আমরা আমাদের এ বক্তব্যের ভিত্তিতে জনসভা করি। প্রচারপত্র ছাপাই এবং ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যে নির্বাচনে আমরা অংশ নিইনি।
১৯৭০ সালের নির্বাচন হয়েছিল ৭ ডিসেম্বর। উপকূল এলাকায় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল ১২ নভেম্বর। এই ১২ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে আমার জীবনের কতগুলো বিশেষ ঘটনা আছে। আমি তখন দৈনিক পাকিস্তানের শিফট ইনচার্জ। আমি রিপোর্টার নই। আমার ঘূর্ণিঝড় এলাকায় যাবার কথাও নয়। কিন্তু আমি ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিলাম।
তখন দৈনিক পাকিস্তানের বার্তা সম্পাদক তোয়াব খান। তাঁকে বললাম, আমি ঘূর্ণিঝড় এলাকায় যাব। এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় হয়তো আমাদের জীবনে আসবে না। তাই এর ক্ষয়ক্ষতি নিজের চোখে দেখা প্রয়োজন। দৈনিক পাকিস্তানের পয়সায় নয়, আমি নিজের খরচেই যাব। তোয়াব খান রাজি হলেন। ঘূর্ণিঝড়ের ১০ দিন পর অর্থাৎ ২২ ডিসেম্বর আমি পটুয়াখালী পৌঁছালাম। দৈনিক পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এ এলাকায় গেলেন মনসুর আহমদ। ফটোগ্রাফার আকিল খান।
কাউকেই আমি পটুয়াখালীতে পেলাম না। তারা গলাচিপায় চলে গেছেন। কিন্তু গলাচিপায় কী করে যাব। কোনো লঞ্চ নেই। সকল পরিবহন সরকারি তত্ত্বাবধানে রিলিফ কাজে ব্যস্ত। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও ঢাকা থেকে লঞ্চ ভাড়া করে রিলিফে গিয়েছে। এ ধরনের একটি লঞ্চ ভাড়া করে ন্যাপের নেতারা গিয়েছিলেন রিলিফের জন্যে। ঐ লঞ্চে ছিলেন মতিয়া চৌধুরী। তাঁদের লঞ্চে আমি গলাচিপায় গেলাম।
২৩ নভেম্বর আমি গলাচিপায় ঘুরছি। ইতোমধ্যে দেখলাম গলাচিপায় হইচই শুরু হয়ে গেছে। সামরিক বাহিনীর একটি লঞ্চ এসেছে। নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাপ্টেন পাঞ্জাবি লেরা খান। দেখলাম এসেই লেরা খান খুব তৎপর হয়ে গেছেন। গলাচিপা বাজারে একটি পুল ভাঙা ছিল। লেরা খান থানা কর্তৃপক্ষকে ধমক দিয়েছিলেন স্থানীয় চেয়ারম্যানকে ধরে আনতে। বাধ্য করেছিলেন দু’ঘণ্টার মধ্যে পুলটিকে মেরামত করতে। সন্ধ্যার দিকে দেখলাম লেরা খান ত্রাণ শিবিরগুলোর দিকে যাচ্ছেন। খোঁজ নিচ্ছেন দুর্গতরা রিলিফ পেয়েছে কিনা। দুর্গতরা কেঁদে কেঁদে তাদের অভিযোগ জানাচ্ছে। আমাদের ফটোগ্রাফার আকিল খান হিন্দি, উর্দু দুই ভাষায়ই ভালো কথা বলতে পারে। আমি আকিল খানকে বললাম, তুমি ঐ ক্যাপ্টেন-এর সঙ্গে কথা বলো। আমি তার সঙ্গে আলাপ করতে চাই।
সন্ধ্যার দিকে লেরা খানের সঙ্গে দেখা হলো। দেখলাম ক্যাপ্টেন খুব উত্তেজিত। ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসেছেন। তিনি বললেন, ১২ তারিখ ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। অথচ আমাদের এখানে আসতে খবর দেয়া হয়েছে ১৬ তারিখ। আমাদের আসতে বলা হয়েছে নৌপথে। আমরা সড়কপথে যশোর থেকে খুলনা এসেছি। খুলনায় আমাদের একটি লঞ্চ দেয়া হয়েছে। সে লঞ্চ এত ধীর গতিতে চলে যে আমাদের গলাচিপা আসতে এক সপ্তাহ লেগে গেছে। এখানে এসে দেখি অব্যবস্থা। সবাই লুটপাটে ব্যক্ত। তাই আজ থেকে আমরাই রিলিফের দায়িত্ব নিয়েছি।
একজন সাংবাদিক হিসেবে এটুকুই ছিল আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। একটি খবর পেলাম। খবরটি হলো উদ্রুত এলাকায় রিলিফের দায়িত্ব সামরিক বাহিনী গ্রহণ করেছে। আমি ব্যতীত কোনো সাংবাদিক সেদিন এ খবরটি পেল না। ক্যাপ্টেন ক্যাম্প থেকে বের হয়ে আমি ডাকঘরে গিয়ে দৈনিক পাকিস্তানে তার করলাম। পরের দিন একমাত্র দৈনিক পাকিস্তানেই খবর হয়েছিল উদ্রুত এলাকায় রিলিফের দায়িত্ব সামরিক বাহিনী গ্রহণ করেছে।
কিন্তু সংবাদ গ্রহণ করতে গিয়ে আমি আমার যানবাহন হারিয়ে ফেললাম। ন্যাপের লঞ্চ ছেড়ে গিয়েছে। শুনলাম তারা দক্ষিণে গিয়ে কালাইয়ার দিকে যাবে। কিন্তু আমি যাব কোথায়। শেষ পর্যন্ত ক্যাপ্টেনের সঙ্গে আবার দেখা করলাম। বললাম, আমি তোমার সঙ্গে যাব। তুমি কোনদিকে যাচ্ছে। ক্যাপ্টেন কথা দিলেন। তাঁদের সঙ্গেই আমি যাব এবং রাতে লঞ্চেই থাকব।
লঞ্চে উঠে বিপদে পড়ে গেলাম। কী খাব? নদীর জলে মানুষ মরা গন্ধ। চারদিকে লাশ। একফোঁটা জল খাওয়া যায় না। কোনো কিছু খেতে গেলে বমি হয়। গভীর রাতে ক্যাপ্টেন এটা লক্ষ করলেন। বললেন–তোমাকে বড় এক। মগ চা করে দিচ্ছি। কিছু বিস্কুট নাও। সামরিক বাহিনীর বড় মগে চা আর বিস্কুট খেয়ে সে রাত কেটে গেল।
লঞ্চেই সঙ্গী জুটে গেল। সঙ্গীর নাম গফুর রানার। গফুর রানার গলাচিপা থেকে ডাক নিয়ে প্রতিদিন রাঙ্গাবালী যায়। ঘূর্ণিঝড়ের পর রাঙ্গাবালীতে ডাক যায়নি। গফুর রানার গলাচিপায় আটকে গেছে। এবার সামরিক বাহিনীর লঞ্চ পেয়ে গফুর রানার এলাকায় ফিরছে।
গফুর রানারের কথা ফুরায় না। আমি নির্বাক। গফুর রানার বলে এ লঞ্চ দক্ষিণে গিয়ে আগুনমুখা নদীতে যাবে। আগুনমুখা থেকে আরো দক্ষিণে গিয়ে এ নদী বঙ্গোপসাগরে গেছে। আগুনমুখায় গিয়ে বয়ে পানপট্টি হয়ে নদী যাবে কাজলের দিকে। আমরা সোজা যাব ডিক্রি নদীর ধরে গাবুনিয়ার দিকে। গাববুনিয়ার কাছে রাঙ্গাবালী, বাহিরদিয়া, নৌডুবি, ছোট বাইশদিয়া।
শৈশব থেকে আগুনমুখার নাম শুনেছি। শুনেছি আগুনমুখার তুফান ভারি। ঝড়ের মৌসুমে লঞ্চ বা স্টিমার এই এলাকায় গিয়ে যাতায়াত করে না। একমাত্র ওই এলাকার নৌকার মাঝি ব্যতীত কেউ আগুনমুখায় পাড়ি জমাতে সাহস পাবে না। সেই আগুনমুখা পাড়ি দিয়ে এক সময় ডিক্রি নদী ধরে আবার বায়ে গিয়ে আমরা গাবুনিয়ার কাছে আটকে গেলাম। নদীতে জল কম। লঞ্চ ঠেকে গেছে। এবার কী হবে? আমরা কি এগুতে পারব না। গফুর রানার বলল, ভয়ের কিছু নেই। আমরা নৌকা নিয়ে রাঙ্গাবালী চলে যাব। রাঙ্গাবালী থেকে কয়েক মাইল দূরে গফুর রানারের বাড়ি। সে বাড়িতে কেউ আছে কিনা গফুর রানার জানে না। ওই এলাকায় প্রতি ঘরে ঘরে মৃত্যুর কান্না। অনেক বাড়িতে ছায়া পড়বার মতো লোক নেই। নিঝুম ভুতুড়ে বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে। গফুর রানারের ইচ্ছা আমি প্রতিটি বাড়িতে যাই। আমি সাংবাদিক। আমি গ্রামে গ্রামে গেলে এলাকার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হবে। এলাকার মানুষ রিলিফ পাবে।
