১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল। এ দুবছর আমাদের ব্যস্ত থাকতে হয়েছে চটকল শ্রমিকদের নিয়ে। অনেক শ্রমিক এলাকায় আমাদের পরিচিতি ছিল রূপকথার মতো। আইয়ুব খানের আমলে আমরাই বিদ্রোহ করেছিলাম প্রথমে, ষাটের দশকে এবং জিতেছিলাম। আমাদের চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন আদমজীর মওলানা সাইদুর রহমান। তখনও তেজগাঁও শিল্প এলাকা শ্রমিক অসন্তোষ চলছিল। তেজগাঁওয়ে আমাদের শ্রমিক সংগঠন নেই। তবুও তেজগাঁওয়ের শ্রমিকদের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হলো একবারের জন্যে মওলানা সাইদুর রহমানকে তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ঘুরিয়ে আনতে। মওলানা সাহেব একদিন শ্রমিকদের নিয়ে তেজগাঁও শিল্প এলাকায় শুধুমাত্র পায়ে হেঁটে এলেন। পরের দিন মালিকেরা শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসল।
আমাদের প্রভাব আমাদের কাল হলো। আওয়ামী লীগের একটি মহল যারা পরবর্তীকালে জাসদ গঠন করেছিল তারা আমাদের সংগঠনে তাদের লোক ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করল এবং কাজ করতে শুরু করল। তখনো শ্রমিক লীগ গঠিত হয়নি। আওয়ামী লীগ চেষ্টা করতে শুরু করল আমাদের সংগঠনকে ভিত্তি করে নতুন সংগঠন দাঁড় করাতে। আমাদের ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় অফিস ছিল ১৬ বাহাদুরপুর লেনে। বাহাদুরপুর লেনের এই অফিসে আমাদের কেন্দ্রীয় নেতা প্রয়াত কমরেড নেপাল নাহা ও শ্রমিক নেতা মরহুম আব্দুল মান্নান ও মিসির আহমদ থাকতেন। এখানেই শুরু হলো ছাত্রলীগের তৎপরতা।
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা দাবি ঘোষণা করলেন। এই ছ’দফা ব্যাখ্যা এবং গ্রহণ ও বর্জন নিয়ে আমাদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিল। তখন আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন বামপন্থী গ্রুপের নেতারা কথা বলেছেন। কথা বলেছেন ছাত্রলীগের নেতারা। তাঁদের সকলের কথা দেশ স্বাধীন করতে হবে। পাকিস্তানে থাকা যাবে না। আমাদের কথা হলো স্বাধীন বাংলাদেশ কেমন হবে আমরা আগে জানতে চাই। তার কোনো চিত্র ছ’দফায় নেই। ছ’দফা হচ্ছে পাকিস্তান থেকে চলে আসার দলিল। এতে ভবিষ্যৎ সমাজ সম্পর্কে কোনো বক্তব্য নেই। আমাদের এই আলোচনার সময়টা সারা দেশে এক নতুন আবেগ সৃষ্টি হলো, বাংলাদেশ স্বাধীন করার লক্ষ্যে। একদিন এক ব্যবসায়ী এলেন আমার কাছে। তিনি মনে প্রাণে নির্ভেজাল আওয়ামী লীগ বিরোধী। আমাকে বললেন, আমি নিউমার্কেটে একটা হোটেল দেব। হোটেলের নাম হবে বাঙালি। বাঙালি খাবার ব্যতিত অন্য কোনো খাবার থাকবে না।
এ ভভদ্রলোক দেশ স্বাধীন হবার পর দুটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করেছিলেন এবং জেল খেটেছিলেন। এ ভদ্রলোকের সঙ্গে দিনের পর দিন আলোচনা হয়েছে। অপরদিকে প্রায় প্রতিদিন শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হচ্ছেন। আইয়ুব খান ধমক দিচ্ছেন। সব মিলে সারাদেশে যে একটি আবাহওয়ার সৃষ্টি হয়েছে। আজ মনে হচ্ছে কালের সে পরিস্থিতি আমরা হৃদয় দিয়ে নয়, শুধুমাত্র যুক্তি দিয়ে বুঝবার চেষ্টা করেছি। আমরা বুঝতে পারিনি, আমাদের সংগঠনেও এক নতুন আবেগের সৃষ্টি হয়েছে এবং তারই সুযোগ নিয়েছে আওয়ামী কর্মীরা। ১৯৬৬ সালের ৬ জুন আওয়ামী লীগ ছ’দফা দিবস ঘোষণা করে। তেজগাঁওয়ে মনু মিয়াসহ ১১ ব্যক্তি নিহত হয়। প্রথম ধরপাকড় শুরু হয় সারাদেশে। এ সময় গ্রেফতার হয়ে যায় আমাদের ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান ও আমাদের নেতা কমরেড নেপাল নাহা। আমার আজকে মনে হচ্ছে ছ’দফার প্রশ্নে নেপাল দা আমাদের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এ আন্দোলনের সঙ্গে আপনার কি সম্পর্ক ছিল? আপনি কেন মান্নানকে আমাদের দলীয় সিদ্ধান্তের কথা জানাননি। নেপালদা বলেছিলেন, তাঁর ধারণা ছিল এ আন্দোলন দানা বাঁধবে। তাই মান্নানকে আন্দোলনের সঙ্গে থাকতে বলেছিলেন। জেলখানায় নেপালদার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলোচনা হয়েছিল। শেখ সাহেব বলেছিলেন আসুন একসঙ্গে আন্দোলন করি। নেপাল দা জবাব দিয়েছিলেন আমরা তো আন্দোলনে আছি, আমাদের আন্দোলন সমাজ পরিবর্তনের জন্যে। আপনারা আসুন।
১৯৬৯ সালে শেখ সাহেব জেল থেকে বের হয়ে আসার পর আবার আমাদের ডেকেছিলেন। তার প্রস্তাব ছিল এক সঙ্গে শ্রমিক ফ্রন্ট গঠনের । তিনি আলোচনা করেছিলেন আমাদের অন্যতম নেতা রুহুল আমিন কায়সারের সঙ্গে তাঁর ৩২ নম্বর সড়কের বাসায়। রুহুল আমিন সাহেবও জবাব দিয়েছিলেন আমরা আন্দোলনে আছি। আপনার প্রস্তাব বিবেচনা করব।
১৯৬৬ সালের নভেম্বরের দিকে হঠাৎ নেপাল দা এসে হাজির। তিনি জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। কেন মুক্তি পেলেন আমাদের বোধগম্য হলো না। তার সঙ্গে আমার দেখা হলো রায়েরবাজারে রুহুল আমিন সাহেবের বাসায়। দেখলাম নেপাল দা কাশছেন। কাশতে কাশতে তাঁর মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। বললাম, নেপাল দা আপনি কি অসুস্থ? তিনি বললেন, একটু কাশি হয়েছে। পকেটে কিছু ওষুধ আছে। ভাববার কিছু নেই।
আমি বললাম, নেপালদা আপনি বাড়ি যান। সকলের সঙ্গে দেখা করুন। আপনি ফিরে এলে দেখা করব।
নেপাল নাহার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার শ্রীঘর গ্রামে। রায় বাহাদুর অনঙ্গমোহন নাহার পরিবারের সদস্য তিনি। জেলখানা থেকে এমএ পাস করেছেন। নরসিংদী থেকে লঞ্চে নবীনগর যাবার পথে মানিকনগর স্টেশনে নামতে হবে। কিছুদূর হেঁটে গেলে যতদূর চোখ যায় সব জমির মালিক হচ্ছে নাহা পরিবার। নেপাল দা ছাত্রজীবনে অনুশীলন সমিতির সংস্পর্শে আসেন। পরে আরএসপিতে যোগ দেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় তিনি পাকিস্তান থেকে যান। ৫০-এর দশকের নিখিল পাকিস্তান ফেডারেশন অব লেবারের সহকারি সম্পাদক ছিলেন। ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন ফয়েজ আহম্মদ। ৫০-এর দশকে তিনি গ্রেফতার হয়ে যান। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর তিনি কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে দলের নির্দেশে তিনি ঢাকায় আসেন। সদরঘাট ইস্ট বেঙ্গল ইন্সটিটিউশনে শিক্ষকতা গ্রহণ করেন। তার বাসস্থান ফরিদাবাদের ১৬ বাহাদুরপুর লেনে ছিল পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের অফিস। নেপাল দার বাড়ি যাবার সঙ্গী হচ্ছে গামছায় জড়ানো একটি লুঙ্গি, হাতে কাঁচা একটি জামা ও দাঁতনের জন্যে একটি নিমের ডাল।
