ইতোমধ্যে আইয়ুব খানের সামরিক সরকার নিজের মসনদ পোক্ত করার ব্যবস্থা করেছে। ইউনিয়ন কাউন্সিলের নাম দিয়েছে মৌলিক গণতন্ত্র। ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্যের নাম হচ্ছে মৌলিক গণতন্ত্রী। এই মৌলিক গণতন্ত্রীর ভোটে জাতীয় বা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন হবে। সাধারণ মানুষের কোনো ভোটাধিকার থাকবে না।
সকল রাজনৈতিক দল এই মৌলিক গণতন্ত্রের বিপক্ষে মত প্রকাশ করেছিল। বলা হয়েছিল মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচনে কেউ অংশগ্রহণ করবে না। আর রাজনৈতিক দল হিসেবে মৌলিক গণতন্ত্র নির্বাচনে প্রার্থী হবার কোনো সুযোগ ছিল না। মৌলিক গণতন্ত্রের সদস্য সংখ্যা ছিল দুই পাকিস্তানে ৪০ হাজার করে মোট ৮০ হাজার। ১৯৬৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেন। ইতোমধ্যে তিনি পুরনো মুসলিম লীগ সদস্যদের ডেকে একটি কনভেনশন করেন। গঠিত হয় কনভেনশন মুসলিম লীগ। তিনি হলেন–সভাপতি। এ কাউন্সিলে আর একটি মুসলিম লীগ গঠিত হয়। অর্থাৎ কনভেনশন মুসলিম লীগ ও কাউন্সিল মুসলিম লীগ নামে দুটি মুসলিম লীগ গঠিত হয়। জেনারেল আইয়ুব কাউন্সিল লীগসহ অন্যান্য বিরোধী দল কম্বিনিশন অব অপজিশন পাটি অর্থাৎ কপ গঠন করেন। কপের সদস্যদের মধ্যে এনডিএফ ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক দল ছিল। নির্বাচনে এদের প্রার্থী হলেন মিস ফাতেমা জিন্নাহ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো ১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি। এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব পূর্ব পাকিস্তানে শতকরা ৫৩ দশমিক ১ ভাগ ভোট পেয়েছিলেন। আর কপ প্রার্থী মিসেস ফাতেমা জিন্নাহ পেয়েছিলেন ৪৬ দশমিক ৯ ভাগ ভোট। কিন্তু লক্ষণীয়, প্রাদেশিক পরিষদ ও জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তান মুসিলম লীগ শতকরা ৭২ আসন পেলেও ভোট পেয়েছিল শতকরা ৫০ ভাগেরও কম। অধিকাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিল স্বতন্ত্র ও বিরোধী দলীয় প্রার্থিদের। বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ ছিল না। এমনকি নির্বাচনে অংশগ্রহণ সম্পর্কে একমত ছিল না। ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে আবার প্রমাণিত হয়, মিস ফাতেমা জিন্নাহকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে যে আবেগ সৃষ্টি হয়েছিল তাও স্থায়ী নয়।
এই অবস্থার আর এক পরিবর্তন হয় ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে। এ যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল ১৯৬৫ সালের ৭ সেপেটম্বর থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ ১৭ দিন। প্রকৃতপক্ষে এই ১৭ দিন পূর্ব পাকিস্তান অরক্ষিত ছিল। পূর্ব পাকিস্তানিদের কাছে সাধারণভাবে মনে হয়েছিল পাকিস্তান সরকারের যেনো পূর্ব পাকিস্তানের জন্যে কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। অর্থাৎ প্রতিরক্ষার জন্যেও পূর্ব পাকিস্তান যে স্বাধীন হওয়া দরকার, এ যুদ্ধের পর সে কথা সামনে চলে আসে।
ষাটের দশকের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং পুনরুজ্জীবিত করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের ভাঙন। ১৯৬৭ সালের ২ মে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলন (পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট অর্থাৎ পিডিএম) গঠিত হয়। এই পিডিএমকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ভেঙে যায়।
১৯৬৭ সালে ন্যাপ ভেঙে ভাসানী ন্যাপ ও মোজাফফর ন্যাপ গঠিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এই ভাঙনের কারণ ছিল আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম চীন বিভেদ। ভাগ বাটোয়ারার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে মোজাফফর আহমদ ন্যাপকে মস্কো ন্যাপ এবং ভাসানী ন্যাপকে পিকিং ন্যাপ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এই ষাটের দশকেই পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজ ঐক্যবদ্ধ নতুন আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামী করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করেন। এবার রাজনীতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটে।
১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ৬ দফাঁকে অন্তর্ভুক্ত করে ১১ দফা দাবি প্রণয়ন করে এবং ১১ দফার ভিত্তিতে নতুন আন্দোলন শুরু হয়। এ সময় নিজেকে বড় অসহায় মনে হতো। দৈনিক পাকিস্তান-এ কাজ করছি। সরকার পক্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী পত্রিকা। অথচ এ পত্রিকার অধিকাংশ সাংবাদিক সরকার বিরোধী এবং বামঘেঁষা। এ পত্রিকায় আমি সরকারি টাকা পেলেও এ পত্রিকায় আমার অভিভাবক ছিলেন প্রথম বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হক। ১৯৬৫ সালের কায়রো বিমান দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান।
এই দৈনিক পাকিস্তানে চাকরিকালে আমি প্রেস ক্লাবের সদস্য হই। চাকরি গ্রহণের শুরুতে ইউনিয়নের সদস্য হয়েছিলাম ইত্তেফাকে থাকতে। ইত্তেফাকে আমার চাকরি হয়েছিল আহমেদুর রহমানের সহযোগিতায়। আহমেদুর রহমান তখন শক্তিশালী কলাম লেখক। ইত্তেফাকে ভীমরুল নামে ‘মিঠেকড়া’ কলাম লিখতেন। এই আহমেদুর রহমানও মারা গেলেন ১৯৬৫ সালের কায়রোতে বিমান দুর্ঘটনায়। পাকিস্তান এয়ারলাইন্স পিআইএ বিমান চালু করছিল কায়রো পর্যন্ত। সেই বিমানের উদ্বোধনী যাত্ৰায় ১২৮ জন যাত্রী ছিলেন। তার মধ্যে ৪ জন পূর্ব পাকিস্তানের সাংবাদিক ছিলেন। এরা দৈনিক পাকিস্তানের বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হক, ইত্তেফাকের সহকারি সম্পাদক আহমেদুর রহমান, পাকিস্তান অবজারভারের সহকারি সম্পাদক ফরিদউদ্দিন আহমদ এবং মর্নিং নিউজের আব্দুল হান্নান।
ষাটের দশকের মাঝে এসে দৈনিক পাকিস্তান মোটামুটি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বলা যেতে পারে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছিল সাংবাদিকতায়। অপরদিকে ট্রাস্টের কাগজ বলে বিরোধী দলের সকল খবর দিতে সীমাবদ্ধতা ছিল। একদিকে চাকরি অপরদিকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জোয়ার আমাকে প্রতি মুহূর্তে বিব্রত করত। আমি তখন টেবিলে শিফট ইনচার্জ। স্টাফ রিপোর্টার নই। তবুও প্রতিটি মিছিল সভায় যেতাম রাজনীতির খবরের জন্যে। সহকর্মীরা অখুশি হতো। শ্রমিক এলাকায় কাজ করলেও রাজনৈতিক দল হিসেবে কোনো পরিচিতি না থাকায় অসুবিধা হতো প্রতি পদে পদে।
