কিন্তু পত্রিকা কে চালাবে? আমার উপরে কেউ নেই। এমনকি সালেহ দাদু পর্যন্ত নেই। ব্যক্তিগত জীবনে সালেহ সাহেব অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের বড় ভাই। জীবনে অনেক কিছু করেছেন। চাকরি করেছেন সার্কাসে। শেষ বয়সে বিয়ে করেছেন। যোগ দিয়েছেন সংবাদপত্রে। আমি সালেহ সাহেবের পাশে বসে অনুবাদ শিখতাম। হেডিং শিখতাম। আমার অন্যতম শিফট ইনচার্জ ছিলেন জনাব ফজলুল করিম। পরবর্তীকালে তিনি দৈনিক বাংলায় বার্তা সম্পাদক এবং এবং নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। টিপটপ, ছিমছাপ ভভদ্রলোক। না বুঝে কোনো কিছু করেন না। সবকিছু ভালো করে বুঝিয়ে দেন। তবে খবরদারিও করেন। অথচ তারা কেউই দৈনিক জেহাদে থাকলেন না। শুরুতেই সব প্রাচীন সাংবাদিকদের বিদায় করে দেয়া হলো।
রাতের দিকে দেখলাম তিনজন নতুন লোক এসেছেন। তাঁরা হলেন দফতরের মীর নুরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা ও কাজী জহুরুল হক। এরা নেতৃত্ব দিয়ে কাগজ চালাতে শুরু করলেন। সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক আবদুল গাফফার চৌধুরী।
এর মধ্যে একদিন অঘটন ঘটল। রাতে গিয়ে দেখি কেউই আসেনি। কিন্তু কাগজ চালাবে কে? গাফফার এল। বসে বলল, আপনাকেই রাতের কাগজ চালাতে হবে, কারণ কেউ নেই। সেদিন সংবাদপত্র জগতের একটি বড় খবর ছিল। খবরটি হচ্ছে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের তাপরাধ আইন বাতিল। এ আইনটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মতোই পুরনো। ব্রিটিশ সরকার এ আইনটি জারি করে সীমান্ত প্রদেশে। এ আইনের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন হয়েছে। অসংখ্য মানুষ জেল খেটেছে। এ আইনের বলে নির্যাতন চলেছে অব্যাহতভাবে। কিন্তু ব্রিটিশ চলে যাওয়ার পরেও এ আইন বাতিল হয়নি। প্রায় দেড়শ বছর পর ১৯৬৩ সালে এ আইন বাতিল হওয়া ছিল ঐতিহাসিক ঘটনা।
আমি রাজনৈতিক তাৎপর্যের প্রেক্ষিতে এ খবরটি প্রধান খবর করলাম। হেডিং দিলাম ছ’কলাম। কিন্তু ঘাবড়ে গেলাম পরের দিন ভোরে । ঢাকার কোনো কাগজে এ খবরের দু’কলামের বেশি হেডিং করা হয়নি। আবার কোনো কোনো কাগজে এক কলামের হেডিং করা হয়েছে। দুপুরের দিকে জেহাদ অফিসে গিয়ে দেখলাম অনেকের মুখ ভার ভার ।
বিকেলের দিকে গাফফার পশ্চিম পাকিস্তানের কাগজ নিয়ে এল। পশ্চিম পাকিস্তানের কাগজে ঐ খবরটি আট কলামের ডাবল হেডিং হয়েছে। গাফফার বলল, আপনি ঠিক হেডিং দিয়েছেন। আজ রাত থেকে আপনি জেহাদের ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক। চার মাস আগে যে পত্রিকায় সর্বকনিষ্ঠ সহসম্পাদক হয়ে ঢুকেছিলাম সে পত্রিকায় ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক হওয়া সাধারণভাবে আনন্দদায়ক হলেও আমি আদৌ খুশি হতে পারিনি। কারণ এর আগে অনেক প্রবীণ সাংবাদিকের চাকরি গিয়েছে এ কাগজ থেকে। চাকরি যাওয়া আদৌ কোনো ভালো কথা নয়। আর তাঁরা চাকরিতে থাকলে ঐ পত্রিকায় আমার ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক হওয়ার প্রশ্নই উঠত না।
১৯৬২ সাল ছিল ছাত্র আন্দোলনের এক নতুন প্রস্তুতির যুগ। আমার নিজের ধারণা ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আগের যুগের ছাত্র আন্দোলনের অধ্যায় শেষ হয়ে যায়। আমাদের যুগেও সুস্পষ্ট দুটি ভাগ ছিল। আমাদের মধ্যে একটি ভাগ এসেছিল বিভাগ পূর্ব ভারতবর্ষে ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহ্য নিয়ে। আমাদের সময়কার ছিল কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি ও আরএসপির ছাত্র প্রতিষ্ঠান। অপরদিকে ছিল মুসলিম লীগের ছাত্র প্রতিষ্ঠান। ১৯৪৮ সালে মুসলিম লীগের ছাত্র প্রতিষ্ঠান ভেঙে দু’ভাগ হয়ে যায়। একটি ধারা হচ্ছে আদি অকৃত্রিম মুসলিম লীগ অপর ধারাটি হচ্ছে বিদ্রোহী মুসলিম লীগ যারা ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠন করে। আসামের মুসলিম লীগ নেতা মওলানা ভাসানী পূর্ব বাংলায় আসার পৰু এ গ্রুপের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এই ভাগাভাগির ফলে ছাত্র আন্দোলনের ৩ বার তিনটি ধারার সৃষ্টি হয়। একটি ধারা হচ্ছে–আদি অকৃত্রিম মুসলিম লীগের ধারা। দ্বিতীয়টি আওয়ামী মুসলিম লীগ ধারার সঙ্গে বামপন্থী ধারার ঐক্য হয়ে সগ্রামের ক্ষেত্র। মুসিলম লীগের ধারা ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে পরাজয়ের পর নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পরবর্তীকালে এই ধারা গড়ে ওঠে ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন অর্থাৎ এনএসএফ এবং অসাম্প্রদায়িক ধারার প্রতিষ্ঠান। ছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। এ সকল সংগঠনের নেতাদের সংগঠনের বাইরেও একটি রাজনৈতিক স্বীকৃতি ছিল। এদের সঙ্গে ১৯৫২ সালের পর আর একদল ছাত্র, ছাত্র রাজনীতিতে আসে। তারাও পুরানো নেতৃত্বকে পরিহার করতে পারেনি। আমার ধারণা পুরনো নেতৃত্বের অবসান ঘটে সামরিক শাসন জারি হবার পর।
আজকের বাংলাদেশ অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ছাত্ররা অনেক সময় জাতীয় নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছে। বিরোধী রাজনীতির অঙ্গনে শূন্যতার ফলে ছাত্রদের অনেক সময় বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এ ভূমিকা খুব স্পষ্ট ছিল। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর নির্বাচিত নেতারাই রাজনৈতিক নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। আমাদের ভূমিকা তখন গৌণ হয়ে যায়। ছাত্ররা জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তে দলীয় রাজনীতির অঙ্গে পরিচিত হয়। যার ফলে ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী বনাম মওলানা ভাসানীর বিতর্ককে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে মারামারি হয়। এভাবে ছাত্র প্রতিষ্ঠানের নেতারা সামগ্রিক অর্থে ছাত্রদের নেতা না হয়ে গ্রুপ নেতায় পরিণত হয়।
