এ পরিস্থিতি চলতে থাকে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সামরিক শাসনকে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়। তল্কালীন ছাত্র নেতৃত্বও সামরিক শাসনবিরোধী কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। ১৯৫৯ সালে জেলে য়াবার পূর্বে আমিই লক্ষ্য করেছি প্রতিটি সংগঠনের অনাস্থা সামরিক শাসন ছিল তাদের কাছে অপ্রত্যাশিত। এ সামরিক বাহিনীকে মোকাবেলা করার কোনো কৌশল তাদের জানা ছিল না।
এর প্রতিফলন ঘটে ছাত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রে। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন কোনো সরকার উচ্ছেদের আন্দোলনের মুখোমুখি দাঁড়ায়নি। কোনো নির্দিষ্ট দাবির জন্যে লড়েচ্ছে এবং সবশেষে পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচনে যুক্ত ফ্রন্টকে জিতিয়ে আনতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মুখোমুখি দাঁড়ায়নি। ১৯৫৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত ছাত্র প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ব্রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলেও সর্বক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শ মতো চলত না। তাদের কিছুটা স্বকীয়তা এবং স্বাধীনতাও ছিল। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি হবার পর এ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র ছাত্র আন্দোলনই যথেষ্ট নয়। এ আন্দোলন রাজনৈতিক দলের সার্বিক সহযোগিতা এবং নেতৃত্ব প্রয়োজন। এই দোদুল্যমানতায় পড়ে ছাত্র আন্দোলন যেমন থমকে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক নেতৃত্বও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকে।
এমনি করে ৬২ ও ৬৩ সাল কেটে যায়। এই দু’টি বছরের ইতিহাস রাজনীতির ক্ষেত্রে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস। সামরিক সরকার তখন ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। বিভিন্ন আইনে রাজনীতিবিদদের আটকে ফেলছে। রাজনীতি করা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারণ আমাদের দেশের অধিকাংশ রাজনীতিকদের আন্দোলনের তেমন ঐতিহ্য ছিল না। বামপন্থী ছাড়া ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে এদের ভূমিকা ছিল গৌণ। অনেকেরই জেলে যাওয়া শুরু হয় ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। মুসলিম উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সন্তানেরা তখন আন্দোলনের সামনে আসতে থাকে। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পর্যন্ত হাজার হাজার রাজবন্দি ছিল পূর্ব পাকিস্তান জেলে। এর মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। সে অর্থে মুসলিম সম্প্রদায়ের জেলে যাওয়া শুরু হয় ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। সে ইতিহাসও খুব দীর্ঘ নয়। দীর্ঘ নয় বলে ত্যাগ তিতিক্ষার প্রশ্নটি গৌণ হয়ে যায়। সরকারি হামলা এলেই শুরু হয় পিছু হাঁটা। শুরু হয় আত্মসমর্পণ। তাই দেখা যায় ভাষা আন্দোলনের অনেক সংগ্রামী নেতাকে সরকারি চাকরি নিতে। এমনকি পূর্ব বাংলার এককালীন প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খানকে দেখা যায় সামরিক সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে। এই পটভূমিতেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠা ছিল সময়সাপেক্ষ।
অপরদিকে প্রথম থেকেই সামরিক শাসকেরা ছিল শংকিত। সামরিক শাসন উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়। তাই তাতে জনসমর্থন থাকার কথা নয়। তারা ভয় দেখিয়ে অর্থ এবং পদ দিয়েই রাজনীতিকদের দলে ভেড়াতে চেষ্টা করে। আইয়ুব খানেরা ক্ষমতায় এসে সে কাজটি করেছিলেন।
কিন্তু জনসমর্থনহীন কোনো সরকারই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। সে ঘটনাই ঘটল ১৯৬২ সালে। এ সময় আমার চাকরির অবস্থানের পরিবর্তন হয়। জেহাদের মালিক পরিবর্তন হয়। নতুন মালিক ইব্রাহিম তাহা। এককালে সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি ছিলেন ছাত্রলীগের প্রার্থী। তাই আমার সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত। তাহা সাহেবের বড় ভাই এটিএম মোস্তফা তখন আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভার সদস্য। সুতরাং চাকরিটি আমার জন্যে সুখকর ছিল না। ইচ্ছে হলেই সবকিছু লেখা বা ছাপানো যেত না। আবদুল গাফফার চৌধুরী তখন চাকরি ছেড়ে গেছে। সম্পাদক তখন আবুল কালাম শামসুদ্দিন। এই মানুষটিকে তখন আমি বড় কাছ থেকে দেখেছিলাম।
১৯৬৪ সালের জানুয়ারি মাস। ভারতে দাঙ্গা শুরু হয়েছে কাশ্মীরের হযরত বাল মসজিদ নিয়ে। প্রতিদিন দাঙ্গার খবর আসছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার আগে শামসুদ্দিন সাহেব আমার দরজায় দাঁড়াতেন। বলতেন, নির্মল বাবু, সাবধানে থাকবেন। পত্রিকার প্রথম পাতায় দাঙ্গার খবর দেবেন না। দাঙ্গা হলে সকলের সর্বনাশ হবে। ধীরলয়ে কথাগুলো বলে শামসুদ্দিন সাহেব বাড়ি চলে যেতেন। আমি ভাবতাম, এ লোকটি কি সত্যি সত্যি আমার চেনা? শৈশব থেকে জেনেছি আবুল কালাম শামসুদ্দিন আজাদের সম্পাদক। আজাদ মুসলিম লীগের পত্রিকা। আজাদের ভূমিকা সাম্প্রদায়িক। সুতরাং শামসুদ্দিন সাহেব অসাম্প্রদায়িক হতে পারেন না। পরে জেনেছিলাম শামসুদ্দিন সাহেব অসহযোগ আন্দোলনের সময় ব্রিটিশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি ডিগ্রি নিয়েছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
এর মধ্যে একদিন একটি ভিন্ন ঘটনা ঘটল। গভীর রাতে খবর এল দাঙ্গার জন্যে মধ্য কলকাতায় সামরিক আইন জারি করা হয়েছে। আমি একটু হতচকিয়ে গেলাম। সম্পাদক সাহেবকে ফোন করলাম। তিনি বললেন, খবরটি প্রথম পাতার প্রথম সংবাদ করুন। কিন্তু দু’কলামের বেশি হেডিং করবেন না।
দাঙ্গা থামানো গেল না। পূর্ব পাকিস্তানেও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ল। পূর্ব পাকিস্তানের দাঙ্গার পেছনে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক লড়াই ছিল। লড়াই ছিল খুলনার সবুর খান ও গভর্নর মোনেম খানের সঙ্গে নেতৃত্বের। মোনেম খান তখন রাওয়ালপিন্ডিতে। অনেকের ধারণা এই সুযোগে সবুর খান খুলনার খালিশপুর শিল্প এলাকায় অবাঙালিদের নিয়ে দাঙ্গা বাধিয়ে দেয়। সে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে আদমজী এলাকায় এবং ঢাকার আশপাশে। দাঙ্গা থামাবার জন্যে সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের সভা বসে প্রেস ক্লাবে। সিদ্ধান্ত হয় দাঙ্গাবিরোধী সামবেশ ও মিছিল করার। সিদ্ধান্ত হয় দাঙ্গার বিরুদ্ধে একটি আহ্বান জানাবার। সে আহ্বান সকল পত্রিকায় ছাপানো হয় এবং রাজনৈতিক ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ দেখা করবেন গভর্নর মোনেম খানের সঙ্গে।
