১৯৪০ সালে এই অন্ধ অনুকরণের বিরুদ্ধেই আরএসপির জন্ম হয়। আরএসপির বক্তব্য ছিল লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিন সঠিক পথ অবলম্বন করেননি। আন্তর্জাতিক বিপ্লবের দায়িত্ব প্রহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বার্থের নিরিখে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন স্ট্যালিন পরিচালনা করেছেন। ফলে বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিদেশ নীতির লেজুড়ে পরিণত হয়েছে। এই লেজুড়বৃত্তির জন্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলন সমর্থন করেনি। বলেছে, এটা বুর্জোয়া নেতৃত্বের আন্দোলন। আবার জার্মানিতে হিটলারের উত্থানের পর ১৯৩৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি নির্দেশ দিয়েছে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশীয় বুর্জোয়াদের সমর্থন দিতে এবং এ পরিস্থিতিতেই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি শেষ দিকে সুভাষ চন্দ্র বসুর বিরুদ্ধে গান্ধীর নেতৃত্বই সমর্থন করেছে। আরএসপির সংগঠকরা একে সঠিক পথ বলে মনে করেনি। তাই ভারতবর্ষে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল অর্থাৎ আরএসপি গঠন করে।
প্রশ্ন উঠতে পারে আরএসপি কেন স্ট্যালিন বিরোধী। আরএসপি ট্রটস্কিপন্থী কিনা। আরএসপি দাবি করে আরএসপি লেনিনপন্থী। আরএসপির মূল্যায়ন হলো রাশিয়ায় বিপ্লবের পর স্ট্যালিন এবং ট্রটস্কি দুজনেই ভুল করেছেন। বিপ্লবের পর লেনিন বলেছিলেন, এক দেশে সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয় সম্ভব নয়। অন্তত ইউরোপের শিল্পোন্নত কয়েকটি দেশে বিপ্লব না হলে সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লব ধরে রাখা যাবে না। তবে সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের কাজ শুরু করা যায়। আর এর সঙ্গে অন্য দেশের বিপ্লব করার দায়িত্ব এবং উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
ট্রটস্কি বলেছিলেন, অন্যান্য দেশে বিপ্লব না হলে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের কাজও সফল হবে না। স্ট্যালিন প্রথম দিকে লেনিনের বক্তব্য সমর্থন করলেও পরবর্তীকালে ভিন্ন কথা বলেন। তিনি বলেন, সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ নয়, একটি দেশের সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয়ও সম্ভব। তবে শর্ত হচ্ছে অন্য দেশে বিপ্লব নয়, অন্য দেশের শ্রমিকদের সহযোগিতায়ই সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত বিপ্লব সম্ভব হবে।
কিন্তু ক্ষমতা দখল না করে অন্য দেশের বিপ্লবের সহযোগিতা কী করে সম্ভব। এ প্রশ্নের জবাবে স্ট্যালিনের ব্যাখ্যা হচ্ছে এ ব্যাপারে শ্রমিক শ্রেণিকে কৌশল অবলম্বন করতে হবে। কৌশল হচ্ছে তার নিজের দেশের সরকার যদি সোভিয়েত ইউনিয়নকে আঘাত করে তবে সে দেশের শ্রমিক শ্রেণির দায়িত্ব হবে নিজস্ব সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। অপরদিকে নিজের দেশের সরকারের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক অনুকূল থাকলে তাদের দায়িত্ব নিতে হবে নিজের দেশের সরকারকে বিব্রত না করা।
এ অভিজ্ঞতা আমাদেরও আছে। আমরা দেখেছি আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সুসম্পর্ক থাকায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে। শেখ সাহেব খুন হয়ে যাবার পর জিয়াউর রহমান সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করায় কমিউনিস্ট পার্টি আবার জেনারেল জিয়াকেও সমর্থন দিয়েছে। অর্থাৎ আমাদের দেশের কমিউনিস্ট পার্টি প্রকৃত অর্থে পরিচালিত হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিদেশ নীতি দ্বারা।
আরএসপি সংগঠকরা মনে করেছে এ নীতিতে কোনোদিন সার্থক বিপ্লব হবে না। বিশ্বের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের বিদেশনীতির অন্ধ অনুসরণের বৃত্তে ঘুরপাক খেতে থাকবে। এ মূল্যায়নের ভিত্তিতে ১৯৪০ সালে আরএসপি গঠিত হলেও দেশ ভাগ হবার পরে এ তত্ত্ব প্রচার খুবই কঠিন ছিল তকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। বিশ্ব রাজনীতিতে সমাজতান্ত্রিক শিবির শক্তিমান নেতা সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং স্ট্যালিন। পাকিস্তানের মতো একটি রাষ্ট্রে কমিউনিস্ট পার্টি নামেই টিকে থাকা মুশকিল। তারপরে স্ট্যালিনের নীতির বিরুদ্ধে বিকল্প কমিউনিস্ট ধারার আর একটি দল গড়ে সামনে এগুনো সহজ ছিল না। তাই আমাদের দল প্রকাশ্যে গঠন করতে হয়েছিল পাকিস্তান সৃষ্টির ২২ বছর পর ১৯৬৯ সালে। তাও আরএসপি বা বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী নামে নয়। শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল নামে।
তবু শুধু সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয় নয়, অন্যান্য প্রশ্নে মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আমাদের পার্থক্য তখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এছাড়া চীনের বিপ্লব নিয়ে আমাদের সঙ্গে মতানৈক্য ছিল। মাও সে তুং এর নেতৃত্বে চীনে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবী হয়েছিল। আমাদের দলের মূল্যায়ন ছিল একাধিক শ্রেণির নেতৃত্বে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবপরবর্তী সময়ে প্রতিবিপ্লবের জন্ম দেবে। কারণ নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বিভিন্ন শ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লব। এ বিপ্লব শ্রেণি সংগ্রামের বিপ্লব নয়, শ্রেণি সমন্বয়ের বিপ্লব। তাই আমাদের দলের মূল্যায়ন ছিল চীনের ন্যায় গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে পরিণত করা কঠিন হবে। নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে উত্তরণ পর্যন্ত অন্তবর্তীকালীন নেতৃত্ব নিয়ে সঙ্কট দেখা দেবে। পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশে তথাকথিত জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সমাজতন্ত্রে উত্তরণের পথ নিয়ে কোনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই পটভূমিতে আমাদের সঙ্গে চীন বিপ্লব নিয়ে প্রথম দিকে থেকেই অর্থাৎ অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির কালেও মূল্যায়নে তফাৎ ছিল। তখন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি আমাদের সাম্রাজ্যবাদের দালাল মনে করত।
