বিরোধীরা প্রথম হরতাল প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়ে সুবিধা করতে না পেরে পরবর্তীতে একই দিনে পাল্টা হরতালের ঘোষণা দেন। কিন্তু হরতালের দিন তোপখানা সড়কে পুলিশের পাহারায় কয়েকজন ঘাদানিপন্থী ছাড়া আর কোথাও তাদের অস্তিত্বের সন্ধান মিলেনি। নজিরবিহীন এই হরতালে প্রমাণিত হল, এ দেশে ধর্ম নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলবে না। ধর্মদ্রোহী এবং তাদের মদদদাতা ও দোসরদের স্থান এ দেশে নেই। দীর্ঘ ১২ ঘন্টা ব্যাপী গোটা বাংলাদেশের জনতার ময়দানে প্রতিফলিত ও প্রতিবিম্বিত হল ঐতিহাসিক গণরায় — মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া চলবে না। ধর্মদ্রোহিতার বিচার করতে হবে এবং ধর্মদ্রোহিতা বন্ধের লক্ষে ব্লাসফেমী আইন প্রবর্তন করতে হবে। হরতাল চলাকালে কিশোরগঞ্জে পুলিশের গুলিতে স্কুলছাত্র আরমান শহীদ হয়। সিলেট অঞ্চলের প্রখ্যাত পীর হযরত মাওলানা আবদুল লতিফ শাহ চৌধুরীর পুত্র ও নাতিসহ কয়েকজনকে পুলিশ বিতর্কিত এনজিওর নালিশের ভিত্তিতে গ্রেফতার করে। অবশ্য এদের পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মামলা তুলে নেওয়া হয়নি। হরতালের দিনই ব্রাহ্মণ্যবাদী ও ইহুদি মিডিয়া হিসাবে সমালোচিত বিবিসি সিগারেট সেবনরত তসলিমাকে দিয়ে কোরানের পাতা উল্টিয়ে আবোল তাবোল বকার দৃশ্য প্রচার করে। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে এ দৃশ্য সম্প্রচারিত হয় এবং তাও হরতালের দিনে। মুসলমানদের দগ্ধ অনুভূতিতে নুনের ছিটা দেওয়ার জন্যই যে বিবিসি তসলিমার এ সাক্ষাৎকার প্রচার করে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ইতোমধ্যে জার্মানির ডাস স্পিগেল ম্যাগাজিন ২৭ জুন তারিখে তসলিমার একটি ধর্মদ্রোহিতামূলক সাক্ষাৎকার ছাপায়। অষ্ট্রেলিয়ার দি এজ ম্যাগাজিনেও তার সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। যতদূর জানা যায় তসলিমা এখন ঢাকাস্থ একটি পশ্চিমা দেশের রাষ্ট্রদূত মহাশয়ের হেফাজতে আছেন, যা আইন অনুযায়ী তারা পারেন না। ইতোমধ্যে নরওয়ে ও সুইডেনের পক্ষ হতেও তসলিমার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ভারতের আনন্দবাজার স্টেটসম্যান পত্রিকা এবং সে দেশের কতিপয় পণ্ডিত আগের মত এখন আর তসলিমাকে নিয়ে মাতামাতি করেন না। পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের মুসলমানরাও তসলিমার কার্যকলাপে ক্ষুব্ধ। এই মুসলমানের ভোট হারানোর ভয়ে সে দেশে আপাতত তসলিমাকে নিয়ে নাচানাচি স্থগিত রয়েছে। যদিও সুযোগ পেলে আবার তালি বাজাতে ভুল হবে না।
বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে খেলার পরিণাম পশ্চিমারা চিন্তা করে না বলেই সে দেশের পত্রিকা লন্ডন টাইমস বাংলাদেশে ধর্মদ্রোহিতার শাস্তি আইন পাস করাতে চাওয়ার জন্য তাদের ভাষায় মৌলবাদীদের সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু তাদের যে লোকেরা এখানে আছে, তারা জানে, এহেন স্ববিরোধিতার লুকোচুরি খেলা দ্বারা এদেশবাসীকে বোকা বানানো যাবে না। বাংলাদেশের ক্রিশ্চিয়ান পীস কনফারেন্স বলেছে, পশ্চিমা মিডিয়াগুলো দরিদ্র দেশগুলোর মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দান করে আসছে। ইসলামের বিরুদ্ধে এভাবে আঘাত হানা হলে প্রতিক্রিয়া স্বরূপ খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ইত্যাদি ধর্মের ক্ষেষেনও এমনটি হবার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশে ধর্মদ্রোহিতার বিচারের জন্য ব্লাসফেমী ধরনের আইন হলে লন্ডনের টাইমস পত্রিকার কি ক্ষতি হবে যে তারা এর বিরোধিতা করছে! ওদের দেশেই তো ধর্মকে রক্ষার জন্য ব্লাসফেমী আইন রয়েছে। আসল কথা হচ্ছে, পশ্চিমারা নিজেদের দেশে সেকুলার হলেও মুসলমানদের বেলায় ভীষণ সাম্প্রদায়িক। লন্ডন টাইমস সহ কতিপয় পশ্চিমা দেশের আচরণে তাই প্রমাণিত হচ্ছে। ইউরোপের বলকান অঞ্চলের মুসলিম রাষ্ট্র বসনিয়া, আমেরিকার ধর্মীয় নেতা শেখ ওমর আবদুর রহমান, ইসলামি রাষ্ট্র ইরান, আলজেরিয়ার পুনর্জাগরণ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র লিবিয়াকে নিয়ে বিশ্ব খ্রিস্টান ইহুদি চক্র যে খেলা খেলছে, তা সবার জানা। পৃথিবীর সর্বত্র মুসলিম জাগরণকে খ্রিস্টান ইহুদি চক্র মৌলবাদ আখ্যায়িত করে সন্ত্রাসবাদের তালিকাভুক্ত করে ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। বাংলাদেশের ইসলামি জাগরণও পাশ্চাত্য ও প্রতিবেশী ব্রাহ্মণ্যবাদী গোষ্ঠীকে দুঃশ্চিন্তায় ফেলেছে। এ জন্য তারা এ দেশের ইসলামী লাইনের লোকদেরকে মৌলবাদী আখ্যায়িত করে তাদের জনসমক্ষে নিন্দিত ও ধিকৃত হিসাবে চিহ্নিত করতে চায়। পক্ষান্তরে ইসলামের শত্রুতায় কাউকে লিপ্ত হতে দেখলে তাকে নানাভাবে উৎসাহিত করে, যা তাদের এ দেশীয় সেবাদাস এবং দোসররাও করে থাকে। বাংলাদেশ মূলত আন্তর্জাতিক ও ভূমণ্ডলীয় ষড়যন্ত্রের কারণে এ পরিস্থিতির শিকারে পরিণত হয়েছে। এটা এদেশ বাসী বোঝেন বলেই ষড়যন্ত্রকারীরা সমস্যায় পড়েছে। কারণ তাঁরা বোঝেন যে, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের সেবাদাসরা চান্স পেলেই দেশ ও জাতির স্বার্থ বিরুদ্ধ লাইনে অবস্থান নেয়। ভারত কর্তৃক ফারাককা সহ ৫৪টি বাঁধ নির্মাণ, তালপট্টি ও মুহুরির চর দখলসহ অনবরত বাংলাদেশের সর্বনাশ করলেও যেসব মহল ভারতের নিন্দা করে না, যারা পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তি সৃষ্টিকারী খুনী শান্তিবাহিনীর পক্ষ নিয়ে কথা বলে, যারা সব সময় দেশের কৃষ্টি ঐতিহ্যের বিরোধী পক্ষে দাঁড়িয়ে বিবৃতি দেয়, সেসব মুখচেনা মহলগুলোই তসলিমার পক্ষে তাদের বিদেশী প্রভুদের সেবা করতে শুরু করল। যে তসলিমা পবিত্র কোরানকে অবৈজ্ঞানিক আখ্যায়িত করে আধুনিক সভ্য সমাজে এরপ্রয়োজন নেই বলে ঘোষণা করলেন, তার পক্ষে দাঁড়িয়ে এসব লোক যখন নিজেদের কোরানের পক্ষ শক্তি হিসাবে জাহির করার চেষ্টা করেন তখন কি সচেতন দেশবাসীর চিনতে কষ্ট হয় এরা কারা এবং কি চায়? আশার কথা জনগণের এ উপলব্ধিই এ দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং ধর্ম ও কৃষ্টি কালচারের রক্ষাকবচ। ৩০ জুন তারিখে সূচিত ঐতিহাসিক গণরায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন সরকারের ওপর বর্তিয়েছে। ধর্মদ্রোহিতার বিচার দেশকে অশান্তির বিস্তার থেকে রক্ষার স্বার্থেই করা প্রয়োজন। ব্লাসফেমী আইন হলে তা সকল ধর্মের জন্যই রক্ষাকবচ হতে পারে। সকল ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থানের জন্য এ আইন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
