আগরতলায় আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আবদুল গাফফার চৌধুরী ও অধ্যাপক পুলিন দে’র সঙ্গে। গাফফার আমাকে বলেছিল, আপনি লুঙ্গি পরে দাড়ি রেখে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কেন? আমি বলেছিলাম আমি প্রকাশ্যে ঘুরতে চাই না। আমি আমার বাংলাদেশে ফিরে যাব। গাফফার হেসেছিল।
পুলিন বাবু বললেন, চলো তোমাকে এক কংগ্রেস নেতার কাছে নিয়ে যাই। কংগ্রেস নেতার নাম সুখময় সেনগুপ্ত। তিনি পরবর্তীকালে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। সুখময় বাবুর সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনারা আমাদের সাহায্য করছেন কেন? পাকিস্তান ভারতের এক নম্বর শত্রু। সেই পাকিস্তানে সংঘর্ষ হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে মার খেয়েছে হিন্দুরা। তারপর মার খাচ্ছে সকল সম্প্রদায়। দুর্গত হিন্দুদের জন্যে আপনারা সীমান্ত খুলে দিলে তার একটা অর্থ হয়। সকল সম্প্রদায়ের জন্যে সীমান্ত খুলে দিলেন কেন? আমাদের আশ্রয় দিচ্ছেন এবং যুদ্ধের জন্যে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন কেন?
সুখময় বাবু কিছুটা বিমর্ষ হলেন। হয়তো এ ধরনের প্রশ্ন আগরতলায় গিয়ে কেউ করেনি। পুলিন বাবুও কিছুটা হতবাক হলেন। সুখময় বাবু বললেন, এ প্রশ্নের জবাব একমাত্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীই দিতে পারেন। আপনি নয়াদিল্লি গিয়ে তাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করুন।
কথা জমল না। সুখময় বাবু আমার আত্মীয়-স্বজনের কথা জানতে চাইলেন। বললেন, আগরতলায় অভিজাত এলাকায় আমার নাকি অনেক আত্মীয় আছে। তিনি বললেন, আপনি হোটেল ছেড়ে তাদের বাসায় উঠুন। আমি রাজি হলাম না। পাকিস্তান হয়েছে ১৯৪৭ সালে। তারপর ২৩ বছর কেটে গেছে। এই ২৩ বছরে আমি ভারতে যাইনি। অধিকাংশ সময় কেটেছে জেলে অথবা পুলিশ এড়িয়ে আত্মগোপন করে। কোনো আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে আমার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। আর একাত্তর সালে আগরতলার সকল বাঙালিই বিপর্যস্ত। সকলের বাড়িতেই শরণার্থী। এই পরিবেশে কাউকে বিব্রত করার ইচ্ছে আমার ছিল না। তাই হোটেলে ফিরে গেলাম।
এবার সিদ্ধান্ত হলো, কোলকাতা যেতে হবে। আরএসপির পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত হয়ে আমাদের অনেক বন্ধু ভারতে ঢুকেছে। কে কোথায় আছে জানি না। সকলের খোঁজ নিতে হবে। সকলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। চেষ্টা করতে হবে যুদ্ধের জন্যে প্রশিক্ষণ নেয়ার এবং সে পরিপ্রেক্ষিতে আমার কোলকাতায় যাওয়া একান্ত জরুরি।
কিন্তু কোলকাতায় যাওয়া আমার পক্ষে সহজ ছিল না। ১৯৪৭ সালের পর আমার মা-ভাই-বোন সকলেই ভারতে। তাদের সঙ্গে আমার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের বাড়িতে কাকা আছেন। তবে জেল আর পুলিশ এড়াতে গিয়ে আমার পক্ষে বাড়ি যাওয়া হয়নি। দেশের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কটাই ক্ষীণ।
তাই পশ্চিমবঙ্গ গেলে আমাকে বিপদে পড়তে হবে। মা-ভাই-বোন হয়তো কেউই রাজি হবে না আমাকে আবার বাংলাদেশে ফিরে যেতে দিতে। অথচ আমাকে বাংলাদেশে ফিরতেই হবে। যুদ্ধের মধ্যেই বাংলাদেশে আসতে হবে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে। টাকা সংগ্রহ করতে। দলের সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্যে ভারতে নিয়ে যেতে। তাই স্থির করলাম আমি পশ্চিমবঙ্গে যাব। কিন্তু মায়ের সঙ্গে দেখা করব না। মার সঙ্গে দেখা হবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে।
আগরতলা থেকে কোলকাতা যাওয়ার দু’টি পথ আছে। একটি বিমান। অপরটি সড়ক পথে। বিমানে যাওয়ার মতো টাকা ছিল না। তাই সড়ক পথেই যাত্রা শুরু করলাম। সড়ক পথ একান্তই দুর্গম। আগরতলা থেকে পাহাড়ি পথে ধর্মনগর ১২৮ মাইল। একদিনে পৌঁছানো যায় না। ধর্মনগর থেকে ট্রেন যায় লামডিং। লামডিং থেকে কলকাতার ট্রেন। কোনো পথেই আমার জানা ছিল না।
৩৬ ঘন্টায় আগরতলা থেকে ধর্মনগর পৌঁছলাম। লামডিং পৌঁছলাম পরদিন বেলা দুটায়। সামনে একটি ট্রেন পেয়ে উঠে পড়লাম। জানতাম না ট্রেনটি যাচ্ছিল দিল্লি। ট্রেনটি ছিল সামরিক বাহিনীর জন্যে রিজার্ভ। আমি ছাড়া কোনো বেসামরিক ব্যক্তি ওই ট্রেনে উঠল না। ট্রেনে দেখা হলো বিহার রেজিমেন্টের সদস্যদের সঙ্গে। তখন বাংলাদেশের মানুষের কোনো অপরাধই অপরাধ বলে গণ্য হতো না। জয় বাংলা শব্দটি শুনলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। বিহার রেজিমেন্টের লোকেরা আমাকে লুফে নিল। সাংবাদিক জেনে সব কথা জানতে চাইল। গল্প করতে করতে রাত কেটে গেল। ওরাই আমাকে খাওয়াল। পরের দিন দুপুরের দিকে জিজ্ঞাসা করলো-তুমি তো কলকাতা যাবে। আর এ ট্রেনতো যাচ্ছে দিল্লি। তুমি নামবে কোথায়? এবার আমার সম্বিত ফিরল। আমাকে নামতে হলো বিহারের বাবঙ্গিনী স্টেশনে। বলা হলো, ওখানে হাওড়া যাওয়ার ট্রেন আছে। তুমি ওই ট্রেনে কলকাতা পৌঁছতে পারবে।
আমার মা আসানসোলে থাকতেন। আমার সিদ্ধান্ত ছিল আসানসোল এড়াতে হবে। আসানসোল হয়ে কলকাতায় যাওয়া যাবে না। এখন মার সঙ্গে দেখা করলে বাংলাদেশে ফিরতে অসুবিধা হতে পারে। অথচ আমি জানতাম
যে ট্রেনটায় আমি চেপেছি ওই ট্রেন আসানসোলে দাঁড়াবে। কোনো খবর না রেখেই আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
ভোরের দিকে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম ট্রেনটি নড়ছে না। স্টেশনের নাম আসানসোলে। মনটা কেমন হয়ে গেল। মা-ভাই-বোন সকলের কথাই মনে পড়ল। কিন্তু আমার নামা হলো না। কলকাতায় গিয়ে আরএসপি অফিসে উঠলাম।
