এ সময় আমরা সিদ্ধান্ত নিই শ্রমিক ফ্রন্টে কাজ করার। পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশন গড়ে তুলি। আমাদের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক চটকল ধর্মঘট হয়। এর পরে আসে ১৯৬৬ সালের আন্দোলন। চারদিকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রবল আবেগ। শ্রমিক এলাকায় কাজ করলেও আমাদের রাজনৈতিক দলের তেমন পরিচিতি নেই। স্বীকৃতি নেই কোনো মহলে। সকল মহলেরই ধারণা ছিল সকল শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি জড়িত। মার্কসবাদ, লেনিনবাদ বা সমাজতন্ত্র একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টিরই কথা। কমিউনিস্ট পার্টি ব্যতিত সমাজতন্ত্র বিশ্বাসী অন্য কোনো দলের অস্তিত্বের ধারণাই ছিল না।
এর একটা ঐতিহাসিক কারণ ছিল, বিশেষ করে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল অর্থাৎ আরএসপির প্রশ্নে। কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়েছিল বিশের দশকে। আরএসপি গঠিত হয়েছিল ১৯৪০ সালের ১৯ মার্চ। আরএসপি গঠন করেছিল অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা। এদের অধিকাংশ এসেছিল অনুশীলন সমিতি থেকে। ১৯১৭ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপ্লবের পর অগ্নিযুগের এই বিপ্লবীরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সংস্পর্শে আসেন। ব্রিটিশের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে এদের একটি অংশ কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়। অপর অংশের দ্বন্দ্ব দেখা দেয় লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিনের নেতৃত্ব নিয়ে। অনুশীলনের এই অংশ মনে করে স্ট্যালিন সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারছে না। স্ট্যালিনের নেতৃত্ব তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের ভুল নির্দেশ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ত্রিশ দশকের কংগ্রেসের নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলন সমর্থন করেনি। আবার ১৯৩৫ সালে এসে একই তৃতীয় আন্তর্জাতিকের নির্দেশে কংগ্রেসকে সমর্থন করেছে এবং সুভাষ বসুকে সমর্থন করেনি গান্ধীর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে।
এই পটভূমিতে ১৯৪০ সালের ১৯ মার্চ বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল আরএসপি গঠিত হয়। ইতোমধ্যে ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
আরএসপির মধ্যে থেকে ঘোষণা করা হলো এ যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ। এ যুদ্ধ সমর্থন করা যাবে না। আরএসপি গঠনের ৬ মাসের মধ্যে প্রথম সারির নেতারা গ্রেফতার হয়ে গেলো। দলটির নাম প্রচার হবার পূর্বেই ভয়াবহ নির্যাতন শুরু হয়ে গেল। এই দলের অজস্র কর্মী আত্মগোপন করে ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। গ্রেফতার বরণ করে এবং নিহত হয়। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হবার পর এ দলের কর্মী ও নেতাদের মুক্তি দেয়া শুরু হয়। দলের প্রধান নেতা সাধারণ সম্পাদক যোগেশ চট্টোপাধ্যায় তখন বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত। তিনি কাদরি ষড়যন্ত্র ও আন্তঃপ্রদেশ ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন। যোগেশ চট্টোপাধ্যায়ের সহযোগী ছিলেন শহীদ রাজনারায়ণ লাহিড়ী, জগৎ সিংহ ও আশফাঁক উল্লাহ প্রমুখ। যোগেশ চট্টোপাধ্যায় হিন্দুস্তান রিপাবলিকান সোসালিস্ট আর্মির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। এই সংগঠনটি ১৯২৩ সালে কুমিল্লার নবীনগর থানার ভোলাচং গ্রামে জন্ম হয়। তখন এই সংগঠনের নাম ছিল হিন্দুস্তান রিপাবলিকান আর্মি। ভোলাচং ছিল অনুশীলন সমিতির অন্যতম নেতা বিপ্লবী অতীন্দ্রমোহন রায়ের বাড়ি। বিপ্লবী অতীন্দ্রমোহন রায় আরএসপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের অন্যতম প্রাণপুরুষ ছিলেন।
১৯৪০ সালে গঠিত আরএসপির অবস্থা দাঁড়াল এমন যে ৬ মাসের মধ্যে তাদের নেতারা গ্রেফতার হয়ে গেলেন। ১৯৪২ সালে এই অবস্থা ভারত ছাড়ো আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হলো। ১৯৪৬ সালে নেতারা মুক্তি পেলেন। ১৯৪৭ সালে আরএসপির সাধারণ সম্পাদক যোগেশ চট্টোপাধ্যায় বাংলাদেশে ঢুকবার অনুমতি পেলেন। এ সময় সারা ভারতবর্ষে টালমাটাল অবস্থা। নৌবাহিনীতে বিদ্রোহ। বিমান বাহিনীতে বিদ্রোহ। আজাদ হিন্দু ফৌজের বিচার। সব মিলে এক রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের পরিবেশ। ব্রিটিশ সরকার, কংগ্রেস এবং মুসিলম লীগ সকলেই ভীত এবং সন্ত্রস্ত। এ অবস্থা চলতে থাকলে অভ্যুত্থানের মারফৎ ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্রিটিশ বেনিয়া ও ভারত ধনিক, বণিকগোষ্ঠী–যাদের নেতৃত্বে পরিচালিত কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ।
১৯৪৬-এর এই অভ্যুত্থানের পরিবেশ এড়ানোর জন্যে এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে নামলো এই বেনিয়ারা। সারা দেশ রক্তাক্ত হলো ভ্রাতৃঘাতি দাঙ্গায়। সাধারণ মানুষকে বুঝানো হলো হিন্দু মুসলমান দু’জাতি। এরা এক সঙ্গে থাকতে পারে না। সুতরাং ভারত বিভাগ চাই। এ তত্ত্বে শেষ পর্যন্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিও সায় দিল।
এ পরিবেশে ৬ বছর জেল খেটে আরএসপির নেতৃবৃন্দ বাইরে এলেন। দেশ বিভাগের বিরুদ্ধে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সভায় জোর প্রতিবাদ জানালেন। সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের জন্যে নেতাজীর অগ্রজ শরৎ বসুর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হলেন। এই প্রয়াসে সঙ্গী হয়েছিলেন মুসলিম লীগের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেম। কিন্তু শেষ মুহূর্তের প্রয়াস কোনো কাজে আসেনি। কংগ্রেস আর মুসিলম লীগ হাইকমান্ডের সহয়েগিতায় বিভক্ত হয়েছে ভারতবর্ষ।
এই বিভক্ত বাংলার পূর্বাঞ্চল নিয়ে গঠিত পূর্ব বাংলা পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানে মুখ্যত আরএসপির সংগঠন ছিল বৃহত্তর কুমিল্লা, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, পাবনা এবং দিনাজপুরে। এ সংগঠনের নেতৃত্ব এসেছিল শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। দেশ বিভাগের পর নেতৃত্বের অধিকাংশই পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায় চলে যায়। যারা আজকের বাংলাদেশে থেকে যায় তাদের মোকাবেলা করতে হয় চরম নির্যাতন। দল হিসেবে পরিচিত নেই, অথচ সমস্ত নির্যাতনের ভাগীদার হয়ে শ্রমিক ফ্রন্ট ভিত্তি করে সামনে আসতে আসতে ১৫ থেকে ২০ বছর কেটে যায়।
