এবার দল গঠনের পালা। বৈঠক বসল ঢাকায়। অগ্নিযুগের বিপ্লবী নেতা কুমিল্লার অতীন্দ্রমোহন রায় বৈঠকে এসেছেন। বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার ভোলাচং গ্রামে। ঐ গ্রামে ১৯২৩ সালে গঠিত হয়েছিল হিন্দুস্থান রিপাবলিকান আর্মি। পরবর্তীকালে ঐ সংগঠনের নাম হয়েছিল হিন্দুস্থান সোসালিস্ট রিপাবলিকান আর্মি। এই সংগঠনের নেতৃত্বে এসেছিলেন যোগেশ চট্টোপাধ্যায়, ভগৎ সিং, রাজনারায়ণ লাহিড়ী এবং আশফাঁক উল্লাহ প্রমুখ। অগ্নিযুগের বিপ্লবী দল অনুশীলন সমিতির নেতা প্রতুল গাঙ্গুলী লিখেছেন, অতীন নিজ হাতে দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। কিন্তু কোনোদিন অতীন একথা কাউকে জানায়নি। এটাই ছিল অনুশীলন সমিতির শপথ।
যারা তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’ উপন্যাস পড়েছেন তারা বীরভূমের ডেটিনিউ যতীনের কথা নিশ্চয়ই পড়েছেন। সেই ডেটিনিউ যতীনই হচ্ছেন আমাদের অতীনদা। ১৯৪০ সালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু বিহারের রামগড়ে আপোষবিরোধী সম্মেলন ডেকেছিলেন। সেই সম্মেলনে অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল আরএসপি গঠন করেছিল। সেই দল গঠনের অন্যতম নেতা অতীন দা। অতীন দার আকাঙ্ক্ষা ছিল মৃত্যুর পূর্বে পাকিস্তানে তাঁর স্বপ্নের রাজনৈতিক দলটি শক্তিশালী হোক। অন্তত মৃত্যুর পূর্বে একটি স্বপ্ন নিয়ে তিনি যেন মরতে পারেন। সেই অতীন দা এসেছিলেন আমাদের সম্মেলনে।
কিন্তু দলের নাম কী হবে। পাকিস্তান ইসলামিক প্রজাতন্ত্র। সমাজতন্ত্র পাকিস্তানে নিষিদ্ধ। আমরা সমাজতন্ত্র চাই। তাহলে কী নামে দল গঠন করব? শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো দলের নাম হবে শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল। আমরা সহজ করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্য বোঝাবার জন্যে দলের এ নামকরণ করেছিলাম। আমরা বলতে চেয়েছিলাম শ্রমিকের নেতৃত্বে কৃষকের মৈত্রীতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পাদিত হবে। সেই অর্থেই দলের নাম শ্রমিক কৃষক। সমাজবাদী দল–আমাদের আদর্শ বিপ্লবী সমাজতন্ত্র।
দল গঠনের খবর প্রকাশিত হবার পর একটি অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হলো বিভিন্ন মহলে। রাজনৈতিক বন্ধুদের মুখে একই কথা, আপনারা এ সময় কেন এ ঝুঁকি নিলেন? সমাজতন্ত্রের কথা বলে টিকে থাকতে পারবেন কি? এদেশের মানুষ ধর্মভীরু। আপনাদের নাস্তিক বলে শেষ করে দেবে। আমাদের জবাব ছিল, রাজনৈতিক ঝুঁকি আছে এবং থাকবে। তবুও সাহস করে কথা বলতে হবে। আর আমাদের নতুন করে নাস্তিক হবার প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের দল গঠন সম্পর্কে তৎকালীন পাকিস্তান অবজারভার বিরূপ মন্তব্য করে সম্পাদকীয় লিখেছিল। সবচেয়ে মজার কাণ্ড করলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। আমাদের দলের গঠনতন্ত্র রচনার জন্যে একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। সেই কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন কুমিল্লার কমরেড আমিরুল ইসলাম। এই খবরের প্রেক্ষাপটে ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলাম সংবাদপত্রে একটি বিবৃতি পাঠালেন। বিবৃতিতে তিনি বললেন, নবগঠিত শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই এবং উল্লেখিত আমিরুল ইসলামও তিনি নন।
শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল গঠিত হয়েছিল ১৯৬৯ সালের ২৯ আগস্ট। অবজারভার পত্রিকায় সম্পাদকীয়তে প্রশ্ন করা হয়েছিল আর একটি দল কেন? এ ধরনের প্রশ্ন ছিল বিভিন্ন মহলের। বিশেষ করে বামপন্থী মহলের। পাকিস্তান সৃষ্টির আগে এ অঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টি, আরএসপি এবং ফরোয়ার্ড ব্লকই বামপন্থী দল বলে পরিচিত ছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর নির্যাতনের মুখে সকল দল বিপর্যস্ত হয়। পাকিস্তান সরকার এ দলগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল না। এ দলগুলো কমিউনিজমে বিশ্বাসী। সুতরাং নাস্তিক। পাকিস্তান ধর্মীয় রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রে নাস্তিক অর্থাৎ কমিউনিস্টদের কোনো জায়গা নেই। তারা বামপন্থীদের ওপর চরম নির্যাতন শুরু করল। এ নির্যাতনের মুখে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে টিকে থাকল কমিউনিস্ট পার্টি। কোনো কিছু ঘটলেই পাকিস্তানের সরকারের অভিযোগ ছিল সব কিছুই কমিউনিস্টরা করেছে। এ অভিযোগ সাধারণ মানুষের মনে কমিউনিস্ট পার্টির একটি অস্তিত্বের আসন সৃষ্টি করে।
একথা সত্য, বামপন্থী রাজনীতিকরা আরএসপি সম্পর্কে খবর রাখতেন। তবে সাধারণ মানুষের কাছে বামপন্থী বলতে কমিউনিস্ট পার্টিকেই বোঝাত। সাধারণ মানুষ মনে করত একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টিই সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে। আরএসপি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না। অপর দিকে কমিউনিস্ট পার্টি বরাবরই তাদের তাত্ত্বিক আলোচনায় আরএসপি সম্পর্কে মন্তব্য করত। ঢালাওভাবে বলা হতো আরএসপি ট্রটস্কিপন্থী। তকালীন কমিউনিস্ট পার্টির একটি ভিন্ন প্রচারণাও ছিল। তাদের প্রচারণা হলো তারা একমাত্র সাচ্চা কমিউনিস্ট। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের অন্যান্য সকল দাবিদাররাই সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট। মার্কিন দালাল। এ খেতাবে আমি বহুবার ভূষিত হয়েছি। আমার লজ্জাজনক অভিজ্ঞতা হচ্ছে যারা আমাদের ট্রটস্কিপন্থী বলতেন, তাদের শতকরা ৯৯ জনই ট্রটস্কি লিখিত কোনো বই পড়ে দেখেনি। এদের মুখোশ খুলে যায় ষাটের দশকে চীন-রাশিয়া দ্বন্দ্বের সময়। কমিউনিস্ট পার্টি চীনপন্থী এবং রাশিয়াপন্থী হয়ে ভাগ হয়ে যায়। এবং পরবর্তীকালে একে অপরকে গালিগালাজ করতে শুরু করে। উভয় পক্ষই নিজেদের মার্কস ও লেনিনের সঠিক উত্তরাধিকারী বলে দাবি করতে থাকে। সারা পৃথিবীতে কমিউনিস্টদের সম্পর্কে সংশয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। এটা ছিল দু’টি দলের সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টিকে অন্ধ অনুকরণের ফল।
