১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর নেপাল দা একবার কলকাতায় বেড়াতে যান। কলকাতায় নেপাল দার ভাই এক বড় হোটেলের মালিক। সেই হোটেলে আরএসপির শ্রমিক ইউনিয়ন ছিল। একবার শ্রমিক-মালিক বিরোধ দেখা দিলে পার্টির তরফ থেকে নেপালদাকে তার ভাইপোর সঙ্গে আলোচনা করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। নেপাল দা বলেছিলেন মালিক কোনোদিন ভাই হয় না। তারপর নেপাল দা চলে এলেন পূর্ব পাকিস্তানে।
কিছুদিন পরে নেপাল দা ফিরে এলেন শ্রীঘর থেকে। উঠলেন বাহাদুরপুর লেনে। নেপাল দা অসুস্থ, মুখ থেকে রক্ত উঠছে। নেপাল দার ছাত্র কুমিল্লার আশফাকুর রহমান তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে পড়ছিল। তার সন্দেহ হলো নেপাল দা হয়তো ক্যান্সারে ভুগছেন।
নেপাল দাকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলো। ডাক্তারি পরীক্ষায় জানা গেল নেপাল দার গলায় ক্যান্সার এবং শেষ অবস্থা। ক্যান্সার জেনেই আইয়ুব সরকার নেপাল দাকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু কাউকেই জানায়নি যে নেপাল দা ক্যান্সারে ভুগছেন।
পূর্ব পাকিস্তানে ক্যান্সারের চিকিৎসা নেই। ডাক্তাররা বলল কোলকাতায় পাঠাতে। নেপালদাকে জানানো হলো তাঁর অসুখের কথা। নেপাল দা কিছুতেই কলকাতায় যাবেন না। নেপাল দা বললেন, দেশ ভাগের পর কলকাতার বন্ধুরা
আমাকে ভারতে থাকতে বলেছিল। আমি বলেছিলাম আমি মাতৃভূমিতে ফিরে যাব। বিপ্লব আমাদের দেশেই আগে হবে। এখন যদি আমি কলকাতায় যাই, বন্ধুরা বলবে আমি পরাজিত হয়েছি। কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষায় নেপাল দা বললেন–আমি ডিফিট হইতাম চাই না।
সেদিনের কথা আমার এখনো মনে আছে। আমি ও রুহুল আমিন সাহেব বারবার বোঝাতে চেয়েছিলাম এতে পরাজয়ের কিছু নেই। আপনি চিকিৎসার জন্যে যাচ্ছেন। আমি বন্ধুদের চিঠি লিখে দেব। পরিষ্কার করে সব জানাব। আপনাকে কিছু ভাবতে হবে না। হঠাৎ নেপাল দা আমার হাত জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, সত্যি সত্যি আপনি লিখে দেবেন। সবাইকে বোঝাতে হবে আমি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসিনি। আপনি চিঠি লিখুন, আমি যাব ।
কিন্তু নেপাল দাকে পাঠাবো কী করে। তার পাসপোর্ট নেই। পাকিস্তান সরকার তাঁকে পাসপোর্ট দেবে না। সিদ্ধান্ত হলো আগরতলা সীমান্ত দিয়ে তাকে ভারতে পাঠানো হবে। আমাদের মধ্যে কেউ তাঁর সঙ্গে যাবে। সব কথা শেষ করে দৈনিক পাকিস্তানে ফিরে গেলাম। তখন আমি রাতের পালায় কাজ করি। গভীর রাতে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে আমাকে ফোন করল-নেপাল দার অবস্থা খারাপ। তাকে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে। গভীর রাতে হাসপাতালে ছুটে গেলাম। নেপালদা ঘুমুচ্ছেন। অবস্থা একটু ভালো। নেপালদার কাছে আছেন তার ভাই।
পরের দিন দুপুরে দৈনিক পাকিস্তানে আবার ফোন এল। এবারো আশফাঁক ফোন করেছে। নেপাল দা নেই। দুপুরের দিকে তিনি ভালোই ছিলেন। ওয়ার্ডে কোনো ডাক্তার ছিল না। নেপাল দা অক্সিজেনের নলটা খুলে অন্যান্য রোগিদের সেবা করছিলেন, হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যান। নেপাল দা অন্যের সেবা করতে করতেই মারা গেলেন। তাঁকে মাতৃভূমি ছাড়তে হলো না।
পরের দিন নেপাল দাকে নিয়ে আমি আর কাজী হাতেম আলী শ্রীঘর গিয়েছিলাম। সন্ধ্যায় শ্রীঘরের নাহা বাড়িতে কান্নার রোল উঠল। নেপাল দার মায়ের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি বললেন, তোমাদেরও এমনি করেই মরতে হবে। কথাগুলো আজো আমার মনে বাজছে।
কমরেড নেপাল দা অর্থাৎ কমরেড নেপাল নাহার মৃত্যুতে আমরা চরম বিপদে পড়ে গেলাম। নেপাল দার সঙ্গে শ্রমিক নেতা আবুল মান্নান ও মিসির আহমদ থাকতেন। তারা দুজনেই আমাদের দলের লোক। তবে ৬ দফা নিয়ে কিছুটা মতান্তর আছে। আমাদের মত হচ্ছে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে কেমন সমাজ হবে তা বুঝেই ৬ দফাঁকে সমর্থন করতে হবে। মিসির আহমদ আমাদের সঙ্গে একমত। মান্নানের ভিন্ন মত থাকলেও সে খুব সোচ্চার নয়। তাদের সঙ্গে নেপাল দা থাকায় একটা ভারসাম্য ছিল। তাই নেপাল দার মৃত্যুতে আমরা কিছুটা বিপদে পড়ে গেলাম। আমরা অবিভক্ত ভারতবর্ষের আরএসপির লোক হলেও ১৯৫০ সালের পর আরএসপি নামে কাজ করা সম্ভব ছিল না। পাকিস্তানে সমাজতন্ত্রের কথা বলা ছিল দণ্ডনীয় অপরাধ। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাধারণ নির্বাচন হয়। যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। কিছুদিনের জন্যে আমরা স্বস্তিলাভ করি। আর তার পরেই যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়া হয়। সারাদেশে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়। আবার আমাদের বেছে নিতে হয় জেলে যাওয়া ও আত্মগোপনের জীবন।
এ সময় যুক্তফ্রন্ট নেতৃত্বের দেউলেপনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তফ্রন্টের বড় দু’টি দলের নাম আওয়ামী লীগ এবং কেএসপি। আওয়ামী লীগের নেতা মওলানা ভাসানী ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কেএসপির নেতা ছিলেন শেরেবাংলা একে ফজলুল হক। আওয়ামী লীগের গায়ে কিছুটা প্রগতিশীল ছাপ ছিল। কিন্তু ক্ষমতা দখলের ব্যাপারে কেএসপির সঙ্গে কোনো পার্থক্য ছিল না। এ দু’টি দলই ক্ষমতায় যাবার দ্বন্দ্ব লড়াইয়ে ক্রমাগত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারকে খুশি করার চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই দেউলেপনার জন্যে পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি হয়েছে। সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় এসেছে। এ পটভূমিতে আরএসপি নামে প্রকাশ্যে কাজ করার কোনো সুযোগই ছিল না।
