প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণা সব দলকেই বিপদে ফেলে দেয়। এই ঘোষণায় গণতন্ত্রের চিহ্ন ছিল না। সুতরাং প্রকাশ্যে এই শর্ত মেনে নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা খুবই কঠিন। সকল বামপন্থী দল প্রথমে এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের কথা ছিল, নির্বাচনে অংশগ্রণ করব। নির্বাচনে জয়লাভ করব। জয়লাভ করার পর সিদ্ধান্ত নেব ওই শর্ত আমরা মানব কিনা।
এ সময় এই শর্তের বিরুদ্ধে অগ্নিযুগের বিপ্লবী নেতা প্রয়াত ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী (মহারাজ) একখানা পুস্তিকা লেখেন। এই বইয়ে তিনি দাবি করেন রাষ্ট্রপ্রধানের পদটি সব সম্প্রদায়ের লোকদের জন্যেই খোলা রাখা উচিত। কিন্তু তার বক্তব্য কোনো কাজে আসেনি। ততক্ষণে জল অনেক দূর গড়িয়েছে। এখানে লক্ষণীয়, বামপন্থী কোনো দলই ভাবতে চেষ্টা করেনি যে ১৯৪৭ সাল, ১৯৭০ সাল নয়। এই ২৩ বছরে বাঙালি সমাজে সেনাবাহিনী থেকে সচিবালয় পর্যন্ত অনেক পেশাজীবী সৃষ্টি হয়েছে। তারা লক্ষ্য করেছে বাঙালি বলেই তারা বঞ্চিত। একই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে। সেকালে ভারতের মুসলমানদের ধারণা ছিল তারা মুসলমান বলেই বঞ্চিত। তাই মুসলমানদের জন্যে পাকিস্তান দরকার। আর ষাটের দশকের ধারণা হলো, বাঙালিদের জন্যে একটা কিছু করা দরকার। আমরা স্বাধীন হই বা না হই আমাদের এমন কিছু করতে হবে যার ফলে আমরা বাঙালি বলে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারি এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারি। অবিভক্ত ভারতের ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তৎকালীন মুসিলম লীগ এ নির্বাচনকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লড়াই হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ওই নির্বাচনে মুসলিম লীগ সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল অবিভক্ত বাংলায়।
১৯৫৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল সাধারণ নির্বাচনে। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠন হয়। যুক্তফ্রন্ট ২১ দফার ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। সাধারণ মানুষ যুক্তফ্রন্টকে ভোট দেয়। যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীরা শতকরা ৯৭টি আসন দখল করে। সেকালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে মুসলিম লীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কিন্তু বাঙালি নেতৃত্ব এ বিজয় ধরে রাখতে পারেনি। সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের খপ্পরে পড়ে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যায়। এই নেতারাই কেন্দ্রে পাকিস্তানের নেতৃত্বের সঙ্গে সহযোগিতা করে।
পাকিস্তানকে দুই ইউনিটে ভাগ করে। ওই দুই ইউনিটের ভিত্তিতে শতকরা ৫০ ভাগ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সেকালের বাঙালি নেতৃত্ব আঁতাত করে। অথচ জনসংখ্যার অনুপাতে বাঙালিরা ছিল শতকরা ৫৬ ভাগ। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এবং শেরে বাংলার নেতৃত্বে কৃষক শ্রমিক পার্টি দুই ইউনিট মেনে নেয়। বিক্ষুব্ধ বাঙালিদের তখন কিছু করার ছিল না। বামপন্থীরা সংগঠিত নয়। এককভাবে নেতৃত্ব দিয়ে তাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব ছিল না। ফলে ডান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে বিকল্প কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। সেকালে বিকল্প কোনো আন্দোলন গড়ে উঠলে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্নরকম হতো। বলা যায় রাজনৈতিক দিক থেকে তখন এক বিরাট শূন্যতা ছিল। এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে ১৯৫৮ সালে বেসামরিক আমলাদের সহায়তায় সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় আসে। দেশে সামরিক আইন জারি হয়। এই সামরিক আইন প্রথম দিকে জনগণ উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করলেও পরবর্তীকালে অনুভূত হতে থাকে যে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম না করলে ব্যবসা-বাণিজ্য চাকরি থেকে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। শুধু ব্যবসায়ী মহলে নয়, বাঙালি আমলা ও সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা প্রতি পদে পদে এই কঠিন সত্য অনুভব করতে থাকে। তাই তারাই প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এগিয়ে আসে। যার নেতৃত্বে ছিলেন নৌবাহিনীর কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন এবং ক্যাডার সার্ভিসের ফজলুর রহমান, রুহুল কুদুস প্রমুখ। এই সংগ্রামকে রাজনৈতিক রূপ দেয়ার জন্যেই শেখ মুজিবুর রহমানকে এই আন্দোলনে জড়ানো হয় এবং এঁদের সহযোগিতায়ই ১৯৬৬ সালে শেখ সাহেব ৬ দফা দাবি তোলেন।
৬ দফার এই পটভূমি সম্পর্কে বামপন্থীরা অবহিত থাকলেও সেকালের এক শ্রেণির বামপন্থীর মধ্যে আন্তর্জাতিকীপনার নিদারুন প্রভাব ছিল। তারা সব কিছুই সমাজতান্ত্রিক শিবির বনাম সাম্রাজ্যবাদী শিবিরে বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যায়ন করে। এককভাবে দেশীয় সমস্যার প্রতি তাদের ঝোঁক ছিল একান্তই গৌণ। সুতরাং তাদের কাছে শেখ সাহেবের দেয়া ৬ দফা ছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র একটি দলিল। তারা মনে করতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে ভাগ করতে চায়। সেই লক্ষ্যেই ৬ দফা প্রণীত হয়েছে। সুতরাং ৬ দফা পরিত্যাজ্য। এই ৬ দফার মধ্যে যে বাংলাদেশের বিভিন্ন শ্রেণির আশা-আকাক্ষার প্রতিফলন আছে সে কথা তারা আমলেই আনল না।
এই ভুল ব্রিটিশ আমলে ভারতের বামপন্থীরা করেছিল। তারা লাহোর প্রস্তাবকে শুধুমাত্র ব্রিটিশের ষড়যন্ত্র বলে ধরে নিয়েছিল। কিন্তু লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাবে যে এক শ্রেণির মুসলমানদের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন আছে সে সত্যটি বামপন্থীরা এড়িয়ে গেল। সেদিন এই অপ্রিয় সত্যটি মেনে নিয়ে বামপন্থীরা সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে হয়তো উপমহাদেশের মানচিত্র অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু বামপন্থীদের ভুলের জন্য কংগ্রেস মুসলিম লীগ এবং ব্রিটিশের ষড়যন্ত্রই সফল হলো। ভ্রাতৃঘাতি দাঙ্গায় হাত রাঙিয়ে উপমহাদেশকে ভাগ করা হলো। ভাইয়ের রক্ত গেল। কিন্তু সমস্যার সমাধান হলো না।
