পূর্ব ইউরোপের পূর্ব জার্মান, চেকোশ্লাভাকিয়া, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, রুমানিয়ায় জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবী সম্পর্কে আমাদের ভিন্ন মূল্যায়ন ছিল। আমাদের বক্তব্য ছিল এ সকল দেশে আদৌ কোনো বিপ্লব হয়নি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে বিজয়ী সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল ফৌজ দেশে ফিরে যাবার আগে কমিউনিস্ট পার্টিও তাদের সহযোগীদের দেশে দেশে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়েছে। এ বিপ্লবের সঙ্গে দেশের জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। এ বিপ্লবও ভিন্ন শ্রেণির সমন্বয়ে গঠিত। এই তথাকথিত বিপ্লবের পর সমাজতন্ত্রে উত্তরণের প্রশ্নে নেতৃত্বে মতানৈক্য আছে এবং ইতোমধ্যে হাঙ্গেরি, পূর্ব জার্মানিতেও প্রতি- বিপ্লবের চেষ্টা করেছে। ১৯৪৮ সালেই যুগোশ্লাভ সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে গঠিত কমিন-ফরম (কমিউনিস্ট ইনফরমেশন ব্যুরো ১৯৪৩ সালে স্টালিন তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙে দেবার পর কমিউনিস্ট আন্দোলন সময়ের জন্যে গঠিত) ছেড়ে গেছে। এ প্রশ্নে রুশপন্থী এবং পিকিংপন্থী অর্থাৎ উভয় গ্রুপের সঙ্গে আমাদের অর্থাৎ আরএসপির মতপার্থক্য ছিল স্পষ্ট।
এছাড়া আমাদের সঙ্গে, অর্থাৎ আমরা যারা এককালে আরএসপি করতাম তাদের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির পার্থক্য ছিল বিপ্লবের স্তর নিয়ে। বিভক্ত হবার আগে পূর্ব কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য ছিল ১৯৪৭ সালে ভারতের বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বা জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব অর্ধসমাপ্ত হয়েছে। এই অর্ধসমাপ্ত বিপ্লব সম্পন্ন করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বলতে হবে। কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হলে রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরের কথা বলতে থাকে। আর চীনপন্থী গ্রুপ চীনের টংয়ে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বলতে থাকে। এরপরে নকশালবাড়ি আন্দোলন এলে বলা হয় কৃষি বিপ্লব। আর আমরা বলতে থাকি মেহনতি জনতার বিপ্লবের অঙ্গনে চারটি ধারা স্পষ্ট হয়ে উঠল-১। জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর, ২। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর, ৩। কৃষি বিপ্লবের স্তর, ৪। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর।
সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে–১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বুর্জোয়াদের গণতান্ত্রিক বিপ্লব সমাপ্ত হলেও এ যুগে বুর্জোয়াদের সে বিপ্লবকে সমাপ্ত করতে হবে সর্বহারা শ্রেণিকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে মাধ্যমে। যেমন-ভূমি সংস্কার, গণতান্ত্রিক কায়দায়। অথচ নির্বাচন বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে করণীয় হলেও এ যুগে বুর্জোয়ারা এ অধিকার দেয় না। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে এর একাধিক উদাহরণ আছে। দাবি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে আদায় করতে হবে। তাই এ স্তরে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবির কথা বলেও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বলতে হবে। অর্থাৎ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যে কোনো প্রাচীর নেই। তাই যারা জাতীয় গণতান্ত্রিক বা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরেও বুর্জোয়াদের প্রগতিশীল ভূমিকা আশা করেছেন, আমরা এ বক্তব্যকে সার্বিক মনে করি না।
কৃষি বিপ্লব সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে কৃষকদের নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে বিপ্লব করা যাবে না। কারণ কৃষকদের বিপ্লব ঠেকাতে যারা আসবে তারা ক্ষমতাসীন বুর্জোয়া সরকার। ঐ বুর্জোয়া সরকারকে উৎখাত না করে এককভাবে জোতদার, জমিদারদের উচ্ছেদ করা যাবে না। এ প্রশ্নে সংস্কারের আন্দোলন হতে পারে। বিচ্ছিন্নভাবে কৃষি বিপ্লব হতে পারে না।
এ বক্তব্য নিয়েই ১৯৬৯ সালে ২৯ আগস্ট শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল গঠিত হয়েছিল এবং আমাদের মূল্যায়ন যে সঠিক ছিল তা আজ আর ব্যাখ্যার অবকাশ নেই।
১৯৬৯ সালের আগস্ট মাসে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমাদের জন্ম হলেও ইতিহাসের আর একটি ধারার দিকে আমাদের কোনো নজর ছিল না। আমরা ভেবেছিলাম সর্বহারাদের একটি দল না থাকায় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান গণবিপ্লবে পরিণত হয়নি। এ জন্যে বিপ্লবে বিশ্বাসী একটি বিপ্লবী তত্ত্বের রাজনৈতিক দল প্রয়োজন।
আমরা ভাবিনি যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের একটি ধারার তীব্র আবেগ আছে এবং আবেগ সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে আর একটি সুযোগ আমরা হারাব। পাকিস্তানের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান একই দেশের অধিবাসী হয়ে একটি ভিন্ন পরিচিতির জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানি পরিচয়ের চেয়েও বাঙালি, সিন্ধি, পুশতুন, বালুচ ও পাঞ্জাবি পরিচয় বড় হয়ে উঠছে। এ পরিচয়ের কামনা এবং বাসনার আন্দোলন শ্রেণির আন্দোলনকে ছাপিয়ে উঠছে। বড় হয়ে উঠছে আমি বাঙালি নয়, অবাঙালি। শোষক এবং শোষিতের বিভাজন গৌণ হয়ে উঠেছে। গণআন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান পদত্যাগ করেছেন। সামরিক শাসন জারি করে নেতৃত্বে বসেছেন ইয়াহিয়া। ইয়াহিয়া খান নির্বাচন দেবার প্রতিশ্রুতি দেন।
কিন্তু সে নির্বাচনে কবে? এ নির্বাচনে কোনো ঐক্য হবে কিনা। ইতিমধ্যে নির্বাচন নিয়ে বামপন্থী শিবিরের নতুন কথাবার্তা শুরু হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসগুলো হয়েছে। ২ অক্টোবর শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ব্যক্তি বিশেষের সংবিধান জারি করার কোনো ক্ষমতা নেই। ৯ অক্টোবর ছাত্রলীগের এক সমাবেশে তিনি ‘৫৯ সালের সংবিধানপন্থীদের কড়া সমালোচনা করেছেন। ইতিমধ্যে ন্যাপ এক ইউনিট বাতিলের দাবি জানিয়েছে। ২৯ অক্টোবর জামাত প্রধান মওদুদী বলেছেন, ৬ দফা পাকিস্তানের সংহতির বিরোধী। মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্ববঙ্গ করতে চাচ্ছেন। ঢাকায় রাজধানী আনতে চাচ্ছেন।
