আমার কাকীমার অসুখের খবর পেয়ে ৯ মার্চ আমি বাড়ি চলে গেলাম। বেতারে খবর পাচ্ছিলাম যে কোনো মুহূর্তে নাকি আপোষ হয়ে যেতে পারে। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমার মনে হচ্ছিল আপোষ সমঝোতা করতে হলেও রক্তপাত হবে। সাধারণ মানুষকে ধারণা দেয়া হচ্ছে, এবার বাঙালির শাসন কায়েম হবে। কিন্তু ভোটে হলো না। তাই সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া আমাদের হাতে ক্ষমতা আসবে না। কিন্তু এ সংগ্রামের প্রস্তুতি কোথায়? এ সংগ্রামের নেতৃত্ব কে করবে? এ সংগ্রামে কে আমাদের সাহায্য করবে? সে সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট মীমাংসা হওয়ার পূর্বেই ২৬ মার্চ ভোরে ঢাকার বেতারে ভিন্ন কণ্ঠ শুনলাম। বুঝলাম সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেছে।
২৫ মার্চ বাড়ি ছিলাম। আজ বলতে দ্বিধা নেই যে, ২৫ মার্চ এমন করে সংকটের গভীরতা বুঝতে পারিনি। আমার কাছে প্রশ্ন ছিল, এ যুদ্ধে জিতব কী করে–এ যুদ্ধে কে আমাদের সাহায্য করবে বা কেন করবে।
দুদিন পর বুঝলাম গ্রামে থাকা যাবে না। আমাদের মহকুমা গোপালগঞ্জ। আওয়ামী লীগ এখানে জনপ্রিয়। প্রতিপক্ষও কম শক্তিশালী নয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করায় এ মহল ভীত শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর হামলা শুরু হওয়ায় এরা ঘুড়ে দাঁড়াল। নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করল। এদের প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়াল হিন্দুদের বাড়ি লুট করা। হঠাৎ করে গ্রাম গ্রামান্তরে একটি সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে গেল। পাকিস্তান সরকারের প্রচারণায় প্রথম দিকে বিভ্রান্ত হলো মানুষ। হিন্দুরা ভয় পেয়ে গেল। বাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করল। ফলে সুবিধা হলো লুটেরাদের। এ লুটপাট যখন শুরু হলো তখন পাকিস্তান বাহিনী গ্রাম গ্রামান্তরে যায়নি। সুতরাং যে সকল ঐতিহাসিকেরা লুটপাটের জন্যে শুধুমাত্র পাকিস্তান বাহিনীকে দায়ী করেন, তাদের সঙ্গে আমি একমত নই। প্রকৃত চিত্র হচ্ছে আমরাই প্রথম লুটপাট শুরু করেছিলাম। একটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পরিণত করতে চেয়েছিলাম আমরাই। এ সত্যটি চেপে গিয়ে, এক সময় আমরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা সেজেছিলাম। আজ এত বছর পর সেই মুক্তিযোদ্ধাদের আচরণ দেখে হা-হুঁতাশ করছি। ৭১-এর সংগ্রাম সম্পর্কে প্রথম থেকেই সঠিক মূল্যায়ন হলে আজকে এ হতাশা কোনোক্রমেই সৃষ্টি হতো না।
২৫ মার্চের পর একটি দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় গ্রাম-গ্রামান্তরে। সকলেই বিভ্রান্ত কে কোন দিকে যাবে? সাধারণ হিন্দুরা ভাবছে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে জীবন রক্ষা করাই একমাত্র কাজ। এক শ্রেণির মুসলমান ভাবছে এটা কী হলো? এ পরিস্থিতি কেন হলো? এ সংকটের সমাধান কী?
এ সময় বিপদে পড়ল আরেক শ্রেণির মানুষ। এই মানুষগুলো শহরে ছিল। শহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলা হওয়ায় তারা শহর ছেড়ে গ্রামের পথ ধরেছে। পথে পথে তারা সাদর অভ্যর্থনা পেয়েছে। তাদের খাবার দিয়েছে। বাড়িতে পৌঁছবার জন্যে অর্থ সাহায্য করেছে।
কিন্তু গ্রামে ফিরে এই শহরের মানুষগুলো বিভ্রান্ত হয়েছে। গ্রামে তখন লুটপাটের পরিবেশ। একদল মানুষ বুকে পাকিস্তানি পতাকা এঁকে অন্যের সম্পত্তি দখলের সংগ্রামে নেমেছে।
৭১ এর যুদ্ধের এই প্রথম দিকে আমি বাড়িতে ছিলাম। তখন আগরতলা বেতারে বাংলাদেশের কথা শুনতাম। মনে হতো ভারত সরকার আমাদের এ যুদ্ধে সহযোগিতা করবে। কিন্তু আমি স্থির নিশ্চিত ছিলাম না। একটি পুঁজিবাদী দেশ বাংলাদেশের সংগ্রামে সহযোগিতা করে যুদ্ধ করে দেবে, এ তত্ত্ব কোনোদিনই আমার বিশ্বাসে আসেনি। এ সময় থানা থেকে খবর দেয়া হলো আমার গ্রামে থাকা নিরাপদ নয়। আমি পরবর্তীকালে টুঙ্গীপাড়ায় গেলাম। টুঙ্গীপাড়ায় তখন শেখ সাহেবের বাড়ি আক্রান্ত। বরিশালে এলাম বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করতে। আমাদের দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ৪ জন সদস্যই তখন বরিশালে অবস্থান করছেন। তাঁদের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ হলো। সিদ্ধান্ত হলো তারা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাবেন। বলা হলো, এবারের যুদ্ধে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়া এবং অস্ত্র সংগ্রহ করা। এ যুদ্ধকে মুক্তি সংগ্রামে পরিণত করতে হলে, এ যুদ্ধ দীর্ঘদিন চলবে। সুতরাং দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
এ হচ্ছে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহের কথা। বরিশালে আমির হোসেন আমুর সঙ্গে দেখা হলো। সে জানালো মুজিবনগর সরকার গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ১৮ বা ১৯ এপ্রিল বরিশালে বোমা বর্ষণ করা হতে পারে। আপনি এ শহর থেকে চলে যান। ১৯ এপ্রিল বাসে গৌরনদীর টরকী বন্দরে এলাম। টরকী থেকে মেদাকুল–হিন্দুপ্রধান গ্রাম। মেদাকুল গিয়েছিলাম টাকার জন্যে। আমার এককালীন ছাত্রদের বাড়ি। গিয়ে দেখলাম সকলেই ভীত সন্ত্রস্ত। মেদাকুলেই বরিশালে বোমা হামলার কথা শুনলাম। সবাইকে গ্রাম ছেড়ে বিলের দিকে চলে যেতে বললাম। কারণ পাকিস্তানি বাহিনীর বিলে পৌঁছানোর মতো কোনো যানবাহন নেই এবং সত্যি সত্যি পরবর্তীকালে হাজার হাজার মানুষ এই বিল এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করে বেঁচেছিল। বিল এলাকাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল মুক্তিবাহিনী।
২০ এপ্রিল আমি আবার বাড়ি ফিরলাম। ২০ মাইল হাঁটা পথে। বাড়িতে এসে দেখি ভয় আর ভয়। আমি বাড়ি ফিরে আসায় সবাই ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু কোথায় যাব? কয়েকদিনের জন্যে বিল এলাকায় ছিলাম। সে এলাকাও নির্ভয় নয়। এবার সঙ্গী জুটে গেল। ঢাকা থেকে গ্রামে যাওয়ার একটি পরিবার ঢাকায় ফিরতে চাচ্ছে। আমি তাদের সঙ্গে রওনা হলাম নৌকায়। নৌকায় কোটালীপাড়া থেকে মাদারীপুর। মাদারীপুরে লঞ্চ পেতে হবে। লঞ্চে আসতে হবে ঢাকা। নৌকায় মোটামুটি নির্বিঘ্নে এসেছিলাম। কিন্তু বিপদ হলো মাদারীপুরে এসে। মাদারীপুরে লঞ্চ নেই। লঞ্চ ওপারে। কালিকাপুরে অসংখ্য যাত্রী। কিন্তু ঢাকা থেকে লঞ্চ আসছে না। সন্ধ্যার দিকে দুটি লঞ্চ এল। খবর হলো একটি লঞ্চ ছাড়ার পর মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার কাছে সামরিক বাহিনীর লোক ৪ জন যাত্রীকে নামিয়ে নিয়ে খুন করেছে। এর মধ্যে দু’জনের অপরাধ তারা হিন্দু। অপর দুজন আওয়ামী লীগ কর্মী। এ খবর শুনে অধিকাংশ যাত্রী বাড়ি ফিরে গেল। আর অনেক অনুনয় বিনয়ের পর একটি লঞ্চ ঢাকায় যেতে রাজি হলো। কিন্তু লঞ্চ কর্তৃপক্ষ কিছুতেই আমাকে নিতে রাজি নয়। ইতিমধ্যে আমার পরিচয় সবাই জেনে গেছে। আমার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ-রাজনীতিক, সাংবাদিক এবং পিতার নাম বাংলায়। অন্যান্য যাত্রীরাও আমার জন্যে উত্তষ্ঠিত। আমার সহযাত্রী বন্ধু এটি নিষ্পত্তি করলেন। নিস্পত্তি হচ্ছে পদ্মা পাড়ি দেয়ার আগে আমাকে লাউখোলায় নামিয়ে দেয়া হবে। তারপর আমার নিজ দায়িত্বে ঢাকা পৌঁছতে হবে। জীবনে লাউখোলার নাম শুনিনি। ওপথে কোনোদিন যাইনি। কিন্তু নিরুপায়। আমার সহযাত্রী বন্ধু বললেন, আপনি লাউখোলা থেকে হেঁটে জাজিরা যাবেন। জাজিরা থেকে পদ্মা পাড়ি দেবেন নৌকায়। লৌহজং থেকে যে কোনো উপায়েই হোক শ্রীনগর পৌঁছবেন। শ্রীনগর থেকে লঞ্চে সৈয়দপুর আসবেন। সৈয়দপুর বাসস্ট্যান্ড দাঁড়িয়ে থাকবেন। একা বাসে উঠবেন না। আমি সৈয়দপুর গিয়ে আপনাকে নিয়ে আসব।
