এ সময় আমরা নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। দলের সঙ্গে প্রকাশ্যে কাজ না করে শ্রমিক সংগঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বরিশালের আব্দুল মান্নান তখন বিজি প্রেসে কাজ করতেন। দলের প্রবীণ নেতা কমরেড নেপাল নাহা কুমিল্লায় শিক্ষকতা করতেন। দলের অন্যতম নেতা মিসির আহম্মদ চট্টগ্রামে শিক্ষকতা করতেন। সিদ্ধান্ত হলো নেপাল নাহা ও মিসির আহম্মদকে ঢাকায় আনা হবে। আমি ছাত্র রাজনীতি ছেড়ে দেব।
এ সময় একটি প্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। আমি জেলে যাবার আগে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিলাম। ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসেবে গ্রেফতার হয়েছিলাম। জহুরুল ইসলাম, আহম্মদ হুমায়ুন, আব্দুল হালিম, আজিজুর রহমান খানসহ অনেকেই তখন ছাত্রলীগ থেকে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিলেন। আমি পূর্বে উল্লেখ করেছিলাম আমার ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেয়া ছাত্রদের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও কমিউনিস্ট পার্টি ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। আমরা জেলে যাবার পর মোহাম্মদ ফরহাদ ও আনোয়ার জাহিদ ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে আসেন। জেলখানা থেকে আসার পর একদিন শুনলাম পুরান ঢাকার স্বামীবাগে ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলন হচ্ছে। অথচ আমাদের কাউকে কোনো খবর দেয়া হয়নি। সম্মেলনে সেন্ট্রাল উইম্যান্স কলেজের একজন ছাত্রী আমাদের অনুপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছিলেন। বলেছিলেন, সামরিক শাসন জারি হওয়ার পূর্বে সম্মেলনে গঠিত কমিটির সভাপতি ছিলেন ডা. আলমগীর। সম্পাদক ছিলেন সাদউদ্দীন আহম্মদ, দফতরবিহীন সম্পাদক ছিলেন আহম্মদ হুমায়ুন, আর সদস্যদের মধ্যে ছিলেন নির্মল সেন, জহুরুল ইসলাম প্রমুখ। কিন্তু এ সম্মেলনে তাঁদের দেখছি না কেন?
এ প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন ফরহাদ। ফরহাদ সাহেব বলেছিলেন এ ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে অতীতের ছাত্র ইউনিয়নের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা নতুন করে সংগঠন করছি। আজকের ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধুরা নিশ্চয়ই এ খবর রাখেন না। আর ফরহাদ সাহেবের কথা মেনে নিতে হলে ধরে নিতে হয় যে এখনকার ছাত্র ইউনিয়নের ১৯৬২ সালে জন্ম হয়েছিল।
তবুও আমাকে নিয়ে ছাত্র ইউনিয়নে ভয় গেল না। ১৯৬৩ সালে ডাকসু নির্বাচন। তখন ডাকসুতে সরাসরি নির্বাচন ছিল না। সেবার জগন্নাথ হল থেকে ডাকসুর ভিপি হবার কথা। আমি জগন্নাথ হলের ছাত্র। কমিউনিস্ট পার্টির ধারণা হলো, আমি প্রার্থী হলে আমাকে ঠেকানো মুশকিল হবে। হঠাৎ একদিন মহিউদ্দিন সাহেব আমার সঙ্গে কথা বলতে আসলেন। তাঁর অনুরোধ হলো আমি যেন ভিপি পদে না দাঁড়াই। আমি হেসে ফেললাম। তাকে বললাম আমার দলের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আমি আর ছাত্র আন্দোলনে থাকছি না। সুতরাং আপনাদের ভয় নেই।
মহিউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে কথা বলে মধুর ক্যান্টিনে আসতেই শাহ মোয়াজ্জেম ও শেখ ফজলুল হক মণির সঙ্গে দেখা। তারা বলল, আপনি ভিপি পদে দাঁড়াতে পারবেন না। আপনি ভিপি পদে দাঁড়ালে আমাদের অসুবিধা হবে। আপনার বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেয়া যাবে না। কারণ আপনি ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। মনি বলল, এমনিতেই গতরাতে এসএম হলে আপনার বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা বক্তৃতা দিয়েছি। বলেছি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় অফিসের ড্রয়ারে আরএসপির প্রচারপত্র পাওয়ার অভিযোগে নির্মল সেনকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মনির কথায় আমার বলার কিছু ছিল না। কারণ আমি যখন ছাত্রলীগে ছিলাম তখন মনি ছাত্রলীগের সদস্য ছিল কিনা সন্দেহ। তবে শাহ মোয়াজ্জেমের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদে তাকে নির্বাচিত করার জন্যে আমি একদিনের জন্যে ঢাকা কলেজের ছাত্র সেজেছিলাম। আমি ওদের বললাম, আমি কোনো নির্বাচনেই দাঁড়াচ্ছি না। তবুও ছাত্রলীগ জিততে পারেনি। ডাকসুর ভিপি হয়েছিল ছাত্র ইউনিয়নের শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ।
ইতিমধ্যে আমার একটা চাকরির সংস্থান হয়েছে। চাকরির ব্যবস্থা জাম্মেল দা। তখন সরকারের সমর্থনে নতুন একটি পত্রিকা বেরোচ্ছিল। পত্রিকার নাম জেহাদ। আমি তখন আজিমপুরে থাকি। একদিন। ভোরবেলা মোজাম্মেল দা এসে হাজির। বললেন, আমার সঙ্গে চলো। তোমার চাকরি হয়েছে দৈনিক জেহাদে। সর্বকনিষ্ঠ সহ-সম্পাদক। আমি ইত্তেফাঁকের সহকারি সম্পাদক ছিলাম। জেহাদের সহ-সম্পাদক হবার আমার কোনো ইচ্ছা ছিল না। আমি মোজাম্মেল দাকে বললাম, আমি সরকারি কোনো কাগজে চাকরি করব না। মোজাম্মেল দা বললেন, তোমাকে একটু প্রাকটিক্যাল হতে হবে। পাকিস্তানে তোমার জন্মগত একটা বাধা আছে। তুমি নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি যে জেলখানা থেকে এসে সবাই ইত্তেফাঁকে চাকরি পেয়েছে, কিন্তু তুমি পাওনি। এ অপ্রিয় সত্যটি তোমাকে বুঝতে হবে। আমি বললাম, আমি সংবাদে শহীদুল্লাহ কায়সারের কাছে যাচ্ছি। শেষ চেষ্টা করে দেখব ইত্তেফাঁকে চাকরি হয় কিনা। এই বলে আমি মোজাম্মেল দাকে বিদায় করে দিয়ে সংবাদ অফিসে গেলাম। শহীদুল্লাহ কায়সার ফোনে মানিক মিয়ার সঙ্গে কথা বললেন। অনুনয়, বিনয় করলেন। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। শহীদুল্লাহ কায়সার বললেন, আপনাকে সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। পত্রিকার কে মালিক তা নিয়ে প্রশ্ন করে লাভ নেই। আমরা রাজনীতি করি, সংবাদপত্র আমাদের আশ্রয়। কোন পত্রিকায় চাকরি করি তা আদৌ মুখ্য নয়। আপনি জেহাদে যোগ দিন। জেহাদের সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। সহকারি সম্পাদক আবদুল গাফফার চৌধুরী। জেলখানা থেকে আসার পর আবার নতুন করে সাংবাদিকতার জীবন শুরু হলো।
