সেদিন রাতে ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’–এই শিরোনামে সেই আহ্বান জানানো হয়। আমাদের পত্রিকা জেহাদে সেই আহ্বান ছাপানো সম্ভব হয়নি মালিকের নির্দেশে। সেদিন দাঙ্গা আরো ছড়িয়ে পড়ে। সেদিনই গভর্নর মোনেম খান ঢাকায় ফিরে আসেন। রাতে সম্পাদকের গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে অবিলম্বে দাঙ্গা থামানোর অনুরোধ জানান। রাজনীতিবিদদের নেতৃত্ব করছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি গভর্নর মোনেম খানকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে দাঙ্গা থামাবার চরমপত্র দেন। সত্যি সত্যি ২৪ ঘন্টার মধ্যে মোটামুটিভাবে দাঙ্গা থেমে গিয়েছিল। প্রমাণিত হয়েছিল দাঙ্গা লাগানো এবং থামানো সবকিছুই মুখ্যত সরকারের ওপর নির্ভর করে।
এ সময়ের দুটি ঘটনা আমার এখনও মনে আছে। সেদিন রাতে আমি দৈনিক জেহাদের কাজ করছিলাম। গভীর রাতে অগ্নিযুগের নেতা মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর একটি বিবৃতি এলো। উপমহাদেশের জীবিত বিপ্লবীদের মধ্যে তখন মহারাজ ছিলেন বয়োজ্যষ্ঠ নেতা। তিনি ব্রিটিশ আমলে ৩০ বছর জেল খেটেছেন। তিনি হেমেন দাশ রোডে থাকতেন। দাঙ্গায় আশ্রয়হীন হয়ে শিবির থেকে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন নিজের দেশ আশ্রয় শিবিরে থাকার জন্যে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলন করিনি। তাঁর এ বিবৃতিও আমি ছাপাতে পারিনি।
ভোরবেলা সান্ধ্য আইন এড়িয়ে জগন্নাথ হলের দিকে যাচ্ছিলাম। পথে দেখলাম সান্ধ্য আইনের মধ্যেই ড, আবু মাহমুদের লাল গাড়িটি দক্ষিণ দিকে ছুটছে। ড, মাহমুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। আমাদের প্রিয় শিক্ষক। আমি গাড়িটি থামালাম। স্যার চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, নির্মল সাবধানে হলে যাও। আদমজীতে দাঙ্গা হচ্ছে। আমি আদমজীর দিকে যাচ্ছি। আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক একেবারে একা একটি গাড়ি নিয়ে ছুটছেন দাঙ্গা থামাতে। তিনি যাচ্ছেন আদমজীতে। আদমজীর শ্রমিকেরা দাঙ্গা করছে। আর ঐ আদমজীর শ্রমিকদের নিয়েই মাত্র ৬ মাস পরে ১৯৬৪ সালের জুলাই মাসে আমরা পাকিস্তানের বৃহত্তর ধর্মঘট করেছিলাম এবং সে ধর্মঘটে জিতেছিলাম।
আমি তখন জগন্নাথ হলে থাকি। এই উপকারটুকুও ড. মাহমুদ হোসেন করেছিলেন। ভাইস চ্যান্সেলর ড. মাহমুদ হোসেনের সহযোগিতায় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের ভর্তি হতে পারব কিন্তু হলে থাকতে পারব না। এ পরিস্থিতিতে আমি ঢাকায় হলের বাইরে পুরনো মোগলটুলিতে থাকতাম। এক সময় গভর্নর মোনেম খানের সঙ্গে ভাইস চ্যান্সেলরের অনুমতি না নিয়ে পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢুকে পড়ে। প্রতিবাদে ড. হোসেন পদত্যাগ করেন। ঢাকা ছেড়ে যাবার আগে তিনি ড. গোবিন্দ দেবকে ফোন করেন এবং বলেন, নির্মল খুব অসুবিধায় আছে। পারলে তাকে একটা সিট দেবেন। ড. গোবিন্দ দেব আমাকে ডেকে একথা জানালেন এবং বললেন, তুমি সিট পাবে কিন্তু হলে যেতে পারবে না।
ড. গোবিন্দ দেব কেনো এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা আমি কোনোদিন জানতে চেষ্টা করিনি। ড. হোসেন কেন এ ধরনের অনুরোধ করেছিলেন তাও আমি জানি না। কারণ ড. হোসেনের সঙ্গে আমার দ্বিতীয়বার দেখা হয়নি। তবে সিট পেয়েও আমার সঙ্কট কাটেনি। সকাল সাড়ে আটটায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে যেতে হতো। ১২টায় জেহাদ অফিসে যেতে হতো। হলে ফিরতে রাত তিনটায়। হলের গেটে তালা দেয়া থাকত। কী করে প্রতিরাতে ঐ হলে আমি ঢুকতাম আমি ব্যতীত ঐ হলের দারোয়ানও তা জানত না। তবে আমি এ পরিস্থিতিতে পড়াশুনা চালিয়ে গেলেও সরকার আমাকে কোনোদিনও করুণা করেনি। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো জেহাদে সরকারি পত্রিকা হওয়া সত্ত্বেও ঐ পত্রিকায় আমি বিরোধী দলের খবর বেশি দিচ্ছি।
পত্রিকার নাম জেহাদ। পত্রিকার মালিক ইব্রাহিম তাহা। তার বড় ভাই এটিএম মোস্তফা কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী। সুতরাং এ কাগজে বিরোধী দলের খবর বড় হতে পারবে না। বড় করে ছাপাতে হবে সরকারি খবর। রাওয়াল পিন্ডিতে খবর দিয়েছেন, আমি সে নীতি অনুসরণ করছি না। পরপর চল্লিশটি বিরোধী দলের খবর বড় করে ছাপিয়েছি। ছোট করেছি সরকারি খবর। এ খবর উচ্চ মহলে দিয়েছেন মরহুম সাদেকুর রহমান। তিনি তথ্য দফতরের অধিকর্তা।
একদিন তাহা সাহেব আমাকে একথা বললেন। বললেন, মন্ত্রিসভায় কথা উঠেছিল। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছিলেন জেনারেল আইয়ুব খান। তিনি নাকি মোস্তফা সাহেবকে বলেছেন, নির্মল সেন বার্তা সম্পাদক থাকলে বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যাবে। এ কথা মোস্তফা সাহেব তাহা সাহেবকে জানিয়েছেন। তাহা সাহেব বলেছেন, নির্মল সেন বার্তা সম্পাদক থাকবে। সরকারি চাপে তাকে আমি সরাব না।
ইতোমধ্যে একদিন একটি পার্টিতে আমি আমন্ত্রণ পেলাম। পার্টি হচ্ছিল শাহবাগ হোটেলে। বর্তমানে পিজি হাসপাতাল। সে পার্টি ছিল তৎকালীন কেন্দ্রীয় তথ্য সচিব আলতাফ গওহরের সম্মানে। আলতাফ গওহর পাকিস্তানে তখন জাদরেল আমলা। সাদেকুর রহমান সাহেবও ছিলেন। এক সময় শহীদুল্লাহ কায়সার আলতাফ গওহরের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সাদেকুর রহমান তখন সামনেই ছিলেন। আমাকে দেখে আলতাফ গওহর বললেন, আপনিই সেই নির্মল সেন। এরপর কথায় কথা উঠল। আমি বললাম সাদেকুর রহমান সাহেবের অভিযোগ সত্য নয়। কোনো পক্ষেরই গুরুত্বহীন খবর আমি গুরুত্ব দিয়ে ছাপাতে অভ্যস্ত নই। সাদেকুর রহমান সাহেব তাঁর অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে আমি চাকরি ছেড়ে দেব। সাদেকুর রহমানের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি আমতা আমতা করতে থাকলেন। তবে এতে জেহাদের অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরবর্তীকালে জেহাদ বন্ধ হয়ে গেল নানা কারণে।
