মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ। একদিন দুপুরে মোহাম্মদ হোসেনের হোন্ডার পেছনে চড়ে আমি ডেমরার ওপারে তারাবো পৌঁছলাম। তারাবোতে নরসিংদীগামী বাস। তারাবোতে হাতেম আলীকে সঙ্গে নিয়ে এসে উঠলাম। লক্ষ করলাম বাসে সব যাত্রী আমাদের চেনা। আমাদের নামতে হলো মাধবদী।
মাধবদী থেকে মেঘনার পাড়। রাত কাটিয়ে পরের দিন করিমপুর। করিমপুর থেকে খানাবাড়ি হয়ে দুদিন পর নবীনগর। নবীনগর থেকে ভারত সীমান্ত। একদিন সন্ধ্যার আঁধারে আমি আর হাতেম আলী অচেনা আগরতলা শহরে পৌঁছলাম। হোটেলের সামনে নতুন এক দেখা দেখলাম। কে যেন লিখে রেখেছে হিন্দু হোটেলের সামনে হিন্দু মুসলমান বুঝি না, বাঙালি ছাড়া চিনি না। অর্থাৎ আগরতলা শহরের রূপান্তর হচ্ছে। অসংখ্য বাঙালি হিন্দু অধুষিত আগরতলা শহরের সীমান্তের ওপার থেকে অসংখ্য বাঙালি এসেছে। সবাই মিলে একাকার হয়ে গেছে। সবাই বাঙালি। সব হোটেলেরই দুয়ার খোলা। আমি এবং হাতেম আলী একটি মুসলিম হোটেলে গিয়ে উঠলাম। একজনের ঘুমাবার মতো এক চিলতে একটি খাট দুজনে ভাড়া করলাম। কারণ আমাদের সঙ্গে সীমিত টাকা। জানি না কে কীভাবে আমাদের সাহায্য করবে। এবার শুরু হলো ৭১-এর ভারতীয় জীবন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আরেক দৃশ্য। আরেক ছবি।
আগরতলায় পৌঁছে মনটা যেন কেমন হয়ে গেল। সীমান্ত পাড়ি দেয়ার দিন মনটা খারাপ ছিল। সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে গেছে। আমরা ৭ জন সীমান্তে দাঁড়িয়ে। আমি, কাজী হাতেম আলী ও নরসিংদীর আরো ৫ জন তরুণ। সীমান্ত পাড়ি দেয়ার আগে আমার মনে হলো, এভাবে চোরের মতো পালিয়ে ভারতে যাব না। ২৩ বছর পাকিস্তান সরকার পাসপোর্ট দেয়নি। তবুও পাকিস্তানের ভয়ে চোরের মতো দেশ ছেড়ে পালাইনি। আমি প্রস্তাব করলাম, চলো আমরা ঢাকায় ফিরে যাই।
কিন্তু সঙ্গীরা রাজি হলো না। তারা বলল, কোথায় উঠবেন। কে আমাদের জায়গা দেবে? ইচ্ছে হলেই আবার নবীনগর হয়ে ঢাকা ফিরে যাওয়া সম্ভব কি? আমি বুঝতে পারলাম ওদের নিয়ে ঢাকায় ফিরে যাওয়া যাবে না। এবার সবাই মিলে একটা কাজ করলাম। বাংলাদেশের সীমান্ত পার হওয়ার আগে বাংলাদেশের কিছুটা মাটি সবাই পকেটে নিলাম। বললাম, যেখানেই মরি না কেন আমাদের সঙ্গে বাংলাদেশের মাটি থাকবে। আজ এত বছর পরে মনে হচ্ছে কী ছেলেমিই না করেছি। বাস্তবের কঠিন আঘাতে সে ভাবাবেগ খান খান হয়ে ভেঙে গেল ভারতের মাটিতে।
আগরতলার মাটিতে কত স্রোত। কত লোক। কত মত। আজ হয়তো তা নিশ্চিত করে বলতে পারব না। কিন্তু অনেকেই বারবার আমার লেখা পড়ে উন্মা প্রকাশ করেন। কারণ আমি বানিয়ে লিখতে পারি না। তাই বানিয়ে লেখার কাহিনীর সঙ্গে আমার মতানৈক্য ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে।
আগরতলায় গিয়ে প্রকৃতপক্ষে বিপদে পড়ে গেলাম। আগরতলায় মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে বিভাজন একান্তই স্পষ্ট। আওয়ামী লীগের উপদলীয় কোন্দল এবং আওয়ামী লীগ বনাম অন্যান্য দলের কোন্দল সকলের কাছেই জানা ব্যাপার। আগরতলায় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের দফতরের নাম হচ্ছে জয়বাংলা অফিস। এ জয়বাংলা অফিসের দায়িত্বে একান্তভাবেই আওয়ামী লীগ কর্মী এবং নেতারা। অন্যান্য দলের অনুপ্রবেশ সেখানে কঠিন। সুসম্পর্ক না থাকলে জয়বাংলা অফিস থেকে অন্যান্য দলের সুযোগ-সুবিধা পাওয়া আদৌ সম্ভব নয়।
ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ নেতৃত্ব তাজউদ্দিনের নেতৃত্ব মানতে চাচ্ছে না। তাজউদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে তারা বৈঠক করছে। যুদ্ধের প্রথম দিকে ন্যাপ এবং কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সমঝোতা হয়নি। তাই ন্যাপকে আগরতলায় জনসভা করতে দেখেছি ঐক্যফ্রন্ট গঠনের দাবিতে।
এই মতানৈক্য ও ঝগড়াঝাটির মধ্যে দেখেছি হাজার তরুণকে আগরতলার রাস্তায় ভিড় জমাতে। ওরা গ্রাম থেকে এসেছে। ওরা জানে না কোথায় যাবে। কোথায় ট্রেনিং নেবে। কীভাবে যুদ্ধ করবে। কোনো রাজনৈতিক নেতার কৃপাদৃষ্টি না পড়লে এরা যে মুক্তিযুদ্ধ যেতে পারবে না, এ ধারণাও তাদের ছিল না। ফলে অনেক তরুণকেই যুদ্ধ না করে দেশে ফিরতে হয়েছে। হয়তো দেশে এসে তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করেছে বা সীমান্তের ওপারে যাবার জন্যে গর্ব অনুভব করেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই রাইফেলের বাট পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারেনি। নেতৃত্বের ব্যর্থতায় পরবর্তীকালে এই শ্রেণির তরুণেরাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যা করবার নয়, তাই করেছে।
তবে কাহিনী এখানেই শেষ নয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র সীমান্তের ওপারে গিয়ে যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছিল। তাদের প্রশিক্ষণের প্রথম দিকে তাদের রাজনৈতিক প্রশ্ন তখন মুখ্য হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ১৯৭১ সালের মে মাসে আমি দেখলাম রাজনৈতিক প্রশ্ন তখন মুখ্য হয়ে উঠেছে। ডানপন্থী বামপন্থী নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বামপন্থী বলে পরিচিত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত তরুণদের ফ্রন্টে যেতে দেয়া হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত এদের অনেকেই প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের বা দলের উদ্যোগে বাংলাদেশে এসে ঢুকেছে। নিজের এলাকায় নিজের মতো করে, যুদ্ধ করেছে। আগরতলা পৌঁছবার পূর্বে এ দৃশ্য দেখবার ধারণা আমার ছিল না।
