এদিকে বাংলাদেশের কূটনীতিকদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। প্রায় দুই সপ্তাহ যাবৎ রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির নিউইয়র্কে রয়েছেন। তিনি সেখানে টাইম, নিউজ উইক ও নিউইয়র্ক টাইমসের সাথে একাধিক বৈঠক করেছেন, তাদেরকে বোঝাবার চেষ্টা করছেন যে তসলিমার ব্যাপারে সরকার কড়া কোনও মনোভাব গ্রহণ করেনি। এতে কাজ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। নিউইয়র্ক টাইমস কয়েকদিনের মধ্যে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে সরকারের মনোভাব জানিয়ে কূটনীতিকরা দীর্ঘ একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। টাইম ম্যাগাজিন তাদের ঢাকা সংবাদ দাতাকে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠানোর জন্য বার্তা পাঠিয়েছে। সেখানেও চিঠি পাঠিয়ে বলা হয়েছে, তসলিমা সম্পর্কে সরকার কি অবস্থান নিয়েছে। নিউজ উইক বলেছে, তোমাদের লোকই রিপোর্ট পাঠিয়েছে। আমাদের কি করার ছিল! তসলিমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩শ জন প্রখ্যাত কবি, সাহিত্যিক এক বিবৃতি দিয়েছেন। বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার মৌলবাদীদের স্বার্থ রক্ষা করছে। মানবাধিকারকে হত্যা করছে। কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। ওয়াশিংটন ও নিউইয়র্ক দূতাবাসে প্রতিদিন শত শত চিঠি আসছে নিন্দা আর নানা হুমকি দিয়ে। একজন কূটনীতিক বললেন, আমরা কি এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকব! দেশের জন্য আর কিছু করা যাচ্ছে না।
সর্বশেষ খবরঃ যুক্তরাষ্ট্র সরকার মনে করে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার মৌলবাদীদের বিকল্প শক্তি হিসেবে কাজ করছে। স্মরণ করা যায় যে ক্লিনটন প্রশাসন মৌলবাদী কোনওরূপ তৎপরতাকে প্রশ্রয় দিতে রাজি নয়।’
এই হল বাংলাবাজারের খবর।
বিদেশে আমার নামটি যদিও বারবার করে নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু দেশে মৌলবাদী ছাড়া আমার নাম মুখে আনছে না কেউই। মুখে না এনে তারা মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছেন। তাও ভাল। ভাল যে লড়ছেন। ব্যাপারটি আমার ব্যক্তিগত ঝামেলা বলে কেউ তো মাঠেই নামতে চাচ্ছিলেন না আগে। আওয়ামী লীগের সভায় জিল্লুর রহমান বলেছেন, ‘সরকারি ছত্রছায়ায় মৌলবাদী শক্তি মাঠে নেমেছে।’ ভাল যে বলেছেন কিছু। সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্রসমাজের সমাবেশ হয়ে গেল প্রেসক্লাবের সামনে। বক্তারা বলেছেন, স্বাধীনতা বিরোধী জামায়ত শিবির মৌলবাদী ফতোয়াবাজচক্র দেশব্যাপী অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। এ অপশক্তিকে এখনই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করার চূড়ান্ত সময়। টিএসসিতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মত- বিনিময় সভা হয়েছে। সভায় অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক এমপি, কাজী আরেফ আহমদ, নূরুল ইসলাম নাহিদ, পান্না কায়সার, মঈনুদ্দিন খান বাদল, অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম, শাহেদ আলী, সুধাংসু চক্রবর্তী সবারই প্রায় একই বক্তব্য, ‘একাত্তরের ঘাতকরা আমাদের চ্যালেঞ্জ করছে। এখনই আমাদের উপলব্ধির সময়। ওদের বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়াতে না পারলে আমাদের অস্তিত্ব থাকবে না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রক্ষার জন্য প্রয়োজনে আমরা প্রাণ দেব। রাজনীতির ঐক্য ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই পারে আমাদের একত্রিত করতে। যার মাধ্যমেই কেবল একাত্তরের ঘাতকদের প্রতিহত করা সম্ভব।’ মতবিনিময় অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সর্বসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া ও মৌলবাদী একাত্তরের ঘাতকদের প্রতিহত করার লক্ষ্যে ১৪টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে আছে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে জনমত গঠনের লক্ষে স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের স্বাক্ষর গ্রহণ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন বক্তব্য না দেওয়া এবং ঘাতক দালালদের প্রতিহত করতে দলমত নির্বিশেষে সকলের ঐক্যের প্রতি আহবান ইত্যাদি।
বাকি খবরগুলোর শিরোনাম, হেলথ কোয়ালিশন পোড়ানোর সঙ্গে জড়িত জামাত কর্মীদের পুলিশ গ্রেফতার করছে না। মানবতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হন–ছাত্রলীগ। মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে নরসিংদীতে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল। মৌলবাদী গোষ্ঠী ধর্ম নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করছে তা শুভ নয় — কাদের সিদ্দিকী। এ বাংলায় মৌলবাদের স্থান নেই — কুষ্টিয়া সাম্প্রদায়িক শক্তি প্রতিরোধ কমিটি। ৩০ জুনের হরতালে ছাত্র জনতার ওপর জুলুম নির্যাতনের প্রতিবাদে সমাবেশ মিছিল।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৩১
চার জুলাই, সোমবার
আজ ইনকিলাবের পাতা ভরে লেখা, ৩০ জুনের ঐতিহাসিক গণরায় ব্লাসফেমি আইনের বিকল্প নেই। কেন বিকল্প নেই, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে মাসুদ নিজামী লিখেছেন—
জ্ঞতসলিমা নাসরিন শেষ পর্যন্ত জানালেন যে, তিনি একজন নাস্তিক অর্থাৎ তিনি সৃষ্টিকর্তা বা ধর্মে বিশ্বাস করেন না। ডঃ আহমদ শরীফও নিজেকে নাস্তিক হিসাবে পরিচয় দিয়েছিলেন। একজন লোক আস্তিক নাকি নাস্তিক কিংবা আস্তিক হলেও কোন ধর্মাবলম্বী তা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। কথা হচ্ছে পারস্পরিক সহাবস্থানের প্রশ্ন। প্রত্যেকে নিজ মতের সপক্ষে প্রচার করবেন, কথা বলবেন এবং লিখবেন। কিন্তু অন্যকে খোঁচা দিবেন না এবং কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে পারবেন না। কারণ ধর্ম পালন মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। কারো এই অধিকারের ওপর অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। সকল মতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই কেবল অবাধে নিজের মত প্রকাশের অধিকার ভোগ করা যাবে। এটিই গণতন্ত্রের রীতি এবং মানবাধিকারের বিশ্বজনীন স্বীকৃত নীতি। কিন্তু য়েচ্ছ!য় নাস্তিক ঘোষণাকারী ডঃ আহমদ শরীফ এবং তসলিমা নাসরিন ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু করেন। তারা বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে এবং এ ধর্মের মহাপুরুষদের সম্পর্কে প্রকাশ্যে অনেক আপত্তিকর কথাবার্তা বলেন। ফলে স্বাভাবিক নিয়মে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের পক্ষ হতে প্রতিবাদ উচ্চারিত হল। ডঃ আহমদ শরীফ মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দানের জন্য দুঃখ প্রকাশ না করলেও তিনি আর বেশিদূর না গিয়ে থেমে যান। কিন্তু থামেননি তসলিমা। কথিত নারী অধিকার আন্দোলনের ত্রাণকষর্নী সেজে ধর্ম ও ইসলাম সংক্রান্ত অজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত বিদ্বেষ মিলিয়ে বারবার তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করতে থাকেন। শুধু তাই নয়, তিনি নারীদেরকে উμছৃঙ্খল হবার উস্কানি দিলেন। পবিত্র কোরান মানুষের লেখা এবং আধুনিক সভ্য সমাজে এই অবৈজ্ঞানিক গ্র−ন্থর কোনও প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন। এসব কারণে তসলিমাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের জন্য আলেম সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সরকারের নিকট দাবি জানাতে থাকেন। লক্ষণীয় এই যে, তসলিমার কার্যকলাপের যতই প্রতিবাদ হয় ততই তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তিনি বাংলাদেশের মানচিত্র মুছে ফেলে ভারতের সাথে বাংলাদেশকে একীভূত করার সংকল্পও একাধিকবার ব্যক্ত করেন। রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও ধর্মদ্রোহিতার জন্য তসলিমাকে গ্রেফতার করে শাস্তি দানের জোর দাবি উঠলে ঘাদানিক লাইনে অবস্থানকারীরা তসলিমার পক্ষ অবলম্বন করে বিবৃতি বক্তৃতা দেয়া শুরু করলেন। অতীতে দালালির অভিযোগে অভিযুক্ত কিছু ব্যক্তিও তসলিমাকে সমর্থন দিয়ে প্রগতিশীলতার পরিচয় দানের জন্য উঠে পড়ে লেগে গেলেন। ইতোমধ্যে দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বিদেশি কতিপয় এনজিওর সমর্থনপুষ্ট সংবাদপত্রও তসলিমার পক্ষ অবলম্বন করল। তসলিমা সমর্থক এসব গোষ্ঠী ধর্মদ্রোহিতার বিচার ও ব্লাসফেমী আইন প্রণয়নের দাবিতে আন্দোলনকারী পক্ষকে ফতোয়াবাজ, ধর্ম ব্যবসায়ী ও রাজাকার আখ্যায়িত করে নিজেরা কোরানের পক্ষ শক্তি হিসাবে প্রকৃত ইসলামের খাদেম হবার চেষ্টায় মেতে উঠলেন। কিন্তু ঠেলায় ধাককায় পড়ে কোরানের পক্ষ শক্তি হিসাবে ইসলামের লেবাস গায়ে দেবার চেষ্টা করলেও এই ভণ্ড বকধার্মিকদের কথা জনগণ গ্রহণ করেনি। জনগণ শত অপপ্রচার সত্ত্বেও আলেম ও ধর্মপ্রাণ মুসলিমগণ কর্তৃক ধর্মদ্রোহিতার বিচার ও ব্লাসফেমী আইন প্রণয়নের দাবিতে ঘোষিত ৩০ জুনের হরতাল পালন করেন। সারাদেশে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল এমনভাবে পালিত হল, যা এ দেশে কোনওদিন হয়নি।
