১৯ ফেব্রুয়ারি ১৮ ফেব্রুয়ারির রেশ চলতে থাকে। পুলিশের গুলিতে ২০ জন নিহত হয়। সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস নিয়ে। ঢাকায় সান্ধ্য আইন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সান্ধ্য আইন প্রত্যাহারের দাবি জানায়। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার দিকে একবার সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করা হয়। এক ঘন্টা পর পুনরায় সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। সান্ধ্য আইন ভেঙে মিছিল শুরু হয়। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হয় সান্ধ্য আইন তুলে নেবার। ১৪৪ ধারাও প্রত্যাহার করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান ঘোষণা করেন তিনি আর নির্বাচনে দাঁড়াবেন না। ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি লাভ করেন। মনি সিংহসহ ৩৪ জন রাজন্দিও মুক্তি পান। সকলেই ১১ দফার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন।
এবার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মতানৈক্য শুরু হয় মুক্ত রাজবন্দিদের সংবর্ধনা নিয়ে। ছাত্রলীগ কিছুতেই শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে অন্য কাউকে সংবর্ধনা দিতে রাজি হলো না। তাই শেখ মুজিবের সংবর্ধনা দেয়া হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি রমনা রেসকোর্স ময়দানে। এ জনসভায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কোনো শরিক ছাত্র প্রতিষ্ঠানকে না জানিয়ে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় জনাব তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন। মনি সিংহসহ অন্যান্য সকলকে ২৪ ফেব্রুয়ারি স্টেডিয়ামে সংবর্ধনা দেয়া হয়। এদিন থেকে বঙ্গবন্ধু শব্দটিকে বিতর্কিত করা হয়।
৫. রেসকোর্সের জনসভায় গোলটেবিল বৈঠক
রেসকোর্সের জনসভায় গোলটেবিল বৈঠক নিয়ে মতানৈক্য স্পষ্ট হয়। ছাত্রদের দাবি হচ্ছে ১১ দফা না মানিয়ে গোলটেবিল যাওয়া যাবে না। কিন্তু শেখ সাহেব গোলটেবিলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি গোলটেবিল বৈঠক শুরু হলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ভাসানী, ভুট্টো, আজম খান এ বৈঠকে যোগ দেননি। বৈঠক ১০ মার্চ পর্যন্ত মুলতুবি হয়ে যায়।
রেসকোর্সের ২৩ ফেব্রুয়ারির জনসভা থেকে সকল পরিষদ সদস্য ও মৌলিক গণতন্ত্রীদের ৪ মার্চের ভেতর পদত্যাগের আহ্বান জানানো হয়েছিল। মার্চের প্রথম দিকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা শুরু হয়। সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
১০ মার্চ ভাসানী ন্যাপ ও ভুট্টোর পিপলস পার্টি ১১ দফা সমর্থনের ঘোষণা দেয়। ৩ দফা আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়- (১) সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা (2) জনগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা (৩) বিদেশ চুক্তি বাতিল।
১০ মার্চ গোলটেবিল বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমান সংখ্যা সাম্যের বিরোধিতা করেন। জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচন দাবি করেন। ১১ মার্চ হতে সরকার সব ধরনের হুলিয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তুলে নেয়। গোলটেবিল বৈঠকে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচনের দাবি আলোচিত না হওয়ায় ১৪ মার্চ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বিক্ষোভ প্রকাশ করে। ১৬ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানে মৌলবাদীরা মওলানা ভাসানীকে হত্যা করার চেষ্টা করে। বিক্ষুব্ধ জনতা লাকসাম থানার ওসিসহ ১৫ জনকে হত্যা করে। ১৮ মার্চ পার্বতীপুরে বিহারি-বাঙালি দাঙ্গা হয়। কার্ফ জারি হয়। ২১ মার্চ মোনায়েম খানের পরিবর্তে ড. নূরুল হুদা গভর্নর নিযুক্ত হন।
২৫ মার্চ আইয়ুব খান এক ভাষণ দিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। সংবিধান বাতিল করেন। পরিষদ বাতিল করেন। প্রধান সামরিক শাসক নিযুক্ত হন প্রধান সেনাপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান। সারাদেশে সামরিক আইন জারি হয়। আইয়ুবের পতন হয়।
২৫ মার্চ ক্ষমতা নিয়ে ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরই তাঁর লক্ষ্য। ৩০ মার্চ এক ফরমান জারি করে তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলে আর এক দফা বিতর্ক শুরু হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন সংবিধানের অধীনে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ক্ষমতায় আসার সময় আইয়ুব খান ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল করেছিলেন। সেই সংবিধানের পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সংখ্যা সাম্য ছিল। পাকিস্তানকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান দুই ইউনিটে ভাগ করা হয়েছিল। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন বরবাদ করা হয়েছিল। এই সংবিধান রচনায় সহযোগিতা করেছিল আওয়ামী লীগ এবং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি (কেএসপি)। সেকালের পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ সংখ্যা সাম্য ও একই ইউনিটের বিরুদ্ধে ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব ব্যতিত সকল প্রদেশের মানুষই এক ইউনিটের বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু সামরিক এবং বেসামরিক আমলারা এক ইউনিট সংখ্যা সাম্যের পক্ষে ছিল। অন্যান্য সকলের ধারণা ছিল সংখ্যা সাম্য ও এক ইউনিটের অর্থ হচ্ছে পাঞ্জাবিদের শাসন। এই পাঞ্জাবিদের শাসনের বিরুদ্ধেই পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। আন্দোলনে নেমেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশের মানুষ। এই আন্দোলনের ফলে আইয়ুব খানের পতন ঘটে। ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হন। সংবিধান বাতিল হয় এবং প্রশ্ন দেখা দেয় কোন ভিত্তিতে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সংবিধানের প্রশ্নে প্রথম বিতর্ক তুললেন রাজনীতিতে নতুন আসা আসগর খান। তিনি ১৯৫৬ সালের সংবিধান পুনরুজ্জীবনের দাবি করেন। পরবর্তীকালে কেএসপি, নূরুল আমীনের এনডিএফ, পিডিএম পন্থী আওয়ামী লীগ, নেজামী ইসলাম ১৯৫৬ সালের সংবিধান পুনরুজ্জীবনের দাবি সমর্থন করে। মাওলানা ভাসানী বলেন–শাসনতন্ত্রের প্রশ্নে গণভোট করতে হবে। শেখ মুজিবর রহমান বলেন, ১১ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচিত হবে। কোনো দল বা ব্যক্তি নয়, জনগণই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
