থেকে দুই ভাই এসেছিল আমাকে নিতে। শুনে গেছে আমি এই মুহূর্তে আসানসোল যাচ্ছি না। অনুনয় বিনয় করে গেছে আরএসপি নেতাদের কাছে। কিন্তু কোনো ফল হয়নি।
আমি তখন যুদ্ধের নেতাদের খুঁজছিলাম। মহাত্মা গান্ধী রোডে প্রয়াত ফণী ভূষণ মজুমদারের সঙ্গে এক হোটেলে দেখা হলো। এখানে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদও থাকতেন। শুনলাম আমাকে নাকি খোঁজা হচ্ছিল স্বাধীন বাংলা বেতারের জন্যে। ফনী বাবু বললেন, তুমি একবার বালাগঞ্জে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যাও। আমি রাজি হলাম না।
ইতিমধ্যে আমাদের দলের কিছু ছেলেদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ওরা কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া সীমান্ত ঢুকেছিল। সীমান্ত এলাকায়। ওখানে ওরা মুক্তিবাহিনীর শিবির গড়ে তুলেছে। ওটাই বোধ হয় ভারতের মাটিতে প্রথম মুক্তিবাহিনী ক্যাম্প। ওখান থেকে আমাদের কিছু কিছু ছেলে ট্রেনিং নেবার জন্যে বিহারের চাকুলিয়ায় গিয়েছে। প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে গেছে যুদ্ধ করার জন্যে। তবে পরবর্তীকালে এই ক্যাম্পটি নিয়ে একটি ভিন্ন ইতিহাস সৃষ্টি হয়। এই ক্যাম্প সফরে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ও সেনাবাহিনী প্রধান ওসমানী এসেছিলেন। ছেলেদের উৎসাহ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলা সরকার এই ক্যাম্পটিকে বাতিল করেন। কারণ এই ক্যাম্প বামপন্থীদের দখলে। ৭১ সালের এই ঘটনা আজকে অনেককে হয়তো অবাক করবে। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা সেকালে অনেক ঘটেছিল। যা আজকে বিশ্বাসযোগ্য নয়।
আমি ঠিক করলাম আগরতলা ফিরব। আগরতলা হয়ে বাংলাদেশ। বন্ধুরা বলল একটু অপেক্ষা করুন। ২৯ জুন ইয়াহিয়া খান ভাষণ দেবে। ওই ভাষণে নতুন কিছু থাকতে পারে। ওই ভাষণের পরই আপনি দেশে ফিরে যেতে পারেন।
আমার সেদিন কৌতুক অনুভব হয়েছিল। আমরা যুদ্ধ করছি। যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করব। এটাই আমাদের শপথ ও প্রতিজ্ঞা। অথচ আমরা সবাই অপেক্ষা করছি ইয়াহিয়া খানের ভাষণের জন্যে। আমরা ভাবছি হয়তো বা একটা আপোষ হবে।
আমাদের কারো কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেই। কারো চোখের সামনে সুস্পষ্ট কোনো ভবিষ্যতের দৃষ্টি নেই। অথচ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। প্রাণ দেয়ার এবং নেয়ার জন্যে কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে গেছে। আমি ভাবলাম কোলকাতায় থেকে কোনো লাভই হবে না। ইয়াহিয়া খানের ২৯ জুনের ভাষণ শুনলাম। সে ভাষণে কিছুই ছিল না। আমি আগরতলা ফিরে এলাম। মা ভাই বোন কারো সঙ্গে দেখা না করেই।
ফিরে দেখি ভিন্ন পরিস্থিতি। শহরটা গিজগিজ করছে। আরো শরণার্থী এসেছে। এসেছে মুক্তিযোদ্ধা। আরএসপি আমাদের একটি থাকার জায়গা দিয়েছে মঠ চৌমুহনীতে। আরএসপির অঙ্গ সংগঠন প্রগ্রেসিভ স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (পিএসইউ)। এই পিএসইউ অফিসে আমাদের জায়গা হয়েছে। ঘরটি খুব বড় নয়। নিজেদের রান্না করতে যেতে হয়। মেঝেতে ঘুমাতে হয়। শরণার্থীদের ভাগ থেকে কয়েকটি কম্বল পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে কয়েকটি মশারী। খাওয়া নিয়ে প্রায়ই গোলমাল হয়। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় আগরতলায় সব কিছুরই দাম বেশি। প্রায় সবকিছুর দাম কেজি প্রতি ১ টাকা ২০ নয়া। এই নয়া শব্দটি শুনলেই আমাদের ছেলেরা হাসে। তখন ভারতে নয়া পয়সা চালু হয়েছে। ৬৪ পয়সার এক টাকার পরিবর্তে চালু হয়েছে একশ’ পয়সার এক টাকার দশমিকের হিসাব। আমাদের ছেলেরা এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ নয়। তাই বাজারে গিয়ে কখনো ঠকে কখনো জেতে।
আমাদের নিয়মিত খাবার ডাল, ভাত ও মিষ্টি কুমড়া। মাছ এবং ডিমের খুব দাম। সব কিছুই তল্কালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগরতলায় আমদানি। সীমান্তে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। ডিম, মাছ, তারকারির দাম বাড়ে।
