জেহাদে চাকরি পেলাম। কনিষ্ঠতম সহ-সম্পাদক। আমার নিচে কেউ স্বাক্ষর করত না। ইত্তেফাঁকে সহকারি সম্পাদক ছিলাম। জেহাদে যোগ দিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব হচ্ছে ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা। এবং সংবাদটি সংক্ষেপে গ্রহণযোগ্য করে শিরোনাম দেয়া। আমি শিরোনাম দিতে জানতাম না। আর টাইপ সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। বার্তা সম্পাদক মোসলেম আলী বিশ্বাস। এডিসন সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক চৌধুরী। প্রধান বার্তা পরিবেশক ছিলেন আসাদুজ্জামান বাচ্চু।
পত্রিকাটি মোনেম খানের সমর্থক। অর্থাৎ সরকারি পত্রিকা। মোনেম খান আইয়ুব খানের লোক। আর আইয়ুব খানের আমলেই আমি দীর্ঘদিন জেলে ছিলাম। তাই চাকরি কিছুতেই ভালো লাগছিল না। এ পত্রিকায় যোগ দেয়ার আগে ইউনিয়নের নেতা কে জি মোস্তফাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, পেশাদার সাংবাদিক হবার চেষ্টা করুন। মালিকের কথা ভেবে লাভ নেই। এ পত্রিকায় যোগ দেয়ার কিছুকাল আগে শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে মিছিল করেছি। ১৭ সেপ্টেম্বর গুলিতে ছাত্র নিহত হতে দেখেছি। সেই সরকারের আমলে সেই সরকারের কাগজে চাকরি করার কোনো ইচ্ছাই আমার ছিল না। কিন্তু এই জেহাদের চাকরিতে এসে আমার জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে গেল।
মাসটা মনে নেই। ১৯৬৩ সালের প্রথম দিকে হবে। ১৯৫৩ সালে বাড়ি থেকে এসেছি। বছর দশেক বাড়ি যাওয়া হয়নি। তাই দু’দিনের জন্যে বাড়ি গিয়েছিলাম। দুদিন পর ঢাকা এসে অফিসে গিয়ে শুনলাম একটি ছেলে আমার জন্যে ঘন্টাচারেক বসে থেকে চলে গেছে। আমি বুঝতে পারছিলাম না ছেলেটি কে হতে পারে। ছেলেটি বলেছিল, আমাকে নাকি তার বিশেষ দরকার।
অফিস শেষে আমি আমার ঢাকা হলের প্রাক্তন প্রভোস্ট জুলফিকার আলীর বাসায় পড়াতে গেলাম। এক সময় তার দুই কন্যা ও এক পুত্রকে পড়াতাম। পুত্রের নাম বাবু। সেই বাবুকে পড়াতে গিয়ে অনেক ঘটনাই ঘটেছে। সে ঘটনার একমাত্র সাক্ষী আমি। বাবু আইএ পাস করেছে। ইংরেজিত অনার্স পড়ছে। আমি এবার পড়াচ্ছি বাবুর তৃতীয় বোন মনুকে। পড়াতে গিয়ে দেখলাম বাড়িটা যেনো থমথম করছে। মনুকে জিজ্ঞেস করলাম বাবু কোথায়। মনু বললো, বাবু ঘুমুচ্ছে। অতবেলা পর্যন্ত ঘুমুচ্ছে কেন। আমার সন্দেহ হলো । শুনলাম বাবু তার বাবার সঙ্গে ঝগড়া করেছে। আমার আর পড়াতে হলো না। জুলফিকার আলী সাহেবের বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম। কিছু দূর এগোতেই ঐ বাসার কাজের ছেলেটি ছুটতে ছুটতে এল। বললো, সাহেব আপনাক ডেকেছেন। জুলফিকার সাহেবের বাসায় ফিরে বাবুর কক্ষে ঢুকলাম। দেখলাম বাবু শুয়ে আছে। বাবু নীল হয়ে গেছে। তার টেবিলে অসংখ্য ঘুমের ট্যাবলেট পড়ে আছে। জুলফিকার সাহেবকে বললাম, স্যার আমি চলে যাচ্ছি। বাবুকে হাসপাতালে নেবার ব্যবস্থা করুন। বাবুকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তার জ্ঞান ফেরেনি।
দুদিন পর ঐ বাসা থেকে আমাকে ফোন করল আমার কনিষ্ঠ ছাত্রী রেনু। রেনু বলল, আপনার একটা চিঠি আছে। বাবুর ড্রয়ারে পাওয়া গেছে। আপনার নামে লেখা দশ পৃষ্ঠার চিঠি।
চিঠিটা পড়েছিলাম। বাবু লিখেছিল, স্যার আপনি বলেছিলেন আত্মহত্যা করতে হলেও আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে। আপনাকে জিজ্ঞাসা করার জন্যে জেহাদ অফিসে গিয়েছিলাম। চার ঘণ্টা বসেছিলাম। শুনলাম আপনি নাকি বাড়ি চলে গিয়েছেন। তাই অনুমতি নেয়া হয়নি।
বাবু লিখেছে–এ চিঠি লেখার আমার প্রয়োজন ছিল। নইলে সকলে ভাববে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য তরুণের মতো আমি প্রেমের জন্যে আত্মহত্যা করেছি।
এরপর অনেক কথা লেখা ছিল। সে কথা পারিবারিক এবং সামাজিক। বাবু একটা ভেঙে যাওয়া সংসারের শিকার। সেই ভাঙা সংসারের কাহিনী সে দশ পৃষ্ঠায় লিখেছে। সে লেখা বড়ো করুণ, বেদনার্ত। আজকের সমাজ জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ঐ চিঠি আমি বারবার পড়েছিলাম। ফেরত দিয়েছি ঐ পরিবারকে। কারণ ঐ চিঠি রাখা বড় জ্বালা।
এ সমাজে আমি বইয়ের মানুষ। শৈশবে আমি সকল আত্মীয়-স্বজন ছেড়েছি। কারো সঙ্গে গ সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। বই পুস্তকে ভালো ভালো কথা পড়েছি। আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এ জীবন বড় কঠিন। পুস্তকের উপদেশে জীবন চলে না। জীবন অনেক বাস্তব এবং কঠিন। তাই আমার কাছে যারা এসেছে তাদের বলেছি ব্যক্তি বা বাস্তব জীবনে আমাকে অনুসরণ করতে যেও না। এ সমাজ বড় নিষ্ঠুর এবং নির্দয় । তোমার কাছ থেকে ভালো ব্যবহার আশা করবে। তোমাকে ভালো থাকতে বলবে। কিন্তু তোমাকে বিশ্বাস প্রবে না। নিজেও কোনোদিন সে জীবন যাপন করবে না। এ সমাজের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলেই আট ঘাট বেঁধে নামতে হবে। শিশুর কোমলতা নিয়ে এ সামজের বিরুদ্ধে লড়াই করা যাবে না। এ সমাজ কপটতায় ভরা। সংসারে থেকে সংসারের নিত্যদিনের দুঃখ দৈন্য স্নেহ ভালোবাসার সঙ্গে সমঝোতা করে এ সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা যায় না।
নিশ্চয় সে বয়সে বাবুর এ কথা বুঝবার কথা ছিল না। আর আজ থেকে তেত্রিশ বছর আগে আমিও তেমন আবেগমুক্ত ছিলাম না। তাই আমার কাছে পড়তে এসে অনেকেই সামাজিক সঙ্কটের শিকার হয়েছে।
এর মধ্যে আরেকটি ঘটনা ঘটে গেল। একদিন জেহাদ অফিসে এসে দেখি সম্পাদকসহ দশ বারো জনের চাকরি গেছে। আমি ভাবলাম আমার চাকরিও চলে গেছে। তাই জেহাদ থেকে বেরিয়ে পড়লাম। কিছু দূর যেতেই জেহাদ অফিস থেকে পিয়ন এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল। আমাকে বলা হলো-আপনার চাকরি যায়নি। আমি বললাম–আমি চাকরি করব না। এতো লোকের চাকরি কেন গেল জানতে চাই। আমি প্রেস ক্লাবে কেজি মুস্তাফাকে ফোন করলাম। তিনি বললেন, আপনাকে ঐ কাগজে থাকতে হবে–এটা ইউনিয়নের আদেশ।
