এই আদমজীর শ্রমিকরাই ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল আমাদের সঙ্গে থেকেই। আর গণঅভ্যুত্থানের মাসগুলো আমাদের কাছে ছিল বিব্রতকর। আন্দোলন কোন দিকে ঘোরে, কী হবে কেউ কিছু বলতে পারছে না। প্রতিদিন সংবাদপত্রে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার শুনানির খবর বের হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হচ্ছে। সরকার পক্ষে সাক্ষী বৈরী ঘোষিত হচ্ছে আদালতে। নিত্য নতুন ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে।
ইতোমধ্যে ৬ দফা আন্দোলন ১১ দফার আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ঘটনা পাল্টাচ্ছে। সব ঘটনাই এক অভ্যুত্থানের রূপ নিল ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৯ সাল।
২৪ জানুয়ারি দুপুরের দিকে ঘরে ছিলাম। হঠাৎ দুয়ারে ধাক্কা পড়ল। আমি তখন সেগুনবাগিচায় ড. কাজী মোতাহার হোসেনের বাসায় থাকি। দুয়ার খুলে দেখলাম মেসবাহ। মেসবাহ ছাত্রলীগের কর্মী। মেসবাহ শাহবাগ হোটেলের মোড়ে একটি দোতলা বাসে বোমা ছুঁড়েছে। রমনার রেসকোর্স হয়ে ছুটে আমার বাসায় এসেছে। মেসবাহ বলল, তাদের সিরাজ ভাই অর্থাৎ সিরাজুল আলম খান নাকি তাকে বলেছেন বোমা ছুঁড়ে সোজা ছুটে দাদার বাসায় যাবি। ঐ এলাকা নিরাপদ। কিছুক্ষণ থেকে মেসবাহ সুবোধ বালকের মতো চলে গেল।
আবার দুয়ার ধাক্কা পড়লো। দরজা খুলে দেখি সামনে দাঁড়ানো দৈনিক বাংলার সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী। জামায় রক্তের ছাপ। সে জামাটা খুলে ফেলল। বললো আমাকে একটা জামা দিন। পুলিশের গুলিতে নবাবপুর স্কুলের ছাত্র মতিউর রহমান মল্লিক নিহত হয়েছে। এতক্ষণ সে মতিউরের লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল করেছে। এবার এসেছে জামা পাল্টাতে।
সালেহ চৌধুরী আমার একটা জামা গায়ে দিয়ে বের হয়ে গেল। আমি গেলাম প্রেস ক্লাব। প্রেস ক্লাবে গিয়ে শুনলাম একদল শ্রমিক আমাকে খুঁজে গেছে। ওরা দৈনিক পাকিস্তান ভবনে আগুন দিয়েছে। তারপর তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে আমি কোথায়। আমি ঐ ভবনে আছি কিনা। সেখানে আমাকে না পেয়ে প্রেস ক্লাবে এসেছে। ওরা নাকি এখনো আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
প্রেস ক্লাব থেকে নামলাম। সংবাদপত্র হকার্স ইউনিয়নের এক নেতা, নোয়াখালী বাড়ি, তার সঙ্গে দেখা হলো। বলল, স্যার আপনাকে খুঁজছিলাম। দৈনিক পাকিস্তানে আগুন দিয়েছি। ভয় ছিল আপনি ঐ ভবনে আছেন কিনা। তাই প্রেস ক্লাব হয়ে আপনার বাসা পর্যন্ত গিয়েছিলাম। আপনাদের ওপর আমাদের প্রচণ্ড রাগ। কারণ আপনারা দৈনিক পাকিস্তানের প্রথম পাতায় একদিন বড় করে লিখেছিলেন, শেখ মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্রের প্রধান হোতা।
ওদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে দৈনিক পাকিস্তানের দিকে গেলাম। বায়তুল মোকাররম থেকে এগিয়ে দেখলাম বায়ে লসকরদের পেট্রোল পাম্প পুড়ে গেছে। দুরে জ্বলছে প্রেস ট্রাস্ট ভবন অর্থাৎ দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ ভবন। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুড়বার দৃশ্য দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল মানুষের ক্রোধ কত তীব্র। আমরা বছরের পর বছর যা লিখেছি ওরা একদিন। তার জবাব দিয়েছে। দুঃখ পাইনি। তবে ভেবেছি চাকরিটা গেল। কাল কী হবে জানি না। এ সংগ্রামে নিরপেক্ষ থাকা যাবে না সাধারণ মানুষ তা বুঝিয়ে দিল।
২৪ জানুয়ারির পর ঘটনার দ্রুত পরিবর্তন শুরু হয়। এর আগেই পশ্চিম পাকিস্তানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। জেনারেল আইয়ুবের সঙ্গে ভুট্টোর গোলমাল ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের কাল থেকে। আইয়বের ধারণা ভুট্টোর হঠকারিতার জন্যে পাকিস্তান এই অবস্থায় পড়ে। আর ভুট্টোর বক্তব্য হলো রাশিয়ার নেতৃত্বে তাসখন্দে ভারতের সঙ্গে সমঝোতা করে আইয়ুব পাকিস্তানকে পক্ষে ফেলেছে। আইয়ুব-ভুট্টো মতানৈক্য চরমে পৌঁছলে ভুট্টো পদত্যাগ করে আইয়ুনের মন্ত্রিসভা থেকে। সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তানে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়।
পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও ডাক-এর মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। ডাক গঠিত হয়েছিল নির্বাচনের জন্যে। ডাক-এ ছিল পিডিএম পন্থী আওয়ামী লীগ, ছ’দফা পন্থী আওয়ামী লীগ, এনডিএফ, জামাতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও মোজাফফর ন্যাপ ও কাউন্সিল মুসলিম লীগ। এ জোটে ভাসানীর ন্যাপ ও ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ছিল না। এক সময় ডাক-এর পক্ষ থেকে বলা হয়, জ্বালাও-পোড়াও বলা যাবে না। পাকিস্তানি পতাকা ছাড়া অন্য কোনো পতাকা থাকতে পারবে না। ২৪ জানুয়ারির ঘটনার পর ডাক নয়, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদই সব আন্দোলনের নেতায় পরিণত হয়। ২৭ জানুয়ারি লাহোরে হরতাল হয়। ইতোমধ্যে বিমান বাহিনী সাবেক প্রধান আসগর খান রাজনীতিতে যোগ দেন। ২৭ জানুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে জাতীয় পরিষদে তুমুল বাক বিতণ্ডা হয়। এক সময় স্পিকার পরিষদের ৫ জন বিরোধীদলীয় সদস্যকে বহিষ্কার করেন। করাচী ও লাহোরের বিক্ষোভ দমন করতে সেনাবাহিনী তলব করা হয়।
জানুয়ারির ঘটনায় পিন্ডির সামরিক বাহিনী নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। প্রেসিডেন্ট আইয়ব ঘোষণা করেন যে, সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে এবং সমঝোতার জন্যে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আলোচনায় ডাকবেন। ৪ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক ধর্মঘট পালন করে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ১৭ ফেব্রুয়ারি গোল টেবিল বৈঠক ডাকেন। নবাব হাজী নসরুল্লাহ খানকে গোলটেবিল অনুষ্ঠানের দায়িত্ব দেন। ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর মিছিল হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঘোষণা করে গোলটেবিলের পূর্ব শর্ত হচ্ছে শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি দান। ৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার দেশ রক্ষা আইন ও অর্ডিন্যান্স প্রয়োগ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। ডাক ১৪ ফেব্রুয়ারি হরতাল আহ্বান করে। হরতাল নিয়ে ডাক ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মতানৈক্য হয়। ডাক-এর আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ ব্যতীত সকল দলই ছ’দফার বিরোধিতা করে। ৮ ফেব্রুয়ারি মওলানা ভাসানী গোল টেবিলের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। ডাক-এর দাবিতে স্বায়ত্তশাসন না থাকায় ১৪ ফেব্রুয়ারি হরতাল কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করেন। ১০ ফেব্রুয়ারি ডাক-এর বৈঠক বসে। আওয়ামী লীগ থেকে দাবি করা হয় আগতলা মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি। এ প্রস্তাব নিয়ে মতানৈক্য হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি হরতাল পালিত হয়।
