আরেকটি চিত্র দেখছি শরণার্থী শিবিরে। আগরতলায় শরণার্থীদের শতকরা ৯০ জনই হিন্দু সম্প্রদায়ের। যুদ্ধের কারণে সীমান্তের অসংখ্য মুসলমান পরিবারও আগরতলায় আশ্রয় নিয়েছে। লক্ষ্য করেছি অধিকাংশ শরণার্থী শিবিরে যুদ্ধ বিগ্রহের কোনো খবর নেই। অধিকাংশ হিন্দু ধরে নিয়েছে। তাদের আর দেশে ফেরা হবে না। ১৯৪৭ সালের পরে বারবার তারা আক্রান্ত হয়েছে। পাকিস্তানে কোনো রাজনৈতিক গোলযোগ দেখা দিলেই তারা হয়েছে প্রথম শিকার। এবারও তারাই প্রথম বিপদে পড়েছে। তারা জানে না এ যুদ্ধ কবে শেষ হবে। তারা জানে না বাংলাদেশ কবে স্বাধীন হবে। শুধু এইটুকু জানে যে, তাদের পক্ষে সেকালের পূর্ব পাকিস্তানে কোনোদিন ফিরে যাওয়া আদৌ সম্ভব নয়। তাই তাদের স্থায়ী আশ্রয় খুঁজতে হবে। চাকরি খুঁজতে হবে। বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে বিয়ে দিতে হবে। তাদের কাছে যুদ্ধ অনেক গৌণ। প্রতিদিনের সমস্যাই মুখ্য। লাইনে দাঁড়িয়ে রেশন নিতে হবে। সরকারি সাহায্য নিতে হবে। ফলে দেখা গেল হিন্দু যুবকদের মধ্যে ভয়ভীতি আবেগ উচ্ছ্বাস থাকলেও যুদ্ধে তারা যোগ দিচ্ছে না। যদিও তাদের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।
অপরদিকে মুসলমান যুবকদের চোখে ভিন্ন চিত্র। তাদের বাড়ি ফিরতে হবে। সে বাড়ির নাম পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের নাম বাংলাদেশ না হলে তাদের দেশে ফেরা সম্ভব না। দেয়ালে তাদের পিঠ ঠেকে গেছে। যুদ্ধ ছাড়া বিকল্প কোনো পথ তাদের চোখের সামনে নেই। আগরতলায় পৌঁছবার পূর্বে এ ধরনের কথা মনে কোনোদিনই জাগেনি।
তাই আগরতলা পৌঁছে বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। ভাবলাম তাহলে কী হচ্ছে? আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, দলীয় পরিচয় দিয়ে এখানে কোনো প্রশিক্ষণ নেয়া যাবে না। ব্যক্তি হিসেবে আমি পরিচিত বলে আমি হয়তো কিছু সুযোগ সুবিধা পাব। কিন্তু আমাদের দলের কারো পক্ষে সরাসরি রিক্রুট হয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যাওয়া সম্ভব নয়। রিটের কালে রাজনৈতিক পরিচয় হবে বড় পরিচয়। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকলে প্রশিক্ষণের জন্যেও গ্রহণযোগ্য হবে না।
এ পরিস্থিতিতে আর এক বিপদে পড়লাম কাজী হাতেম আলীকে নিয়ে। তার প্রচণ্ড জ্বর। আমি ভাবছি তখন কলকাতা যাবো। মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে কথা বলব।
তবে আগরতলায় তখন আমরা একেবারে নিঃসহায় নয়। স্থানীয়ভাবে কিছুটা সাহায্য পাচ্ছিলাম ত্রিপুরার বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল আরএসপির কাছ থেকে। এছাড়া ত্রিপুরার বাঙালিরা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে আমাদের সকলকেই বুকে জড়িয়ে ধরেছিল। তখন ত্রিপুরার জনসংখ্যা ছিল ১৬ লাখ আর মুক্তিযোদ্ধা এবং শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ। ওই ১৬ লাখ মানুষ আমাদের সর্বদা পাশে দাঁড়িয়েছিল। কারণ এদেরও একটা আবেগ ছিল। এরা পাকিস্তান সৃষ্টির পর বৃহত্তর কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং চট্টগ্রাম থেকে ভিটেমাটি ছেড়ে ত্রিপুরা এসে আশ্রয় নেয়। এদের একটা স্মৃতি আছে। সেই স্মৃতি আঁকড়ে ধরে তারা বাঁচতে চায়। সেই স্মৃতি তাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। ৭১-এর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই স্মৃতি তীব্র আবেগের সৃষ্টি করে। এ আবেগের জন্যে তল্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৪ লাখ বাঙালিকে তারা কোলে তুলে নিয়েছিল। যে কোনো কারণেই হোক এ সত্যতা কোনোদিন কারো কলমে আসেনি।
আমরা বারবার ভারত সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাই ৭১-এর সহযোগিতার জন্যে। কিন্তু কেউই মনে করার চেষ্টা করি না যে, ত্রিপুরা পশ্চিমবাংলা এবং আসামের বিস্তীর্ণ এলাকায় বাঙালিরা না। থাকলে আমাদের কী হতো। সে বাঙালি আমাদেরই লোক। এপারের বাঙালি ওপারে গিয়ে উদ্বাস্তু। উদ্বাস্তুর মর্মজ্বালা থেকেই তারা লাখ লাখ উদ্বাস্তুকে জায়গা দিয়েছে। স্নেহ ভালোবাসা দিয়েছে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত শ্ৰীমতী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ববাসীর কাছে কোটি কোটি বাঙালি উদ্বাস্তুর কথা বলেছেন। বলেছেন, এ সঙ্কটের কোনো সমাধান না হলে এই উদ্বাস্তুদের ভরণ-পোষণ তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি কোনোদিনই উল্লেখ করেননি, এই উদ্বাস্তুদের অনেকেই সাহায্য এবং সহযোগিতা পেয়েছেন তাঁদের নিজেদের স্বজনদের কাছ থেকে। ভারতবর্ষের সীমান্ত এলাকায়। বাঙালিরা না থাকলে অবস্থা কী দাঁড়াতে আজ বোধ হয় তা কল্পনা করা যায় না।
এ পরিস্থিতি আগরতলায় আমাকে বিব্রত করত। সেখানে আলাপ করার মতো তেমন কেউ ছিল না। আগরতলার খেলার মাঠে থাকতেন সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্য। তিনি কোলকাতার দৈনিক যুগান্তরের প্রতিনিধি। এক সময় তিনি বাংলাদেশের খবরাখবরের মধ্যমণি হয়ে গেলেন। আগরতলা হয়ে যারা ভারতে ঢুকেছেন, তাঁরা সকলেই তাঁর বাসায় থেকেছেন। তাঁর বাসায় সকল দলের ভিড়। সকলেই সেখানে থাকতেন। আগরতলায় কোনো সমস্যা নিয়ে আলাপ করতে হলে অনিল দা-ই ছিল একমাত্র ভরসা।
এমন সময় খবর পেলাম অতীন দা আগরতলায় এসেছেন। অতীন দা হচ্ছেন কুমিল্লার অতীন্দ্রমোহন রায়। অগ্নিযুগের বিপ্লবী। অশীতিপর বৃদ্ধ মানুষটি আগরতলায় পৌঁছালেন প্রায় নিঃস্ব হয়ে।
অতীন দা’র একমাত্র পুত্র অসীম রায় চৌধুরী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের রসায়নের ডেমোনেস্ট্রেটর। একমাত্র কন্যার বিয়ে হয়ে গেছে। কুমিল্লার বাড়িতে পুত্র ও পুত্রবধু নিয়ে তিনি থাকতেন। পাকিস্তান বাহিনী হামলা শুরু করার পর অতীন দা’র বাড়ি আক্রান্ত হয়। তাঁর পুত্র অসীমসহ পাকবাহিনী ধরে নিয়ে যায় দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকেও। অসীম এবং ধীরেন বাৰু আর ফিরে আসেননি ক্যান্টনমেন্ট থেকে। অতীন দা’ চলে এসেছেন আগরতলায়। কুমিল্লায় রয়ে গেছে অজন্তা। তাঁর পুত্রবধূ। আমি অতীন দা’র সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। দেখলাম অতীন দা’র কোনো পরিবর্তন নেই। কুমিল্লায় যে অতীন দাকে দেখেছি, সেই অতীন দা’কেই আগরতলায় দেখলাম। অতীন দা সম্পর্কে বিপ্লবী প্রতুল গাঙ্গুলীর একটি মন্তব্য আছে। প্রতুল গাঙ্গুলী ছিলেন অনুশীলন সমিতির প্রধান নেতা। তিনি লিখেছেন, অতীনের কাছ থেকে কথা বের করা খুবই মুশকিল। অনুশীলন সমিতির নীতি হচ্ছে, কোনো গোপন তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। অতীন দা তার জীবনে পার্টির নির্দেশে পুলিশের দুই সহযোগীকে খুন করেছিলেন, আমৃত্যু সে কথা কাউকে কোনোদিন বলেননি। দলের নেতা হিসেবে জানতেন প্রতুল গাঙ্গুলী। তাঁর মৃত্যুর পূর্বে প্রতুল গাঙ্গুলী সে কথা লিখে গেছেন। আমিও কোনোদিন চেষ্টা করে অতীন দা’র কাছ থেকে সে কথা জানতে পারিনি। সেই নিপ নীরব অতীন দা’কে আবার আগরতলায় দেখলাম। আগ বাড়িয়ে তিনি আমাকে বললেন না যে, পাকিস্তানি বাহিনী অসীমকে ধরে নিয়ে গেছে। অসীম ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফিরে আসেনি।
