নভেম্বরের প্রথমদিকে ঢাকায় বাঙালি-বিহারি সংঘর্ষ শুরু হয়। বিহারির উর্দু ভাষায় ভোটার তালিকা দাবি করে। নভেম্বরে তারা হরতাল ডাকে। সংঘর্ষে ১ জন নিহত ও ১৯ জন আহত হয়। ২৮ নভেম্বর ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। এক ইউনিট ভেঙে দেয়া হয়। বলা হয়, এক ব্যক্তির এক ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর বলা হয়, ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি হতে প্রকাশ্যে রাজনীতি করা যাবে।
ইয়াহিয়া খানের এ ঘোষণা নিয়ে মতানৈক্য দেখা দেয়। ইয়াহিয়া খান একটি নির্বাচনী আইনগত কাঠামো জারি করেন। এই নির্বাচনী কাঠামো নিয়ে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। ছাত্রলীগ, মতিয়া ছাত্র ইউনিয়ন ও এনএসএফের একটি অংশ ইয়াহিয়ার ঘোষণা সমর্থন করলেও মেনন গ্রুপ এর বিরোধিতা করে।
১৯৭০ সালের পহেলা জানুয়ারি রাজনীতি শুরু হয়। আগের দিন ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে শুরু হয় মিছিল আর মিছিল। আর ওই ৩১ ডিসেম্বর জেনারেল আইয়ুব রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করে। ৩ জানুয়ারি ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন নির্বাচনে বাধা দেয়া হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ইতোমধ্যে ন্যাপের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে ঐক্যের প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু শেখ সাহেব সে প্রস্তাব বাতিল করে দেন। একই দিন করাচিতে এক জনসভায় জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণা করেন পিপলস পার্টি ক্ষমতায় গেলে তিনি মূল শিল্প রাষ্ট্রীয়করণ করবেন।
তখন একটি বৈপরীত্য দেখা দেয়। এই বৈপরীত্য হচ্ছে ৬ দফা ও ১১ দফা নিয়ে। ৬ দফা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মূল বক্তব্য। ছাত্র ইউনিয়নের কোনো গ্রুপই এককভাবে ৬ দফা সমর্থক নয়। ফলে প্রণীত হয় ৬ দফাঁকে ভিত্তি করে ১১ দফা। এই ১১ দফার ব্যাপারে শেখ সাহেব কিংবা আওয়ামী লীগ খুব দৃঢ় নয়। কারণ ১১ দফায় সমাজের মৌলিক পরিবর্তনের কথা আছে। অপরদিকে ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপ, মোজাফফর ন্যাপ অর্থাৎ ওয়ালী ন্যাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু ওয়ালী ন্যাপ ৬ দফা সম্পর্কে একমত নয়। অবস্থা এমন দাঁড়ায়, ১১ দফার ভিত্তিতে সংগ্রামের ডাক দেয়া হলে আওয়ামী লীগ তেমন উৎসাহ দেখায় না। অপরদিকে মোজাফফর ন্যাপ ১১ দফার ভিত্তিতে আন্দোলনে ডাক দিলে ওয়ালী ন্যাপ উচ্চবাচ্য করে না। এই পরিবেশে ২১ জানুয়ারি মওলানা ভাসানী কাগমারিতে কৃষক সম্মেলন ডাকলেন। এই সম্মেলনে শ্লোগান উঠল, ভোটের আগে ভাত চাই, নইলে এবার রক্ষা নাই। অপরদিকে ২০ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলাম পল্টন ময়দানে এক সভার আয়োজন করে। এই জনসভায় শেখ সাহেব ও ৬ দফার বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করা হলে জনসভা ভেঙে যায় এবং এটাই বোধহয় জামায়াত নেতা মওলানা মওদুদীর পূর্ব পাকিস্তানের সর্বশেষ নির্বাচনী জনসভা ছিল। এ সময় ভাসানীপন্থী শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় আর নির্বাচন নয়। বিরামহীন সংগ্রামই হচ্ছে মুক্তির একমাত্র পথ।
অর্থাৎ আন্দোলন তখন সুস্পষ্টভাবে তিনটি ভাগে বিভক্ত হতে থাকে। (১) আওয়ামী লীগ ইয়াহিয়ার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে যাবার পক্ষে। (২) ভাসানী ন্যাপ নির্বাচনে যাবার বিপক্ষে। (৩) ওয়ালী ন্যাপ নির্বাচনে যাবার পক্ষে হলেও ৬ দফা ও ১১ দফার প্রশ্নে তাদের মধ্যে মতান্তর আছে। অপরদিকে ইসলামপন্থী দল ও ভুট্টোর পিপলস পার্টি কঠোরভাবে ১১ দফা বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। তাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, ৬ দফা, ১১ দফার আন্দোলন বাড়তে দেয়া হলে পাকিস্তান ভেঙে যাবে। পরোক্ষভাবে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হতে থাকে কোনোমতেই শেখ মুজিবরের হাতে ক্ষমতা নয়। সারা পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর প্রভাব একটুও ক্ষুণ্ণ হোক সে প্রশ্নে সামরিক বাহিনী একেবারেই অটল। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ক্ষমতায় যেই আসুক না কেন পাকিস্তানের শাসনকর্তা হবে সামরিক বাহিনী। এ প্রশ্নে কোনো আপোষ নেই। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৩১৩। যে কোনো উপায়েই হোক ৬ দফা বিরোধীদের অন্তত ১৫৬ আসন পেতে হবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া নির্বাচনী বিধি বা কাঠামো জারি করেন। এই নির্বাচনী কাঠামোতে বলা হয়
(১) শাসনতন্ত্রে ইসলামী আদর্শকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।
(২) ফেডারেল ইউনিয়ন হবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র।
(৩) গণতন্ত্র ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার থাকবে।
(৪) ফেডারেল শাসনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্র ও প্রদেশের ক্ষমতা ভাগাভাগি হবে।
(৫) অর্থনৈতিক ও বৈষম্য দূরীকরণের ব্যবস্থা থাকবে।
(৬) নির্বাচনী ও জাতীয় পরিষদ যে সংবিধানই রচনা করুন না কেন তাতে প্রেসিডেন্টের অনুমতি লাগবে। প্রেসিডেন্টের অনুমোদন ব্যতীত কোনো সংবিধান বৈধ হবে না। নির্বাচনের ফলাফল গেজেট হবার ১২০ দিনের মধ্যে সংবিধান রচিত না হলে প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন দিতে পারবেন।
অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া গণতন্ত্রের নামে সব ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর কুক্ষিগত করলেন। নির্বাচন একটি প্রহসনে পরিণত হলো, আইনগত কাঠামো ঘোষণার পর। এই আইনগত কাঠামো নিয়েই তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হলো। আমাদের দল শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের পক্ষে থেকে সুস্পষ্টভাবে বলা হলো, এই আইনগত কাঠামোর অধীনে নির্বাচন হলে কোনোদিনই ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে না। সংবিধানসম্মতভাবে ক্ষমতা পেতে হলেও রক্তাক্ত সংগ্রাম অনিবার্য। সুতরাং এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ অর্থহীন। আমরা বলেছিলাম আমরা নির্বাচনের বিরুদ্ধে নই। আমরা নির্বাচনকে সংগ্রামের হাতিয়ার বলে মনে করি। কিন্তু এই নির্বাচনী কাঠামোতে পাকিস্তানকে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করা হবে। ধর্মের নামে সকল গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়া হবে। এ নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো অবকাশ নেই।
