১৯৬৪ সালে ২ জুলাই দেশবাসী বিস্মিত হয়ে যায়। কঠিন সামরিক শাসনের মধ্যে ৫টি চটকলে ধর্মঘট হয়ে গেল। নেতৃত্ব করছে পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশন। একেবারেই নতুন এবং অচেনা। ইতোপূর্বে পূর্ব পাকিস্তানে চটকল শ্রমিকদের নেতা ছিলেন আলতাফ আলী ও ফয়েজ আহমদ। তাদের সঙ্গে ছিলেন খোন্দকার আব্দুল কাদের। কাদের সাহেব তাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমাদের সঙ্গে আসেন। চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সভাপতি ছিলেন হাশেম মোল্লা। ধর্মঘট শুরু হবার আগে হাশেম মোল্লা পদত্যাগ করেন। সহসভাপতি মওলানা সাইদুর রহমান সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৬৪ সালের ধর্মঘট ছিল অভূতপূর্ব। পরদিন ইংরেজি দৈনিক অবজারভার লিখেছিল–গতকাল আদমজীর আকাশে একটি কাকও উড়েনি। ৫টি চটকলের ধর্মঘট ছিল সর্বাত্মক। এই পাঁচটি চটকল হলো আদমজী, ঢাকা, করিম, ফেব্রিকস এবং রাওয়া। এ ধর্মঘট সবাইকে হতচকিত করে দিল। প্রশ্ন দেখা দিল এ ধর্মঘটের নেতৃত্বে কারা। সকলের ধারণা ছিল এদেশ বামপন্থী আন্দোলন মানে কমিউনিস্ট পার্টির আন্দোলন। সব ধর্মঘটই কমিউনিস্ট পার্টি করে থাকে। কিন্তু দেখা গেলো এ ধর্মঘটে তাদের পাত্তা নেই। তাদের সঙ্গে ধর্মঘটের কোনো সম্পর্ক নেই। সেকালের কমিউনিস্ট পার্টি একটি শ্রমিক সংগঠন গড়ে তুলেছিল। সে সংগঠনের নাম পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক পরিষদ। এ সংগঠনের সভাপতি ছিলেন মরহুম মোহাম্মদ তোয়াহা এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জনাব সিরাজুল হোসেন খান। এদের চটকল নেতা ছিলেন আবুল বাশার। এ সংগঠন পরবর্তীকালে মস্কোপন্থী এবং পিকিংপন্থী হিসেবে ভাগ হয়ে যায়। মস্কোপন্থীরা সহিদুল্লাহ চৌধুরী ও সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিকের নেতৃত্বে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র গঠন করেন। অপরদিকে পিকিংপন্থীরা গঠন করেন পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশন। এই ফেডারেশনের পরবর্তীকালে একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। নেতৃত্বের কোন্দলে কাজী জাফর ও আবুল বাশার ভিন্ন সংগঠন গঠন করেন।
এদের রাজনীতির সঙ্গে আমাদের বা পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমরা যারা এককালে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল (আরএসপি) করতাম তাদের ইতিহাস এদের লেখায় কোনোদিন স্থান পায়নি। অথচ বিভাগ পূর্ব যুগেও গোদনাইল এলাকায় বস্ত্র মিলগুলোতে আরএসপির শক্তিশালী সংগঠন ছিল। ১৯৬৪ সালের চটকল ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে শ্রমিক ফ্রন্টে আরএসপির অভ্যুদ্বয়ে এক নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
উল্লেখ্য, ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃত্বে ৩টি বড় ধর্মঘট হয়। এই ধর্মঘট ছিল। ৬৯-এর শ্রমিক এলাকার গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে আমাদের বিভিন্ন বামপন্থী লেখকেরা চটকল ধর্মঘটের এ যুগটিকে আদৌ বিবেচনায় আনেন না। আমাদের দেশে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যসহ অনেকেই শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস লিখেছেন কিন্তু এ পর্বটি সমতলে বাদ দিয়েছেন। কোনোমতে পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশন সম্পর্কে দু’এক লাইন লিখে ইতিহাস শেষ করেছে। আরএসপি বা আমাদের কোনো উল্লেখই এ লেখাগুলোতে নেই। অথচ পাকিস্তানের ২৩ বছরে উল্লেখ করার মতো শ্রমিক আন্দোলন তেমন হয়নি। উল্লেখযোগ্য ছিল ঐ ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত চটকল শ্রমিক আন্দোলন। এই আন্দোলনই পরবর্তীকালে অন্য আন্দোলনের জন্ম দেয়। তবে শ্রমিক আন্দোলনের জন্য এই আন্দোলনেরই অবশ্যাম্ভাবী পরিণতি টঙ্গী শিল্প এলাকায় কাজী জাফরদের আন্দোলন এবং খুলনা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত আমাদের চটকলের আন্দোলনই ছিল শিল্পাঞ্চলে বড় ধরনের ঘটনা। কিন্তু রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ফলে সেকালে চটকল আন্দোলন কাহিনী কোনো দিনই সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি।
উপরের ঘটনা থেকে পরিষ্কার যে আমরা এককভাবেই ধর্মঘট শুরু করেছিলাম। আমরা আরএসপির সদস্যরা তখন তেমন সংগঠিতও ছিলাম না। তাই প্রতি পদে পদে আমাদের বিপদে পড়তে হচ্ছিল। ধর্মঘট শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে ফেডারেশনের সম্পাদক খোন্দকার আবুল কাদের গ্রেফতার হয়ে যান। ধর্মঘট ১২ দিন অতিবাহিত হলে তিনি জেলখানা থেকে বিবৃতি দিয়ে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন এবং মুক্তিলাভ করেন। আমরা সেদিন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিলাম। পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক খোন্দকার আবুল কাদেরকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হলো। অস্থায়ী সম্পাদক হলেন সহকারি সম্পাদক আব্দুল মান্নান। আমরা ধর্মঘট চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমাদের এ সিদ্ধান্ত সকল মহলে আর এক দফা বিস্ময়ের সৃষ্টি করল। ইতোমধ্যে আমরা বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করলাম। পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক পরিষদের সিরাজুল হোসেন খান, রেল শ্রমিক নেতা মাহবুবুল হক সমঝোতার জন্যে একটি কমিটি গঠনের চেষ্টা করলাম। তারা বৈঠক করলেন গভর্নর মোনেম খানের সঙ্গে। কিন্তু আলোচনা সফল হলো না। পরবর্তীকালে আমরাই গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে বসলাম। মালিক পক্ষ এলেন। ২০ দিন ধর্মঘটের পর ২২ জুলাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। মালিক পক্ষ রাজি হলেন আপাতত ৮ টাকা বেতন বৃদ্ধি করা হবে। শ্রমিকদের কাছে ছিল এটা এক অপ্রত্যাশিত বিজয়। ইতিপূর্বে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার আমলে শেখ মুজিবুর রহমান শ্রমমন্ত্রী থাকাকালে চটকল শ্রমিকদের বেতন বেড়েছিল ১ টাকা ২৫ পয়সা। আর ১৯৬৪ সালে বেতন বৃদ্ধি হলো ৮ টাকা। ইত্তেফাক আট কলাম হেডিং লিখলেন চটকল শ্রমিকদের কাছে মালিক পক্ষের নতি স্বীকার। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এ বিজয় আমাদের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসের বইতে নেই।
