এ হচ্ছে জুন মাসের কথা। এই জুন মাসের ২৭ তারিখে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কাউন্সিলে গণ্ডগোল দেখা দেয়। নূরে আলম সিদ্দিকী ও আবদুল মান্নান খান বেরিয়ে যান। আল মুজাহিদী ও আবদুল মান্নান খানের নেতৃত্বে বাংলা ছাত্রলীগ গঠিত হয়। ২ জুলাই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই নির্বাচন দেয়া হবে। স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ সম্পাদকসহ তাজউদ্দীন আহমদ ৭ জুলাই এক বক্তৃতা দেন। তিনি এ প্রশ্নে গণভোট দাবি করেন। পহেলা আগস্ট আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোতে ১১ দফা দাবি গৃহীত হয়। ১৫ আগস্ট ভাইস এডমিরাল আহসান ও নূর খানকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়।
ক্ষমতায় এসে সামরিক সরকার ছাত্র ও শ্রমিক অসন্তোষ কমাবার জন্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করা হয়। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বেঁধে দেয়া হয়। নূর খান ছাত্রদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। অর্থাৎ সামরিক শাসন অনুধাবন করতে সমর্থন হয়েছিল ছাত্র এবং শ্রমিকদের হাত করতে না পারলে তাদের কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসবে না।
এ সময় আমরা লক্ষ্য করতে থাকি, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এবং শ্রমিক আন্দোলন নতুন করে মার খাবে। এছাড়া সমাজে তখন একটি নতুন ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। এ ধারাটি খুব ক্ষীণ হলেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ৬ দফা শেষ পর্যন্ত এক দফায় পরিণত হবে। এ ধরনের একটি ধারণা আস্তে আস্তে দানা বাঁধছিল। আমাদের ধারণা হচ্ছিল এ ব্যাপারে প্রথম থেকে সতর্ক
হলে শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের আন্দোলন আবার হারিয়ে যাবে। প্রচণ্ড ভাবাবেগে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনই সবকিছু তছনছ করে দেবে। দেশ শাসিত হলেও আন্দোলনকে প্রার্ধিত পরিসমাপ্তি নিয়ে যাওয়া যাবে না। শ্রমিক কৃষকের দাবি পূরণ হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে আমাদের ব্যর্থতা ছিল পর্বতপ্রমাণ। প্রকৃতপক্ষে ষাটের দশকে শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্ব আমাদের হাতেই ছিল। টঙ্গীতে কাজী জাফরদের কিছু সংগঠন থাকলেও চটকল এলাকায় আমাদের নেতৃত্ব ছিল অপ্রতিহত। কিন্তু সে নেতৃত্ব ছিল একান্তভাবেই দাবি দাওয়ার ক্ষেত্রে। আমরা স্বল্প সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবি আদায় করেছিলাম। শ্রমিকদের বিশ্বাস ছিল আমাদের নেতৃত্ব কেনা যায় না। কিন্তু অর্থনৈতিক আন্দোলন করলেও আমরা শ্রমিকদের মধ্যে রাজনীতি দিতে পারিনি। রাজনৈতিক আদর্শ দিতে না পারায় আমরা লক্ষ্য করেছি, ৬ দফার আন্দোলনে আমরা বিপর্যস্ত হয়েছি। বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনে শ্রমিকরা আমাদের কাছে এলেও রাজনৈতিক আন্দোলনে তারা ৬ দফা পন্থী। এই চেতনা থেকেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম নির্বাচনের পূর্বেই আমাদের রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে।
কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলের ধরন কী হবে। কী হবে তার আও লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য? এ প্রশ্ন নিয়েও আমাদের কথা বলা এক ধরনের অপরাধ। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ। আমরা আরএসপি-এর সদস্য ছিলাম। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব পাকিস্তানে কমরেড অমর ব্যানার্জিকে সম্পাদক করে দল গঠন করেছিলাম। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন কমরেড শওকত ওসমানি। তিনি এককালে লেনিনের সহযোগী ছিলেন। তিনি বম্বে শ্রমিকদের নেতা ছিলেন। ভারত বিভাগের পর তিনি করাচিতে চলে আসেন। কিন্তু আরএসপির মূল শক্তি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর একের পর এক হামলায় আরএসপির অবস্থান তখন বিপর্যস্ত। বরিশালের আরএসপি অফিসে বোমা রেখে ১৯৪৮ সালের প্রথমেই ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে নেতাদের। নারায়ণগঞ্জে শ্রমিক নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছে নির্বিচারে। দেশ বিভাগের জন্যে অনেক নেতা দেশান্তরী। এ পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে কাজ করা আদৌ সহজ ছিল না। তবুও ছাত্র ফ্রন্টের কাজ করার চেষ্টা হয়েছিল সকল ঝুঁকি মোকাবেলা করে। ১৯৫৩ সালে নতুন করে দল গঠনের চেষ্টা করা হয়। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে ৯২(ক) ধারা জারি করার পর আবার সকলকে আত্মগোপন করতে হয়। ১৯৬৯ সালে এ পরিস্থিতি মনে রেখেই নতুন করে দল গঠনের কথা চিন্তা করতে হয়। এখন রাজনীতির ক্ষেত্রে আমাদের একমাত্র আশ্রয় পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশন।
আন্দোলন মারফত শ্রমিকদের চেতনা যে নিজস্ব রাজনৈতিক দল না থাকলে আন্দোলন সফল হবার নয়। তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা হচ্ছে চটকল শ্রমিক ধর্মঘটের সময় সকল রাজনৈতিক দল তাদের মাথায় ভর করে ফায়দা লুটতে চেষ্টা করেছিল। এমনকি শেখ মুজিবুর রহমান এবং মওলানা ভাসানীও তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেননি। সুতরাং শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছিল রাজনৈতিক দল গঠনের।
ঠিক হলো আগস্ট মাসের মধ্যেই শ্রমিক সংগঠন ও রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। আদমজী নগরেই এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সেই ভিত্তিতেই ১৯৬৯ সালের ২৮ আগস্ট আদমজী নগরে সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন গঠিত হয়। সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন গঠনের সময় বাধা দেয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। তাদের ধারণা হয়েছিল আদমজীতে আমাদের সম্মেলন হলে আদমজী আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের গোলমাল কাজে আসেনি। সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি হলেন মওলানা সাইদুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক হলেন রুহুল আমিন কায়সার।
