হরতালের পর পল্টনেন জনসভায় এক ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সভায় সভাপতিত্ব করছিলেন নূরুল আমিন। ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ তার বক্তৃতায় জ্বালাও-পোড়াও-এর বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখলে সমগ্র জনসভায় প্রতিবাদ ধ্বনি ওঠে। শ্লোগান ওঠে জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো, গোল টেবিল না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ। ১১ দফা ও ৬ দফা মানতে হবে মানতে হবে। শেষ পর্যন্ত জনসভা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জনসভায় পরিণত হয়। ঐদিন জাতীয় রাজনীতি শেষ হয়ে যায়।
১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্টে সার্জেন্ট জহুরুল হককে গুলি করে হত্যা করা হয়। সারা বাংলাদেশে সহিংস প্রতিবাদ হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ধর্মঘট পালন করে। দেশের প্রতি জেলায় কনভেনশন মুসলিম লীগের দফতর পুড়িয়ে দেয়া হয়। চট্টগ্রামে আধা সামরিক বাহিনী ইপিআর তলব করা হয়। শেখ মুজিব প্যারোলে যেতে অস্বীকার করেন। তাজউদ্দিন-মুজিব বৈঠক হয় জেলে। বলা হয়ে থাকে আওয়ামী লীগের দক্ষিণপন্থী অংশ গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের পক্ষে ছিল। এমন কি তারা প্যারোলেই গোলটেবিল বৈঠকে যেতে রাজি ছিল। কিন্তু মাওলানা ভাসানী এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এর চরম বিরোধিতা করে। তখন মুখ্য ভূমিকা পালন করেন শেখ মুজিব পত্নী ফজিলাতুন্নেসা বেগম। এ সময় করাচিতে বিক্ষোভ হয়। গুলিতে দুজন নিহত ও ২৬ জন আহত হয়। ঢাকায় সান্ধ্য আইনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। করাচিতে সেনাবাহিনী তলব করা হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি গোলটেবিল বৈঠক শুরু হয়। তারপর ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯। কদিন ধরে ঢাকায় কার্য্য চলছে। মানুষ বের হতে পারছে না। দোকানপাট বন্ধ। কোনো যানবাহন চলছে না। মানুষ অভুক্ত। সর্বত্র একটা ক্ষোভ বিক্ষোভ দানা বাঁধছে শহরের সব এলাকায়। কাফুর দিনগুলোতে আমি প্রায় সব শিফটেই কাজ করি। আমার বাসা সেগুন বাগিচা। এ গলি সে গলি করে কোনো মতে অফিসে পৌঁছাই। প্রায় দিনই রাতে বাসায় ফেরা হয় না। অফিসেই খেতে হয়। আমাদের সহকর্মী শহীদুল্লাহ প্রতিরাতে অফিস থেকে বের হয়ে যান। কী করে খাবার জোগাড় করেন তা কেউ জানে না। শহীদুল্লাহ অফিসে থাকলে আমরা সকলে নিশ্চিত। মোটামুটিভাবে এমনি করে দিন চলছিল। পরপর পাঁচদিন আমি একনাগাড়ে ডিউটি করছি। অন্যান্য বন্ধুরা আসতে পারছে না।
১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার দিকে মনে হলো এমন করে আর চলবে না। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এক সময় মানুষ কাফু মানবে না। কার্ফ ভেঙে রাস্তায় নামবে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কার্জন হল কম্পাউন্ডে প্রায় সারারাত ধরে মিছিল। সেদিনও মিছিল হচ্ছিল।
হঠাৎ রাত দশটায় টেলিভিশনের খবরে বলা হলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে ইপিআর হামলা করেছে। গুলিতে নিহত হয়েছে প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা। জোহা জনপ্রিয় শিক্ষক। আমারও চেনা। সলিমুল্লাহ হলের ছাত্র ছিল। জোহার মৃত্যু সংবাদ বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে গেল। কার্জন হল প্রাঙ্গণে মিছিলের কণ্ঠ জোরদার হলো। মনে হচ্ছিল কার্টু ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাজপথে নামছে। দৈনিক পাকিস্তান থেকে উত্তরে তাকালাম। দেখলাম ফকিরাপুলে একটির পর একটি মশাল জ্বলছে। কাওরানবাজার থেকে আমাদের দলের কাজী হাতেম আলী খবর দিল-তেজগাঁও, নাখালপাড়া, গ্রিনরোডে মশাল মিছিল নেমেছে। মশাল নেমেছে রায়েরবাজারে সর্বত্র। সামরিক বাহিনীর টহল। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মানুষ সংঘর্ষে নেমেছে গ্রিনরোডে। সর্বত্রই যেন নামবার পালা। মনে হয় সকলেই নামবার জন্যে প্রস্তুত ছিল। জোহার মৃত্যু সকল বাঁধ ভেঙে দিল। সে এক অদ্ভুত পরিবেশ। সামনে কোনো নেতা নেই, কোনো নেতৃত্ব নেই। কেউ প্রস্তুত ছিল না এ ঘটনার জন্যে। ক্রুদ্ধ, বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ নেমেছে পেটের ক্ষুধায় এবং অত্যাচারের আস্ফালনের বিরুদ্ধে।
সেদিন রাতে বাসায় ফেরা হলো না। পাঞ্জাবি বাহিনী নেমেছে রাজপথে। আমার ঘুম হলো না। সারারাত ভাবলাম নেতৃত্ব থাকলে কী হতে পারত। লেনিন গণঅভ্যুত্থানের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন গণবিপ্লবের কথা। তিনি বলেছিলেন, একটি বিপ্লবী তত্ত্ব চাই। এই তত্ত্ব বাস্তবায়নের জন্যে একটি বিপ্লবী দল চাই। একটি দলের নেতৃত্ব চাই। একটি অভ্যুত্থানের মুহূর্ত চাই। একটি বিপ্লবী তত্ত্বে বিশ্বাসী দল না থাকলে বিপ্লবের মুহূর্ত কাজে লাগানো যাবে না। বিপ্লবী তত্ত্বে বিশ্বাসী দল থাকলেই অভ্যুত্থানের পরিবেশ আসবে। মানুষের মনে বিপ্লবের আকাক্ষা সৃষ্টি হবে। কিন্তু বিপ্লবী দল না থাকলে বিপ্লব হবে না।
১৮ ফেব্রুয়ারি তেমন একটি বিপ্লবের মুহূর্ত এসেছিল। অথচ তখন কোনো বিপ্লবী দল ছিল না। নেতারা জানতেন না কী করতে যাচ্ছেন। সর্বত্রই অচেনা এবং স্বতঃস্ফূর্ততা। কেউই ১৮ ফেব্রুয়ারির মানসিকতা অনুধাবন করতে পারেনি। ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি গণবিপ্লবের মুহূর্ত এসেছিল। অসংখ্য প্রাণের মৃত্যু হয়েছিল। মৃত্যুকে তোয়াক্কা না করে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমেছিল। সেদিন রাজপথে প্রাণ দেয়াটাই বড় হয়ে উঠেছিল। ঐ প্রাণ দেয়াকে সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারলে একটি গণবিপ্লব হতে পারত।
১৮ ফেব্রুয়ারি সারারাত দৈনিক পাকিস্তানের বার্তা বিভাগের টেবিলে শুয়ে শুয়ে ছটফট করেছি। ভেবেছি আন্দোলনের মোড় ঘোরাতে হলে রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে। পাকিস্তানের সামরিক শাসনে তখনো রাজনৈতিক দল গঠনের চিন্তা বাতুলতা মাত্র। কিন্তু দল গঠনের বিকল্প কোনো পথ আমার কাছে সেদিন ছিল না। ১৯ ফেব্রুয়ারি ভোর থেকে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হলো। সকলে মিলে একমত হলাম। একটি বিপ্লবের মুহূর্ত হারিয়েছি। আর নয়। এবার দল গঠন করতেই হবে।
