তবে আন্দোলন এখানেই শেষ হলো না। মালিকপক্ষ দু’মাসের মধ্যে আমাদের দাবি-দাওয়া মেনে নিল। অক্টোবরে আমাদের দ্বিতীয়বারের জন্যে ধর্মঘটে যেতে হলো।
এবার শুধু ৫টি কলেই নয়, দেশের অধিকাংশ চটকলেই ধর্মঘট হয়েছিল। এ ধর্মঘট চলছিল দীর্ঘ ৫৫ দিন।
তবে এর পরেও ধর্মঘট করতে হলো। এবার ধর্মঘট হলো ১৯৬৫ সালে। এবারও দাবি বেতন বৃদ্ধির। ১৯৬৪ সলের দ্বিতীয় ধর্মঘটে বাকি ৮ টাকা বেতন বৃদ্ধি হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ করা গেলো বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই পণ্য মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। চালের দাম বাড়ছে। ৮১ টাকায় আর ৫ মণ চাল পাওয়া যায় না এবং সেই প্রেক্ষিতেই ১৯৬৫ সালে আবার ধর্মঘটে গেল চটকল শ্রমিকরা। এবার সারাদেশে চটকল শ্রমিক ধর্মঘট। পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশন তখন অসম্ভব জনপ্রিয়। কোথাও আমাদের যেতে হয় না। শ্রমিকেরা আমাদের সঙ্গে ইউনিয়ন নির্বাচন করে এবং জয়লাভ করে। চট্টগ্রামের কিছু কিছু এলাকা ব্যতিত খুলনা থেকে শুরু করে আদমজী, কাঞ্চন, নরসিংদী, ঘোড়াশাল সর্বত্রই পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশন-এর অপ্রতিহত প্রভাব। তাই এবারের ধর্মঘটে সকল প্রতিষ্ঠানকে সমর্থন দিতে হলো। ফয়েজ আহমেদের শ্রমিক প্রতিষ্ঠান পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। বাকি ছিল চট্টগ্রামের আবুল বাশারের চটকল শ্রমিক সংগঠন। শেষ পর্যন্ত তারাও আমাদের সমর্থন দেয়।
তবে এই ধর্মঘটে তারা ন্যক্কারজনক ভূমিকা পালন করে। ধর্মঘট পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশন আহ্বান করেছিল। আমরাই এ ধর্মঘটের নেতৃত্ব ছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে আমি সংবাদপত্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলাম। আমি তখন দৈনিক পাকিস্তানে কাজ করি। হঠাৎ একদিন শোনা গেলো তোয়াহা সাহেব এবং বাশার সাহেব চট্টগ্রামে বাওয়ানী জুটমিলের মালিক ওয়ানির সঙ্গে বসেছেন এবং একটি চুক্তিও স্বাক্ষর করেছেন। এই চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছেন রাশেদ খান মেননের ভাই জনাব আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। তিনি তখন চট্টগ্রামের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তাঁর দফতরেই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো অথচ আমাদের কিছুই জানানো হলো না। শুনেছি মেনন ছাত্রনেতা হিসেবে এ চুক্তির বিরোধিতা করেছিল।
আমার কাছে ঘটনাটি খুব অস্বাভাবিক মনে হয়নি। তখন কমিউনিস্ট পার্টির তত্ত্ব হচ্ছে জাতীয় গণতান্ত্রিক ও জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব। এই দুই বিপ্লবের সহযোগী জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণি। এই জাতীয় বুর্জোয়াদের অন্যতম নেতা ইস্পাহানির সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক বহুল আলোচিত। ইস্পাহানিরও চটকল আছে। সেই চটকলেও ধর্মঘট হচ্ছে। সুতরাং জাতীয় বুর্জোয়ার প্রতিনিধি হিসেবে বাওয়ানীর সঙ্গে কমিউনিস্ট প্রভাবিত শ্রমিক সংগঠনের চুক্তি আমার কাছে খুব বিষ্ময়কর মনে হয়নি। তবে বিস্মিত হয়েছিলাম একটি কারণে–কী করে আমাদের না জানিয়ে যারা আমাদের ধর্মঘট সমর্থন করলো তারাই চুক্তি স্বাক্ষর করল। এটা কোন ধরনের শ্রমিক রাজনীতি! এ জন্যে চট্টগ্রাম চুক্তির নেতাদের আজও কথা শুনতে হয়। সেটা ছিল চটকল শ্রমিক আন্দোলনের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়।
তবে ঐ চুক্তি আমরা মানিনি। তোয়াহা সাহেব ধর্মঘট প্রত্যাহার করার জন্যে প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন। একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেছিল যে ধর্মঘট আপনারা ডাকেননি সে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন কী করে? তোয়াহা সাহেব কোনো জবাব দিতে পারেননি। সাংবাদিক সম্মেলন থেকেই এক বন্ধু আমাকে ফোন করে জানান যে তোয়াহা সাহেব ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন আর সঙ্গে সঙ্গে আমি পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে ঘোষণা করি যে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়নি, ধর্মঘট চলছে। ফলে চট্টগ্রামে শ্রমিক কাজে যোগ দিলেও আদমজীতে ধর্মঘট চলতে থাকে।
আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে আমরা চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করব না কিন্তু কাজে যোগ দেব। প্রয়োজন হলে পরবর্তীকালে আবার ধর্মঘটে যাব। সরকার পক্ষে চারজন মন্ত্রী লিখিতভাবে আমাদের ধর্মঘট প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানান। জানান যে আপনারা চুক্তি স্বাক্ষর না করলেও আপনাদের দাবি নিয়ে আলোচনা করা হবে। আমরা আদমজীতে ৫০ হাজার শ্রমিকের জনসভা করে চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর না করেই কাজে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু মালিক পক্ষ চুক্তি স্বাক্ষর না করে মিলে ঢুকতে দিতে অস্বীকার করেন। এরপরও ৭ দিন ধর্মঘট চলে। মালিক আমাদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য হয়। শর্ত হচ্ছে আমাদের কোনো শ্রমিকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। আমরা চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করব না। আমাদের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসতে হবে।
এ ধর্মঘটের সময় আমাদের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়। আমরা এই অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি যে রাজনীতির জগতে আমরা নিতান্তই একাকী। শ্রমিক আন্দোলনে সবাই সহযোগিতা করলেও রাজনীতির সঙ্গে আমাদের আবির্ভাব কেউ পছন্দ করছিল না। এসময় বিপদে পড়ে আমরা কাগমারিতে মওলানা ভাসানীর কাছে লোক পাঠিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন–কোনো সাহায্য করার ক্ষমতা আমার নেই। একটি বিবৃতিও আমরা তাঁর কাছ থেকে আদায় করতে পারিনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে এক বন্ধুকে নিয়ে এক ভোরে শেখ মুজিবের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি অক্ষমতা জানিয়ে দিলেন সাহায্য সহযোগিতা করতে। আমাদের সামান্য কিছু টাকা সাহায্য হিসেবে দিতে চেয়েছিলেন। সে টাকা না নিয়ে আমরা ফিরে এসেছিলাম। এ খবর আদমজীতে জানাজানি হবার পরে আদমজীর শ্রমিকদের পক্ষ থেকেই দাবি উঠেছিল আমাদের নিজেদেরই রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে।
