তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের বামপন্থীরা একই সঙ্কটে পড়েছিল ষাটের দশকে। আজ অনেকেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের সংগ্রাম পর্যন্ত মূল্যায়ন করতে গিয়ে অনেক কথা লিখছেন। অনেক তত্ত্ব দিচ্ছেন। এদের মধ্যে অনেকেই ১৯৬৯ সালেও শেখ সাহেবকে হটকারী বলেছেন। মার্কিন দালাল বলেছেন। ৬ দফার বিরোধিতা করেছেন। অথচ নিজেরা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো বিকল্প পথের সন্ধান দিতে পারেননি। তাই ১৯৬৯ সালে ৬ দফার দাবিদার আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগই সাধারণ মানুষের সামনে এসেছে। কেউ মনে রাখেনি ১৯৫৪ সালের পর এক ইউনিট ও সংখ্যা সাম্য মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগের বিশ্বাসঘাতকতার কথা। কেউই মনে রাখেনি যে আওয়ামী লীগ নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী সহযোগিতা না করলে কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকার বাঙালিদের এত বঞ্চিত করতে পারত না। কারণ আওয়ামী লীগ বিশ্বাসঘাতকতা করলেও জনতার আন্দোলনে ছিল। জনতার সঙ্গে থেকে সাধারণ মানুষের কথা বলেছে। আবার নিজের বিশ্বাসঘাতকতার কথা স্বীকার করে নিজেকে সংশোধন করেছে। জনতার নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে জনতার সামনে এসেছে। ফলে ভালো ভালো কথা বলে এবং সঠিক যুক্তি দিয়েও বামপন্থীরা জনতার কাছে যেতে পারেনি। তাই সঙ্কটে পড়ে গেছে ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া খান নির্বাচনের ঘোষণা দেবার পর।
এ কথা সত্য, ইয়াহিয়া খানের দেয়া কাঠামোর মধ্যে নির্বাচনে যাওয়া যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ নির্বাচনে গেলে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যারা নির্বাচনে যাবেন না বলছেন ঘটনা প্রবাহে তাদের কোনো গুরুত্বই থাকবে না। তাই দেখা গেল এক এক করে সব দলই নির্বাচনে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। ভিন্ন বক্তব্য দিল পিকিংপন্থী ন্যাপ বলে পরিচিতি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ভাসানী ন্যাপ। তখন পশ্চিমবঙ্গে চারু মজুমদারের নেতৃত্বে নকশালবাড়ি আন্দোলন শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছে চাষিদের জমি দখলের লড়াই। এ আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে পিকিং বেতার। তাদের বক্তব্য হচ্ছে নির্বাচন বর্জনীয়। সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমেই ক্ষমতা দখল করতে হবে। তাই পূর্ব পাকিস্তানে ভাসানী ন্যাপের দাবি হচ্ছে, ভোটের আগে ভাত চাই। অর্থাৎ ভাতের ব্যবস্থা হলেই ভোটে অংশগ্রহণ করা যায়। আর সকলের জন্যে ভাতের ব্যবস্থা করতে হলে বিপ্লব অনিবার্য। তাদের স্লোগান যখন তখনই বিপ্লবের। অথচ দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এ দলটি আদৌ কোনো শ্রেণিসংগ্রামের দল নয়। বিপ্লবের দল তো নয়ই। তবে শেষ পর্যন্ত এ দলটিকে বিপ্লব বা নির্বাচন-এর কোনোটাই করতে হয়নি।
১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর উপকূল এলাকায় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয়। লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। এ বক্তব্যের ভিত্তিতে মওলানা ভাসানী নির্বাচন বর্জন করেন। শেখ সাহেব হুমকি দেন, ঘূর্ণিঝড়ে আরো ১০ হাজার লোক মারা গেলেও ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন হবেই। কারণ তাঁর ভয় ছিল কোনো অজুহাত গেলে সামরিক বাহিনী নির্বাচন স্থগিত করবে। পাকিস্তানে কোনোদিন নির্বাচন হবে না। ক্ষমতা হস্তান্তর হবে না।
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অনেকের ধারণা মাওলানা ভাসানী শেখ সাহেবের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচন বর্জন করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল এবারের নির্বাচন নির্ধারণ করবে কে বাঙালির স্বার্থের পক্ষে আর কে-ই বা বাঙালির স্বার্থের বিপক্ষে। তাই এবারের নির্বাচনে বাঙালির ভোট বিভক্ত করা কঠিন হবে না। সবাই যাতে নৌকায় ভোট দেয় সে প্রস্তুতিই নিতে হবে। এ নির্বাচন নিয়ে আমরাও কম বিপদে পড়িনি। আমাদের শ্রমিক কৃষক দল গঠিত হয়েছিল। ১৯৬৯ সালের ২৯ আগস্ট। চারদিকে অভ্যুত্থানের পরিবেশ। আমরা দল গঠনের কোনো সুযোগ পেলাম না। নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হলো ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর। ইয়াহিয়ার ঘোষণা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। নীতিগতভাবে এ নির্বাচনে যাওয়ার কোনো পথই আমাদের কাছে খোলা ছিল না।
ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। আমরা তখন চটকল এলাকার একচ্ছত্র নেতা। আমরা ডাক দিলে সকল শিল্প এলাকা স্তব্ধ করে দিতে পারি। আমাদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্যে বিভিন্ন গ্রুপের বামপন্থী নেতারা আসছেন। আসছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশ। তাঁদের সকলের বক্তব্য হচ্ছে, জাতির সামনে দফা একটাই। দফা হচ্ছে দেশকে স্বাধীন করতে হবে। আমরা দেশকে স্বাধীন করার প্রশ্নে তাঁদের সঙ্গে একমত হলাম। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হলে শোষণমুক্ত সমাজ হবে কিনা। আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছ থেকে এ গ্যারান্টি চাই। উপমহাদেশ এর আগেও ভাগ হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। একবার হিন্দু-মুসলমান হিসেবে দেশ ভাগ হয়েছে। এবার বাঙালি হিসেবে দেশ ভাগ হওয়ার প্রস্তাব আসছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে সমাজ পরিবর্তনের কোনো কথা হচ্ছে না। আমরা স্বাধীনতার পক্ষে শক্তির কাছ থেকে এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি চাই।
আর নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে-ইয়াহিয়ার দেয়া কাঠামোতে নির্বাচনে জয়ী হলেও ক্ষমতা পাওয়া যাবে না। কারণ সকল ক্ষমতাই প্রেসিডেন্টের হাতে। সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া পাকিস্তানের সামরিক জান্তার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। সুতরাং নির্বাচন বাদ দিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি নেয়াই এ মুহূর্তে সময়ে দাবি। কারণ নির্বাচনের ফলাফল প্রতিকূল হলে নতুন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সংগঠিত করা কঠিন হবে। তখন নির্বাচনের ফলাফলের ওপর দাঁড়িয়েই সামরিক জান্তা বিশ্ব জনমতকে নিজের পক্ষে নিতে পারবে। আমাদের প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। তাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ নয়, ইয়াহিয়া ঘোষিত নির্বাচনী কাঠামো বাতিলের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলাই এ মুহূর্তে দায়িত্ব এবং কর্তব্য। এই কাঠামোর মধ্যে নির্বাচন করলে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো সম্ভাবনা নেই।
