সেদিন এ আশ্বাসে কতদূর সাহসী হয়েছিলাম আজকে মনে নেই। তবে তার অনুরোধ রেখেছিলাম। লাউখোলায় হোটেলে খেতে খেতে ৪ তরুণের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাদের নাম জিজ্ঞাসা করিনি। আজো তাদের চিনি না। তাদের সঙ্গে হেঁটে জাজিরা এসেছিলাম। প্রবল ঝড়ের মধ্যে নৌকায় পদ্মা পাড়ি দিয়েছিলাম। রাতে ছিলাম নাগেরবাজার এক বাড়িতে। ভোরে এসেছিলাম হলদি। হলদি থেকে শ্রীনগর। শ্রীনগর থেকে লঞ্চে সৈয়দপুর। তখন আমি একা। ওই ৪ তরুণ বাসে উঠে চলে গেছে। হাতে একটি ব্যাগ নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি সৈয়দপুর বাসস্ট্যান্ডে। কিন্তু আমার সে বন্ধু আসছিল না। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে এক সময় মনে ভয় পেয়ে গেলাম। মনে হলো এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে যে কেউ এক সময় চ্যালেঞ্জ করবে। তাই বাসে উঠলাম নিজ দায়িত্বে। কেরানীগঞ্জ পৌঁছে নৌকায় বুড়িগঙ্গা পার হলাম। সোয়ারীঘাটের পথ ধরে চকবাজারের দিকে এগুচ্ছি। জগন্নাথ কলেজের এক তরুণ অধ্যাপক আমাকে দেখে চিৎকার করে নাম ধরে ডেকে ফেলল। তারপর চুপসে গেল। এ সময় দেখলাম দূরে আমার সে বন্ধু দাঁড়িয়ে। আমি একা একা আসার জন্যে গালমন্দ করলেন। বন্ধুর নাম হারুন। সারাজীবন মুসলিম লীগের সদস্য। তার রাজনীতির প্রথম এবং শেষ নেতা খান এ সবুর। তিনি আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে গেলেন। আর পরবর্তীকালে শুনেছি জগন্নাথ কলেজের সেই অধ্যাপক ঘাতকের হাতে প্রাণ দিয়েছেন।
৭১-এর এপ্রিলের ঢাকা। সে কাহিনী লিখতে হলে মহাভারত হবে। কোন বন্ধু কোথায় আছে জানি না। কেউ প্রত্যাশা করেনি, আমি ঢাকায় ফিরব। কারণ তখন সকলেই ঢাকা থেকে পালাচ্ছিল। বন্ধু রুহুল আমিন কায়সার রায়েরবাজার স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি নবাবগঞ্জের এক গ্রামে চলে গেছেন। আরেক বন্ধু সিদ্দিকুর রহমান টিকে আছে ঢাকায়। আমার ঢাকায় আশ্রয় পাওয়া মুশকিল। চোখ-মুখে দেখে মনে হয় সবাই আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু আশ্রয় দিতে চায় না। সকলের মুখে একই প্রশ্ন, এ সময় ঢাকায় এলেন কেন? আপনার কি জীবনের ভয় নেই।
জীবনের ভয় আমার ছিল। কিন্তু কেউ জানি না, এ যুদ্ধে আমরা কী করব। সবাই জানি একটা যুদ্ধ আসছে। সবাই সমালোচনা করেছি শেখ সাহেবকে ৭ মার্চ সুস্পষ্টভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা না দেয়ায়। অথচ কেউ কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করিনি। মনে হয়, শেখ সাহেব ঘোষণা দিলেই সব ল্যাঠা চুকে যেতো। কিন্তু অদ্ভুত রাজনীতিক আমরা। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে সকলেই ভেবেছিল, ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসভায় শেখ সাহেব সুস্পষ্ট ভাষায় বলবেন-বাংলাদেশ স্বাধীন ঘোষণা করা হলো। শেখ সাহেব একই কথা বললেন ঘুরিয়ে। আমরা কেউ খুশি হলাম না। বিশেষ করে সমালোচনার ঝড় উঠলো বামপন্থী মহলে। আমরা তত্ত্ব দিয়ে প্রমাণ করলাম, এ ধরনের স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়া বুর্জোয়া নেতৃত্বের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সত্যি সত্যি যখন যুদ্ধ এসে গেল তখন অনুধাবন করতে পারলাম, তত্ত্ব দেয়া ছাড়া আমরা কোনো কিছুই করিনি। সংগ্রামের জন্যে নিজের দলকেও প্রস্তুত করিনি। শুধুমাত্র দলের নামের প্রথমে পাকিস্তান বা পূর্ব পাকিস্তান কেটে বাংলাদেশ প্রতিস্থাপন করেছি। আর দেখছি এ পরিস্থিতিতে ভারত সরকার এগিয়ে আসছে সহযোগিতা করতে। সুতরাং আমার পালাবার পথ কোথায়? আমাকে ঢাকা আসতে হবে। বন্ধুদের সঙ্গে বসতে হবে। বুঝতে হবে এ যুদ্ধ কোনদিকে গড়াবে। এ যুদ্ধে আমাদের ভূমিকা কী হবে? এই চিন্তা থেকেই আমি বাড়ি থেকে ঢাকা এসেছিলাম। শুধু বাড়ির লোককে বলে এসেছিলাম, যত হামলাই হোক বাড়ি ছাড়া যাবে না। শত হামলার মুখে আমার স্বজনরা সে ভূমিকাই পালন করেছিল। যদিও পরবর্তী মাসগুলোতে আমি তাদের কোনো খবর রাখতে পারিনি। সাহায্য সহযোগিতাও করিনি।
ঢাকা এসে সিদ্ধান্ত হলো, নবাবগঞ্জে যেতে হবে। নবাবগঞ্জে রুহুল আমিন কায়সার আছেন। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। খবর পেলাম ইতিমধ্যে আমাদের কিছুসদস্য সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলা ও কলকাতায় গিয়েছে। তারা যোগাযোগ করেছে আমাদের এককালীন রাজনীতিক বন্ধু বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল আরএসপির নেতাদের সঙ্গে। আমাদের ছেলেরা কুষ্টিয়া সীমান্তে ভারতের মাটিতে প্রথম শিবির গড়ে তুলেছিল।
নবাবগঞ্জে সিদ্ধান্ত হলো আমাকে কোলকাতা যেতে হবে। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ও ভারতীয় বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। কিন্তু আমার যাওয়া তেমন সহজ ছিল না।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হয়। আমার মা-ভাইবোন সকলেই ভারতে চলে যায়। ১৯৪৮ সালে আমি জেলে চলে যাই। জেল থেকে ফিরতে ফিরতে পাঁচ বছর। তারপর জেল আর আত্মগোপন করতে করতে ষাটের দশক এসে গেলো। আর ১৯৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত ২৩ বছর পাকিস্তান সরকার কোনোদিন আমাকে পাসপোর্ট দেয়নি। ওই ২৩ বছর আমার সঙ্গে দেখা হয়নি মা-ভাই বোনদের। ২৩ বছর পর আমাকে বলা হচ্ছে, আমাকে এবার ভারত যেতে হবে। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে। সীমান্ত অতিক্রম করে। এই পালিয়ে যাওয়া নিয়ে আমার কাছে একটা মানসিক প্রশ্ন উঠেছিল।
ইতিমধ্যে আমি রায়েরবাজারে আশ্রয় পেয়েছি। আশ্রয়দাতা আমাদের নগর কমিটির সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন–সে এক অদ্ভুত মানুষ। তিনি আমাকে আশ্রয় দিলেন। তাঁর স্ত্রী পুত্র কেউই জানত না, আমি কে। লক্ষ্মীপুরের এক মওলানা সাহেব তার বাড়িতে গৃহশিক্ষক ছিলেন। ছেলেমেয়েদের ধর্মশিক্ষা দেয়া ছিল তাঁর দায়িত্ব। এই মওলানা সাহেব এবার বাড়ি গেলেন। তাঁর পদে আমি নিযুক্ত হলাম। ধর্ম শিক্ষা দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। মোহাম্মদ হোসেনের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমি রাজনীতির গল্প করতাম। যাবার আগে মওলানা সাহেব বললেন, হুজুর আপনি তো আদৌ পড়াচ্ছেন না। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সারাদিন নকশালদের মতো গল্প করেন। এ পরিস্থিতিতে স্থির হলো আমি ভারতে যাব। আমার সঙ্গে যাবে আমাদের নরসিংদীর অন্যতম কর্মী কাজী হাতেম আলী।
