ঞর সঙ্গে আগে আমার পরিচয় হয়নি কোনওদিন। ঞর মত শিল্পীকে দূর থেকে দেখতে পেয়েই ধন্য হয়েছি আগে। কাছে গিয়ে আলাপ করব, এমন সাহস কখনও হয়নি। আমি এখন ঞর বাড়িতে। তিনি আমাকে একটি ঘর দিয়েছেন থাকতে। ঘরটি ছোট, কিন্তু সুন্দর। ঘরের জিনিসপত্র পরিপাটি, গোছানো। কাঠের খাটে বিছানা পাতা। খাটের পাশে টেবিল। টেবিলের পাশে চেয়ার। মাথার ওপর পাখা। আমি পাখা ছেড়ে দিয়ে শুয়ে থাকি বিছানায়। আশ্চর্য, একটুও ভয় লাগছে না আমার। এ বাড়িটিতে আমি নিরাপদ বোধ করছি। আসলে এ বাড়িতে আমাকে কেউ মেরে ফেললেও দুঃখ হবে না আমার। কত বড় হৃদয় থাকলে এ সময় আমাকে কেউ আশ্রয় দিতে পারে আমি ভাবতে চেষ্টা করি। শিল্পী সাহিত্যিকরা যখন আমাকে অস্বীকার করছেন, হাতে গোনা কজন মাত্র আমার পক্ষে ভয়ে ভয়ে হঠাৎ হঠাৎ মুখ খুলছেন, তখন এমন একজন শিল্পী জীবনের কত বড় ঝুঁকি নিয়ে যে আমাকে তাঁর নিজের বাড়িতে রাখার সাহস দেখালেন, তা অনুমান করা শক্ত হলেও চেষ্টা করি অনুমান করতে। আমার প্রতি ঞর সহমর্মিতা আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়, আমার মৃত্যুভয় কমিয়ে দেয়।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৩০
তিন জুলাই, রবিবার
এ ঘরের দরজাটিতে ঝর বাড়ির দরজার মত বাইরে থেকে তালা লাগাতে হয় না। ঘরের বাইরে যদিও আমার বেরোতে মানা, ঘরটি ভেতর থেকে বন্ধ করে বসে থাকলেই হয়। বাড়ির কাজের মানুষেরা নিচতলায় রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকে। ওপর তলায় শোবার ঘর। ওপরতলায় ঞ আর ঞর স্ত্রী সারাক্ষণই আছেন, তাঁদের নাকের ডগায় কোনও কাজের মানুষ এ ঘরে উঁকি দিয়ে কোনও নিষিদ্ধ মুখ দেখবে, সে আশঙ্কা নেই। সকালে ট্রেতে করে নাস্তা নিয়ে এলেন ঞর স্ত্রী। দুপুরেও তিনি খাবার এনে দিলেন, রাতেও। ভাল খাবার। ভাত, মাছ, শাক সবজি। চেটেপুটে খাই। জন্মের ক্ষিধে ছিল পেটে। ঞ আর ঞর স্ত্রী অনেকক্ষণ ধরে গল্প করে গেছেন আমার সঙ্গে। দেশের অবস্থার কথা বলে দুজনই খুব দুঃখ করেছেন। ঞ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফেলে বলেছেন, ‘দেশে যে মৌলবাদীরা এমন শক্তি অর্জন করেছে তলে তলে, কোনওদিন বুঝিনি।’ বলেছেন আমার জন্য তাঁর খুব ভাবনা হয়। প্রগতিশীল সকলের জন্যই এখন ভাবনা হয়। মৌলবাদ যদি ঠেকানো না যায় তবে সকলের সর্বনাশ হবে, দেশটি মৌলবাদীদের পুরো দখলে চলে যাবে। এ দেশটি তখন আর মুক্তবুদ্ধির কোনও মানুষের বাসযোগ্য দেশ হবে না।
বাসযোগ্য যে হবে না সে বুঝি। পত্রিকায় পাতায় বিশাল বিশাল মিছিলের ছবি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের পত্রিকাগৃুলো যদিও মৌলবাদীদের বিশাল সভা মিছিলের কোনও খবর ছাপছে না, ভাব করছে যেন আন্দোলনে মৌলবাদবিরোধী শক্তিরই জয় হচ্ছে। কিন্তু মৌলবাদীদের পত্রিকা দেখলেই আঁতকে উঠতে হয়। ভয়াবহ সব কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলছে তারা। কেবল খবর না ছাপলেই তো মৌলবাদ মরে যায় না। আছে। তারাই এখন রাজত্ব করছে সর্বত্র। আজকের পত্রিকায় ছাপা হয়েছে গতকাল লণ্ডন টাইমসে ছাপা হওয়া সম্পাদকীয়। সম্পাদকীয়টির শিরোনাম আবার বাংলাদেশ। বাংলাদেশে শস্য উৎপাদন বাড়ছে। খাদ্যাভাব নেই দেশটিতে। কিন্তু এই যে উন্নতি ঘটছে দেশে, তা এখন হুমকির সম্মুখীন। উগ্র মৌলবাদীদের সহিংস আন্দোলন এ দেশ বিপদ নিয়ে আসছে। অসাবধানতায় একটি অগ্নিকাণ্ড শুরু হতে পারে দেশে। বাংলাদেশ সরকারের দুর্বলতার কারণে ইসলামী উগ্রবাদীদের আন্দোলনের মুখে এ রকম একটি ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকার নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারের হুলিয়া জারি করে এবং দুজন সাংবাদিককে হাজতে পুরে এই দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরে দেশে পরস্পর বিরোধী হরতাল দেখা দেয়। সরকার প্রথম ভুল করে তসলিমা নাসরিনের লজ্জা উপন্যাসটি নিষিদ্ধ করে। সরকার আরও ভুল করে তসলিমা নাসরিনের শরিয়ার সংস্কার চেয়ে ধর্মদ্রোহিতা করেছেন বলে মৌলবাদীদের দাবির প্রতি নতিস্বীকার করে। এর ফলে মৌলবাদীদের আন্দোলনে ইন্ধন যোগানো হয়েছে। মৌলবাদীরা এখন ধর্মদ্রোহিতার আইন পাস এবং পত্রিকার ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করার আন্দোলন করছে এবং সাহায্য সংস্থা নিষিদ্ধ করার দাবি জানাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংক এবং গ্রামীন অ্যাকশন কমিটি সারা বিশ্বে পথিকৃতের কাজ করছে। বেগম জিয়ার সরকারকে মৌলবাদীদের খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। খবরটি ওয়াশিংটন থেকে পাঠানো। খবরটি এরকম, ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। তাদের উদ্বেগ রাজনৈতিক সংকট নিয়ে। লেখিকা তসলিমা নাসরিনের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের শেষ নেই। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের বাংলাদেশ ডেস্কের প্রধান মিসেস রবিন রাফায়েল একজন শীর্ষ পর্যায়ের কূটনীতিককে ডেকে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, বাংলাদেশে এখন যা ঘটছে তা মোটেও সুখকর নয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার চুপ করে বসে থাকতে পারে না। আমাদের কাছে প্রতিদিনই খবর আসছে নানা সূত্র থেকে। এক অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে সেখানে। মৌলিক অধিকার খর্ব হচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে ব্যাপকভাবে। রাফায়েল বলেন, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত কোনও স্বার্থ নেই। দেশটা অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করে মানুষের জীবনমানের উন্নতি করুক এটাই যুক্তরাষ্ট্র চায়। অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচীর শুরুটা মন্দ ছিল না। যদিও বিনিয়োগ ছিল না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ঠিক মত চলবে — তাই আশা করা গিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিন্দুমাত্র সমঝোতা নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থানে বিস্তর ফারাক। এই অবস্থায় সংকট বাড়ছেই। রাফায়েল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও জোরদার করতে চেয়েছে। ২০ জন সংসদ সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। ..বর্তমান সঙ্কট নিরসনে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত বেশ তৎপর হয়েছিলেন। এখন তিনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। ৫ জুলাই থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত ছুটিতে চলে যাচ্ছেন। লেখিকা তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে রবিন রাফায়েল স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, তার লেখার স্বাধীনতা খর্ব করা যাবে না। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ওয়াশিংটন থেকে সেন্সরশিপ বাই ম্যানহান্ট শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রকাশের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বাংলাদেশের একজন কূটনীতিককে পররাষ্ট্র দফতরে ডেকে নিয়ে বলেন, দুনিয়ার প্রচারমাধ্যম কী লিখছে দেখতে পাচ্ছেন নিশ্চয়ই। সরকার কেন তসলিমার নিরাপত্তা দিচ্ছে না। বাংলাদেশের কূটনীতিক বলেন, সরকার নিরাপত্তা দিচ্ছে না এটা ঠিক নয়। বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে। তসলিমা আদালতে গেলেই পারেন। এরপর সরকার তার সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দেবে। তাকে বিদেশে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাসপোর্ট নিয়ে তিনি সম্প্রতি বিদেশ সফর করেও এসেছেন। সফরকালেই তিনি কলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা তসলিমার সাহায্যে বিশ্বের প্রতিটি দেশকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছে। তসলিমার মৃত্যুদণ্ডের খবর সম্পর্কে বলছে, সরকার যে ব্যবস্থা নিয়েছে তা কোনও সভ্যতার মধ্যে পড়ে না। কোনও সভ্য সরকার এটা করতে পারে না।
