তখন ছিল রোজার মাস। ছোট এক নৌকায় চড়ে আমরা রাঙ্গাবালী পৌঁছালাম। রাঙ্গাবালী পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমার ক্ষিধে পেয়ে গিয়েছিল। এক সময় গফুর রানারকে বললাম, আমাকে ভাত খেতে হবে। গফুর রানার যেন আকাশ থেকে পড়ল। রোজার মাসে আমি কেন ভাত খাব। এ প্রশ্ন তাকে বিপর্যস্ত করল। এক সঙ্গে দু’রাত থাকা সত্ত্বেও রানার কখনো আমার নাম জিজ্ঞাসা করেনি। নদীর জলে মানুষ মরা গন্ধ বলে সারাদিন তাদের সঙ্গে আমি না খেয়ে থেকেছি। সন্ধ্যার পর তাদের সঙ্গে বিস্কুট ও মগ ভর্তি চা খেয়েছি। ভাত খাইনি কোনোদিন।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর যেন গফুর রানারের চমক ভাঙল। সে কোনো কথা বলল না। আস্তে আস্তে তার ব্যাগটি কাঁধে নিল। আমার চোখের সামনে থেকে যেন নির্বিঘ্নে মিলিয়ে গেল। আমি বুঝলাম বড় বেশি আঘাত পেয়েছে গফুর রানার। আমি কোথায় জন্মেছি। কী আমার নাম। তা সে জানত না। আমাকে সে গভীরভাবে ভালোবেসেছিল। গফুর রানারের বয়স ৫০ পেরিয়েছে। সে কখনোই ভাবতে পারেনি আমার সঙ্গে তার এমন একটা ফারাক থাকতে পারে। সে বেদনায়, বিস্ময়ে মূক হয়ে গিয়েছিল। কথা ছিল আমি তার বাড়ি যাব। সকলের সঙ্গে পরিচিত হব। কিন্তু আমার এক মুহূর্তের পরিচয়ে সবকিছু ভণ্ডুল হয়ে গেল।
আমি বিপদে পড়ে গেলাম। রাঙ্গাবালীতে কাউকে আমি চিনি না। গফুর রানারের আচরণ আদৌ আমাকে দুঃখ দেয়নি। আমাকে বিমর্ষ করেনি। এই উপমহাদেশে জন্মগ্রহণ করে এ ছবিই দেখেছি বছরের পর বছর। আমি ঘর পোড়া গরু হলেও সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পেতে ভুলে গেছি।
রাঙ্গাবালী বাজারে বসে আছি। কিছুক্ষণের জন্য একটি ব্রিটিশ হেলিকপ্টার ওখানে নামল। তাদের আমি আমার অবস্থান জানালাম। তাদের হেলিকপ্টারে বাড়তি আসন ছিল না। শুধু আশ্বাস দিল যে ওয়ারলেসে তারা আমার লঞ্চে খবর দেবে যে আমি আটকে গেছি। আমাকে যেন উদ্ধার করা হয়। হেলিকপ্টার চলে যাবার পর টিএন্ডটির একটি স্পিড বোট পৌঁছল রাঙ্গাবালীতে। ওরা আমাকে নিতে রাজি হলো না। ওরা বলল, ওদের একটি ইঞ্জিন বিকল। দ্বিতীয় ইঞ্জিনটি দিয়ে চালিয়ে এসেছে। বাড়তি যাত্রী নিতে হলে স্পিড বোট চলবে না। এবার রাঙ্গাবালী বাজারে মানুষগুলো যেন ক্ষেপে গেল। তারা বলল, এই সাংবাদিক সাহেবকে না নিয়ে গেলে এই স্পিড বোট আমরা তুলে ফেলব। এখান থেকে যেতে দেব না। ওই স্পিড বোটে চড়েই আমি গলাচিপা হয়ে গভীর রাতে পটুয়াখালী পৌঁছেছিলাম। তবে কথা সত্য যে স্পিড বোটটির স্বাস্থ্য ভালো ছিল না। ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় পথের মাঝে আমাদের থামতে হয়েছে।
আমার সাংবাদিক জীবনের ইতিহাসে নিয়মিত লেখালেখি শুরু এই ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে। এই ঘূর্ণিঝড় নিয়ে লেখালেখির এক পর্যায়ে একদিন গভীর রাতে একটি ফোন পেয়েছিলাম। ফোন করেছিলেন এক দম্পতি। তাঁদের আবেদন হচ্ছে আপনার কলম বন্ধ করুন। আপনার লেখা পড়ে প্রতিরাতে আমাদের কাঁদতে হয়। এই লেখা উল্লেখ করেই ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দিন আবুল কালাম ফোন করেছিলেন ইতালি থেকে। ফোনে বলেছিলেন, নির্মল, ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে তোর একটা লেখা ইতালির পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। লেখার শিরোনামহাশেম চৌধুরী একটি লাশ চায়।
হাশেম চৌধুরীর বাড়ি গলাচিপা থানার চরকাজল। চরকাজলে আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল ঘূর্ণিঝড়ের পরে। ঘূর্ণিঝড়ে তিন পুত্র আর এক কন্যা নিয়ে হাশেম চৌধুরী এক সময় জলে ঝাঁপ দিয়েছিল। নিজে ফিরে এসেছিল। কিন্তু ফিরিয়ে আনতে পারেননি একটি সন্তানকেও। সেই হাশেম চৌধুরীকে আমি দেখেছি নদীর তীরে ঘুরে বেড়াতে। হাশেম চৌধুরী অন্তত একটি লাশ চায়। সে লাশটি নিজের বাড়িতে কবর দেবে। ওই কবরকে কেন্দ্র করে স্মৃতি ধরে রাখবে তার হারিয়ে যাওয়া সন্তানের।
জানি না হাশেম চৌধুরী কেমন আছে। ১৯৭০ সালের পর পটুয়াখালীর দক্ষিণে যাওয়া হয়নি। এই ঘূর্ণিঝড় ও মৃত্যুর পরিস্থিতিতেই ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচন পাকিস্তান সামরিক শাসনকে বিপদে ফেলে দেয়। পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের আসন সংখ্যা ৩১৩। জঙ্গি সরকারের ধারণা ছিল পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। অথচ আওয়ামী লীগ ১৬৭ আসনে জয়ী হলো। এ পটভূমিতে আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী না করে উপায় ছিল না। অথচ জঙ্গি সরকারের হিসাব ছিল পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান মিলে আওয়ামী লীগ বিরোধীদলগুলো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। কিন্তু পরিস্থিতি হয়ে গেল বিপরীত।
অপরদিকে আওয়ামী লীগও সঙ্কটে পড়ে গেল। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়ায় ক্ষমতায় যাওয়া ছিল নিশ্চিত। বাঙালিদের প্রত্যাশা ছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে ৬ দফা বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু ৬ দফা বাস্তবায়ন সহজ ছিল না। ৬ দফার সামগ্রিক অর্থ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এ কথা কারো অজানা ছিল না। কিন্তু সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ তখন স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার পর্যায়ে ছিল না। প্রস্তুতিও ছিল না। তাই আওয়ামী লীগও সঙ্কটে পড়ে গেল।
ছাত্রলীগের একটি অংশের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার প্রস্তাব উত্থাপন করা হলো। এ প্রশ্নে ছাত্রলীগ দু’ভাগ হয়ে গেল। কোনোদিনই আওয়ামী লীগের সভায় দেশ স্বাধীন করার প্রস্তাব উঠল না। স্বাধীনতার প্রশ্নে আওয়ামী নেতৃত্বে চরম বিরোধ। এ বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পূর্বেই সামরিক সরকারের সঙ্গে বিরোধ দেখা দিল। পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো সেনাবাহিনীর একটি অংশের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করলেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অসম্ভব করে তুললেন। ফলে পূর্ব পাকিস্তানে তার চরম প্রতিক্রিয়া হলো। প্রকাশ্যেই স্বাধীনতার কথা বলা হতে লাগল। এ পরিস্থিতিতেই ১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্যে স্থগিত ঘোষণা করলেন। প্রতিবাদে শেখ সাহেবকে চরম সিদ্ধান্ত নিতে হলো। রেসকোর্স ময়দানে তিনি ঘোষণা দিলেন—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” সেই জনসভায় আমিও ছিলাম। আমার মনে হলো, ইচ্ছে হলেও আওয়ামী লীগ বা শেখ সাহেবের পিছু হটবার পথ নেই। আজ হোক বা কাল হোক বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই এবং সে সংগ্রাম হবে রক্তাক্ত। দীর্ঘস্থায়ী। আমি তখন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এ যুদ্ধে কে সাহায্য করবে! কাছাকাছি কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশ নেই। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক গভীর। পাশে ভারত। এটি একটি পুঁজিবাদী দেশ। বাঙালি বলে পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরার মানুষের আমাদের জন্যে সহানুভূতি থাকতে পারে না। কিন্তু তারপরও ভারত সরকার আমাদের সাহায্য করল।
