এ পরিস্থিতিতে একদিন রাতে এক ঘটনা ঘটল। ৩০ ডিসেম্বর ১৯৬৮ সাল। রাতে আমি শিফট ইনচার্জ। রাত ১০/১১টার দিকে এক তরুণ আমার সামনে এসে বলল। তার মাথায় কাপড় বাঁধা। বললো আমি আসাদ। আসাদুজ্জামান। আমি হাতিরদিয়া থেকে এসেছি। ঢাকা জেলার শিবপুর থানার হাতিরদিয়া। মাওলানা ভাসানীর ডাকে আজ হরতাল করেছি, ঘেরাও করেছি। পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে।
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আসাদ বলল, আপনি বিশ্বাস করছেন। দেখুন আমার মাথায় রক্তের দাগ। আসাদ তার মাথার কাপড় খুলে ফেলল। দেখলাম তার মাথায় চাপ চাপ রক্ত।
আমি বললাম, আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি। কিন্তু তোমার খবর ছাপা যাবে না। সব সত্য সংবাদপত্রের জন্যে সত্য নয়। এ সংবাদপত্রে মালিকের নির্দেশ আছে। সরকারের আইন আছে। তোমার খবর ছাপতে হলে ঢাকায় এসপি-ডিসিকে ফোন করতে হবে। তারা তোমার খবর মেনে নিলেই তোমার খবর ছাপা যাবে। আসাদ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। আস্তে আস্তে এক সময় চলে গেল। আমি সেদিন আসাদের খবর ছাপাতে পারিনি। কারণ ঢাকায় পুলিশ, জেলা কর্তৃপক্ষ এ খবরের সত্যতা স্বীকার করেনি।
আর আমার সাংবাদিক জীবনে আসাদই বলে গেল খবর কাকে বলে। বলে গেল দেখি আমার খবর কী করে ছাপা না হয়।
২০ জানুয়ারি ১৯৬৯ সাল। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থমথম করছে। পুলিশের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মিছিল বের হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজের কাছে গুলি বর্ষণ করেছে পুলিশ। এক তরুণ মারা গেছে হাসপাতালে।
খবরটি নিয়ে এল আমাদের দলের এক ছাত্র নরসিংদীর কাজী হাতেম আলী। হাতেম আলীকে নিয়ে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গেলাম। লাশের মুখে ঢাকা কাপড় তোলা হলো। কাজী হাতেম আলী বললো, এ আমাদের আসাদ। হাতিরদিয়ার আসাদ। আপনি তাকে চেনননি। সেদিন ২০ জানুয়ারি। দৈনিক পাকিস্তানের রাতে অফিস শিফট ইনচার্জ ছিলাম। আসাদ খবর হয়ে এলো। আমি সেদিন পুলিশ আর ডিসিকে ফোন করিনি। আসাদ খবর হলো নিজের রক্তের বিনিময়ে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বলতে পারিনি ৩০ ডিসেম্বর আসাদকে আমি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।
আমাদের রাজনীতিতে সত্তরের দশকে আর একটি আঘাত আসে। আওয়ামী লীগের কোনো শ্রমিক সংগঠন ছিল না। তাই তারা আমাদের শ্রমিক সংগঠনের দিকে হাত বাড়িয়েছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার হবার আগে শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করেন। কমরেড রুহুল আমিন কায়সার বলেছিলেন আমরা শ্রমিক আন্দোলনে আছি। আওয়ামী লীগের নিজস্ব সংগঠন করার অধিকার আছে। তাতে আমাদের কিছু বলার নেই। ফলে আলোচনা ভেঙে যায়।
আমাদের তখন মুখ্য সংগঠন ছিল পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশন। এই সংগঠনকে ভিত্তি করে আমরা জাতীয় ভিত্তিতে শ্রমিক সংগঠন গঠনের চেষ্টা করেছিলাম। লক্ষ্য ছিল সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠনের।
আমাদের পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আব্দুল মান্নান। ৬ দফা আন্দোলনে সে জেলে গিয়েছিল। মনে হয় ওখানেই তার আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা হয়। এছাড়া ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খান চেষ্টা করছিলেন আমাদের সংগঠনের জায়গা করে নেবার। কিছু কিছু ছাত্রলীগ কর্মী এ জন্যে আমাদের সঙ্গে ভিড়ে গিয়েছিল। তারা আমাদের দলের কর্মীর মতোই আচরণ করত। একথা সত্য, সিরাজুল আলম খান আমাদের সংগঠনকে ভাঙতে পেরেছিলেন। তবে তার সকল কর্মী নিজ দলের ফিরিয়ে নিতে পারেননি। এছাড়াও তাদের মান্নান হালদার যিনি পরবর্তীকালে এমপি হয়েছিলেন এবং লাল বাহিনীর নেতা হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন–তাঁর সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। মান্নান সাহেব চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগকে নিয়েই আমরা এক সংগঠন গড়ে তুলি। কিন্তু স্বাভাবিক কারণে আমাদের পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। রাজনীতিতে আমাদের তফাৎ ছিল আকাশ-পাতাল।
এ সময় শেখ সাহেবের সঙ্গে রুহুল আমিন কায়সারের আলোচনা ভেঙ্গে গেল। ইতোপূর্বে নেপাল দা মারা গেলেন। নেপাল দার সঙ্গে মান্নান সাহেব এক বাসায় থাকতেন। নেপাল দাকে মান্নান সাহেব উপেক্ষা করতে পারতেন না। কিন্তু নেপাল দার মৃত্যুতে মান্নান সাহেবের কাছে দলের বাইরে যাবার শেষ বাধা কেটে গেল। আমাদের মনে হলো আওয়ামী লীগ নতুন শ্রমিক সংগঠন করবে এবং এর আগেই আমাদের ভয় ছিল যেকোনো মুহূর্তে আমাদের শ্রমিক নেতাদের নাম দিয়েই আওয়ামী লীগ একটি সংগঠন করে ফেলতে পারে।
তাই আমি ও রুহুল সাহেব একটি ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিলাম। আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত ছিল আমাদের শ্রমিক সংগঠনের নাম হবে সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ২৪ ঘন্টার মধ্যে এ নামে একটি সংগঠন হয়েছে বলে পত্রিকায় সংবাদ দিতে হবে। তখন রুহুল আমিন সাহেব আদমজীর শ্রমিক সংগঠনের প্রিয় নেতা। তাকে বললাম, আপনি আদমজী চলে যান। আমি রাতে পত্রিকার খবর দিয়ে দেব, সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন নামে একটি নতুন শ্রমিক সংগঠন গঠিত হয়েছে। সংগঠনের কমিটির সভাপতি হয়েছেন আদমজীর মওলানা সাইদুর রহমান। সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন রুহুল আমিন কায়সার।
সেদিনের কথা আজকেও আমার স্পষ্ট মনে আছে। রুহুল আমিন সাহেব জ্বরে কাঁপছিলেন। দীর্ঘদিন যাবত টিবিতে ভুগছেন। একটি ফুসফুস শেষ। অপরটির তিন ভাগের এক ভাগ নেই। কিন্তু ছিল অদ্ভুত মনোবল আর সাহস। বললেন, কমরেড, আমার যে শরীরের অবস্থা তাতে ফিরতে পারব কিনা জানি না। তবুও আমি আদমজী যাচ্ছি। আপনি পত্রিকায় খবর দিয়ে দেবেন। পরের দিন পত্রিকায় খবর বের হলো সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন গঠনের। রুহুল আমিন সাহেব ঢাকায় ফিরলেন তীব্র জ্বর নিয়ে। বিকালে মান্নানের সঙ্গে দেখা হলো। খুব বেশি কথা বলছে না। শুনেছি শেখ সাহেব তাকে কথা শুনিয়েছেন। কারণ মান্নান সাহেব তাকে কথা দিয়েছিলেন আমরা তাঁদের সঙ্গে না থাকলেও আদমজীর শ্রমিক তাঁদের সঙ্গে থাকবেই।
