১৯৬৬ সালে চটকল আন্দোলনের মধ্যদিয়ে অনুভূত হয়, রাজনৈতিক দল গঠন না করে শুধুমাত্র শ্রমিক সংগঠনের নাম নিয়ে সর্বহারার নেতৃত্ব করা যাবে না। আরএসপির পক্ষ থেকে তখন নতুন করে চিন্তাভাবনা হয় নতুন নামের সংগঠন করা এবং এ সময় শুরু হয় ৬ দফা দাবি ভিত্তি করে সুতীব্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন।
এ আন্দোলনে শ্রমিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিকদের মধ্যেও এ আন্দোলনের প্রতি ঝোঁক লক্ষ করা যায়। এ সময় নেপাল দা মারা যান। তবে লক্ষণীয় যে শ্রমিক এলাকায় এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লেও আদমজীসহ অধিকাংশ পাটকলে আমাদের নেতৃত্ব অটুট থাকে। সংগ্রামের মধ্যদিয়ে একাত্ম হবার ফলে আমাদের ওপর শ্রমিকদের অগাধ বিশ্বাস ছিল। সেই বিশ্বাসকে রাজনৈতিক রূপ দিতে গিয়ে প্রতি পদে পদে আমাদের হোঁচট খেতে হয়েছিল।
তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে একের পর এক ঘটনা ঘটছিল। কিন্তু শিল্প এলাকা ছাড়া রাজনৈতিকভাবে আমাদের কোনো চাপ ছিল না। আরএসপির কিছু ব্যক্তি হিসেবে আমরা রাজনৈতিক মহলে পরিচিত। এক সময় আমরা ছাত্রলীগ করলেও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আমলে ছাত্রলীগের কমিউনিস্ট বিরোধী পাশ্চাত্যঘেষা নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আমরা ছাত্রলীগ ত্যাগ করি । আমরা ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিলেও কমিউনিস্ট পার্টি কখনই আমাদের ছাত্র ইউনিয়নে কাজ করতে দেয়নি। ন্যাপ গঠনের পর মাওলানা ভাসানী ন্যাপে যোগ দেবার জন্যে আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা রাজি হইনি।
আমরা বলেছি নিজের আত্মপরিচয় গোপন করে সমঝোতা করে অন্য দলে যোগ দিলে একদিন আদর্শচ্যুত হবই। কোনোদিন আর নিজের দলে ফিরে আসা যাবে না। কারণ শ্রেণিসংগ্রাম আর শ্রেণি সমন্বয়ের অবস্থান দুই বিপরীত মেরুতে। শ্রেণি সমন্বয়ের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে শ্রেণি সংগ্রামের রাজনীতি অংশগ্রহণ করা যায় না। আমাদের দলগত বিশ্বাস ত্রিশের দলকে। বুলগেরিয়ার কমিউনিস্ট নেতা দিমিট্রসের পপুলার ফ্রন্টনীতি এ সর্বনাশা রাজনীতির জন্ম দিয়েছে। এ নীতি অনুসরণ করে বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো ধনিক শ্রেণির বিভিন্ন দলে ঢুকে রাজনীতি করার চেষ্টা করে প্রকৃতপক্ষে নিজেদের নিঃশেষ করেছেন। নিজেদের রাজনীতি করা হয়নি। এই উপমহাদেশেও তার নজির নেই। এই নীতি অনুসরণ করে এই উপমহাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির অনেক নেতা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতা হয়েছেন। কেউই শেষ রক্ষা করতে পারেনি।
আরএসপির কাছে দিমিট্রসের এ তত্ত্ব ছিল ভুল এবং পরিত্যাজ্য। তাই আমরা সংখ্যায় কম হলেও আরএসপির সদস্য হিসেবে বেঁচে থাকতে চেয়েছি। অন্য কোনো দলে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করিনি এবং নেপাল দাও সেভাবেই মারা গেলেন। এগিয়ে এল ১৯৬৭, ৬৮ এবং ৬৯ সাল। আমাদের রাজনীতিতে এক অগ্নিগর্ভ যুগ।
ষাটের দশক শেষ হয়ে যাচ্ছে। সেকালের পূর্ব পাকিস্তানে ষাটের দশক এসেছিল একটি ভিন্ন রূপ নিয়ে। ৫০-এর দশকে শিশু রাষ্ট্র পাকিস্তানকে রক্ষা করতে হবে, ইসলামকে রক্ষা করতে হবে–এটাই ছিল বড় কথা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসিলম লীগ পরাজিত হলে এ বিশ্বাসে প্রাথমিকভাবে ধস নামে। তবুও সাধারণভাবে মুসলিম জনতার পাকিস্তানের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা ছিল। কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে ভেঙে দিলেও পাকিস্তান বিরোধী মনোভাবের তেমন প্রকাশ তখনও ছিল না। ১৯৫৬ সালে সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেয়ায় ভাষা আন্দোলনের একটি পর্ব শেষ হয়ে যায়।
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পরে প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ মানুষের কাছে সামরিক শাসন অভিনন্দিত হলেও ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের মনে ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো। সর্বক্ষেত্রে বাংলা এবং বাঙালিকে পিছু হটাবার একটা প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেল। আইয়ুব খান সরকারের প্রথম শিকার হলো আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও অন্যান্য বামপন্থীরা। সামরিক সরকার সখ্য গড়ে তুলল ১৯৫৪ সালে পরাজিত শক্তি মুসলিম লীগের সঙ্গে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির বিবর্তন হতে থাকল। এক এক করে নেতারা জেলখানা থেকে মুক্তি পেতে থাকলেন। কড়া সামরিক শাসনের মধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাজনীতিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার চেষ্টা করলেন। আর এই সময়ই সবচেয়ে বড় ভুল করল পাকিস্তান সরকার শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করে। পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী রাজনীতিকদের একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম করার গড়ে তুলল ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরে মারা গেলেন। এবারে রাজনীতি ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করল। পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম থেকেই দাবি উঠেছিল আইয়ুবের সংবিধান বাতিল করতে হবে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে ভিন্ন পথ নিয়েছিলেন। তিনি দাবি তুললেন সংবিধান বাতিল নয়, সংবিধান গণতন্ত্রায়ন করতে হবে। শহীদ সোহরাওয়াদী মারা যাওয়ায় পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। সংবিধান বাতিলের দাবি জোরদার হয়।
ইতোমধ্যে সরকার এক ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটালো। ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্র ধরে পূর্ব পাকিস্তানে দাঙ্গা শুরু হয়। পাকিস্তান সরকারের ভাবনা ছিল এই দাঙ্গা তাদের সঙ্কট সমাধান করবে। একদিনের জন্যে হলেও বিরোধী দলের দাবি স্তিমিত হবে। কিন্তু দাঙ্গার ফল হলো উল্টো। বাঙালিদের ধারণা হলো এ দাঙ্গা পাকিস্তানি সরকারের ষড়যন্ত্র। এ দাঙ্গার জন্যে দায়ী ভারত থেকে আসা এক শ্রেণির অবাঙালি। পূর্ব পাকিস্তানে এ দাঙ্গার সূত্র ধরে বাঙালিবিহারী সংঘর্ষ দেখা দিল বিভিন্ন এলাকায়।
