তখন জেহাদ অফিস থেকে সোনার বাংলা নামে একটি সাপ্তাহিক প্রকাশ শুরু হলো। এই সাপ্তাহিকের সকল দায়িত্বে ছিলেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী। ঐ কাগজে চাকরি করতেন অভিনেতা নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুন ও এককালের চিত্রালী সম্পাদক জনাব আহমেদুজ্জামান চৌধুরী। কাগজটি সেকালের সাপ্তাহিকদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।
হঠাৎ কাগজটির মালিকানা পরিবর্তন হলো। মালিক হলেন আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক হাফেজ হাবিবুর রহমান। তাহের উদ্দীন ঠাকুর তখন ইত্তেফাঁকের স্টাফ রিপোর্টার। তিনি একদিন আমার সঙ্গে কথা বললেন। বললেন, আমাকে বিকালের দিকে পুরানা পল্টনে আওয়ামী লীগ অফিসে শেখ মুজিবুর রহমান ডেকেছেন। বিকেলে আমি আওয়ামী লীগ অফিসে গেলাম। শেখ সাহেবের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি বললেন–হাবিবুর রহমান সাহেব আমার বন্ধু। তিনি সোনার বাংলা কিনেছেন। আপনাকে একটু সহযোগিতা করতে হবে। আমি সোনার বাংলায় যোগ দিলাম। আমিই সর্বময় কর্তা। কিন্তু পেছনের কর্তা জনাব তাহের উদ্দীন ঠাকুর। সোনার বাংলায় লিখতেন জনাব তাহের উদ্দীন ঠাকুর এবং ইত্তেফাঁকের মোহাম্মদ উল্লাহ চৌধুরী। নীতি নির্ধারণও তাঁরা করতেন।
সোনার বাংলায় যোগ দেবার দিন আমার নিজেকে বড় ছোট মনে। হয়েছিল। আমি যাবার পরে আবদুল্লাহ আল মামুন ও আহমেদুজ্জামান চৌধুরীকে সোনার বাংলা ছেড়ে যেতে হয়। এ কথা আগে জানলে আমি হয়তো সোনার বাংলায় যেতাম না।
তবে সোনার বাংলায়ও আমার বেশিদিন থাকা হয়নি। সামরিক শাসনের আট বছর চলছে। ১৯৬৪ সালে এসে আইয়ুব খান বুঝতে পেরেছিল পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। তাই সংবাদপত্র জগতকে নিজেদের কজায় রাখার জন্যে সামরিক শাসকেরা এক নতুন কৌশল অবলম্বন করল। পাকিস্তানের বৃহৎ পুঁজিপতিদের সমন্বয়ে সৃষ্টি হলো পাকিস্তান প্রেস ট্রাস্ট। এই প্রেস ট্রাস্টের অধীনে এলো পশ্চিম পাকিস্তানের ৯টি সংবাদপত্র ও পূর্ব পাকিস্তানের মর্নিং নিউজ এবং একটি নতুন বাংলা দৈনিক বের করার সিদ্ধান্ত হলো ঢাকা থেকে। এই দৈনিকের নাম দৈনিক পাকিস্তান। দৈনিক পাকিস্তানের বার্তা সম্পাদক হয়ে এলেন মোজাম্মেল হক। তিনি ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে প্রথম জীবন পর্যন্ত সার্বক্ষণিক রাজনীতিক ছিলেন। তিনি বরিশালে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল আরএসপি করতেন। তার কাছেই আমার। রাজনীতির হাতেখড়ি। তার জীবনে তখন অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। দেশ। ভাগ হবার পর তিনি ভারতে চলে যান। এক সময় আরএসপির মুখপত্র দৈনিক গণবার্তার প্রধান প্রতিবেদক হন। ১৯৫২ সালে ভারত ও পাকিস্তান থেকে ফিরে আসেন এবং সংবাদপত্রে যোগ দেন। এক সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তখন তিনি দৈনিক আজাদে কাজ করতেন। দৈনিক আজাদের মালিকের সঙ্গে বিরোধ হওয়ায় তিনি চাকরি হারান। দীর্ঘদিন সংবাদপত্রের বাইরে থাকার পর তিনি দৈনিক পাকিস্তানের বার্তা সম্পাদক হয়ে আসেন। সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। এ পত্রিকায় আমাকে নেয়ার ইচ্ছা থাকলেও মোজাম্মেল দা কোনোদিনই দৈনিক পাকিস্তানের চাকরির কথা বলেননি। তিনি জানতেন আমাকে নিতে অনেক বাধা আছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত দৈনিক পাকিস্তানের মালিকদের গরজেই আমাকে নেয়ার প্রস্তাব এল। প্রস্তাব করলেন আইয়ুব খানের একজন একান্ত ব্যক্তি জামালউদ্দিন আলী ও পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের এককালের সভাপতি সালাউদ্দীন মোহাম্মদ। তাদের বক্তব্য হচ্ছে–সাধারণত সরকারপন্থী পত্রিকা সাম্প্রদায়িক হয়। সে ক্ষেত্রে নির্মল সেনকে টেবিলে বসিয়ে রাখলে হয়তো সাম্প্রদায়িকতার ঝাঁঝ একটু কম থাকবে। অপরদিকে এ পত্রিকায় বামপন্থীদের নেয়া হলে এর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। তাই এ পত্রিকায় প্রথম থেকেই এসেছিলেন শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আহম্মেদ হুমায়ুন, তোয়াব খান প্রমুখ। আমি চাকরি পেলাম, শিফট-ইন-চার্জ।
কিন্তু দৈনিক পাকিস্তানে যোগ দেয়ার আগে আমি অন্যত্র কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। দলের সিদ্ধান্ত ছিল শ্রমিক ফ্রন্টে কাজ করার। ঢাকায় নেপাল নাহা চলে এলেন। এলেন মিসির আহম্মদ। গঠিত হলো পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশন। প্রেসিডেন্ট হাসেম মোল্লা, ভাইস প্রেসিডেন্ট মওলানা সাইদুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক খোন্দকার আব্দুল কাদের, সহকারি সম্পাদক আবদুল মান্নান, কোষাধ্যক্ষ হলেন রুহুল আমিন কায়সার। এই আব্দুল মান্নানই পরে লালবাহিনী মান্নান বলে খ্যাত। এই চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকেই ১৯৬৪ সালের ২ জুলাই পাঁচ দফা দাবির প্রেক্ষিতে ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। এই হরতাল ২২ দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এই হরতালকে কেন্দ্র করে অনেক ঘটনা ঘটে। তখন আমার চাকরি ছিল না। দৈনিক পাকিস্তানে যোগ দেয়ার প্রশ্নই ওঠেনি।
১৯৫৪ সালের ১৪ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। এ দাঙ্গায় আমাদের দেশের শ্রমিক সমাজ অংশগ্রহণ করেছিল। আদমজী শ্রমিকদের ভূমিকা আদৌ গৌরবজনক ছিল না।
জুলাই মাসে এ চটকল শ্রমিকদের নিয়েই আমরা আন্দোলন শুরু করলাম। আগে চটকল শ্রমিকদের নিম্নতম বেতন ছিল মাসে ৬৫ টাকা। আমরা দাবি করলাম মাসিক বেতন ৮১ টাকা হতে হবে। আমাদের দাবির ভিত্তি ছিল ৫ মণ চালের দাম। তখন চাল ছিল ১৫ টাকা মণ। ৮১ টাকা বেতন হলে ৫ মণ চাল কিনেও ৬ টাকা হাতে থাকে। আজো দাবি দাওয়ার আন্দোলনে শ্রমিকরা নিম্নতম মজুরি হিসেবে ৫ মণ চালের দাম দাবি করে থাকে। এ ভিত্তি নির্ধারিত হয় আমাদের আন্দোলনে।
