হরতাল সম্পর্কে চিরকাল সরকার পক্ষ যেরকম বিবৃতি দিয়ে আসছে, সেরকমই এবারের বিবৃতি। জ্ঞবিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের আহবানে হরতাল পাল্টা হরতালে ঢাকায় বাস-গাড়ি চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। তবে সারা দেশে ট্রেন লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক ছিল।’ তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরী কম করে হলেও কিছু আহত নিহত সংখ্যা উল্লেখ করেন। সংঘর্ষ কোথায় কোথায় ঘটলো, ককটেল কোথায় কোথায় ফাটলো, তারও খানিকটা ফিরিস্তি আছে। তবে পুলিশ কেন কিশোরগঞ্জের একটি তরুণকে গুলি ছুঁড়ল সে সম্পর্কে বলেছেন, ‘কিশোরগঞ্জে একদল লোক ট্রেন আটক করলে পুলিশ গিয়ে ট্রেনটি উদ্ধার করে। এরপর মিছিলকারীরা পুলিশের ওপর হামলা করে এবং অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখন অস্ত্র ও আত্মরক্ষার জন্য পুলিশ গুলি ছোড়ে। এতে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়। এরমধ্যে আরমান নামের একজন নিহত হয়, তার পিতার নাম আনোয়ার হোসেন। আরেকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে, তার নাম আশরাফ।’ গতকাল শুক্রবার সকাল সন্ধ্যা হরতাল চলাকালে চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিরাজগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ সহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ, বোমাবাজি, হামলা, পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। হরতাল আহবানকারী পরস্পরবিরোধী দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে তিন শতাধিক লোকের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ….
মাওলানা নিজামী বলেছেন, এ হরতালে প্রমাণিত হল ইসলাম ও কোরান অবমাননাকারীদের স্থান এ দেশে নেই। যারা কোরান ও আলেম ওলামাদের সাথে বেয়াদবি করেছে, এ হরতালের পর তাদের তওবা করা উচিত। মাওলানা নিজামী আরও অনেক কথা বলেছেন, এত কথা আমার আর ভাল লাগে না পড়তে। আমার ভয় হয়। আমার দেশে আমার স্থান নেই, এ কথা আমার আর শুনতে ইচ্ছে করে না।
৩. অতলে অন্তরীণ – ২৯
দুই জুলাই, শনিবার
ইসলাম কায়েম না হওয়া পর্যন্ত এই গণজাগরণ থামবে না–বলেছেন শায়খুল হাদিস। গতকাল ৩০ জুনের হরতালে পুলিশের গুলিতে কিশোরগঞ্জের শহীদ আরমানের রুহের মাগফেরাত কামনা ও নাস্তিক মুরতাদ এনজিও এজেন্টদের সন্ত্রাসের প্রতিবাদে দোয়া ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। এনজিও তৎপরতা ও নাস্তিক মুরতাদ প্রতিরোধ আন্দোলনের আহবায়ক এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ অভিভাবক পরিষদের চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস বলেছেন, রক্তের বিনিময়ে হলেও এ দেশে ইসলাম চাই। আজ দালাল চিহ্নিত হয়ে গেছে। এ দালাল-আসামীরা ছুটে গেলে সরকারকেই আসামী চিহ্নিত করা হবে। ন্যায়ের অগ্রাভিযান দেখে বাতিলের গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। তাতে কোনও ভয় নেই। সত্য তুলে ধরার জন্য ইনকিলাব সম্পাদকের প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে। মুসলমানরা অসত্যের কাছে মাথা নত করতে জানে না।
আরমানকে নিজের দলের সদস্য দাবি করে অন্য কোনও দলই মিছিলে নামছে না। এমনিতে পুলিশের গুলিতে কেউ মারা গেলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কাড়াকাড়ি বাঁধে নিহতকে নিজের দলের লোক বলে দাবি করতে। এবার আওয়ামী লীগের কোনও দাবি নেই। সুতরাং এ ছেলে খুব স্বাভাবিকভাবেই শায়খুল হাদিসের দলের ছেলে।
এদিকে গতকাল সিলেটে মৌলবাদীরা পাটমন্ত্রীর গাড়ি ভাঙচুর করেছে। পাটমন্ত্রী হান্নান শাহ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি যখন সার্কিট হাউজ থেকে লাকাতুরা গলফ ক্লাবে যাচ্ছিলেন, তখন পৌর পয়েণ্টে নাস্তিক মুরতাদ প্রতিরোধ আন্দোলনের সভা থেকে ধর ধর মুক্তিযোদ্ধা ধর, চিৎকার করে মন্ত্রীর গাড়ি লক্ষ্য করে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। গাড়ি ভেঙে যায়। মন্ত্রীকে শেষ পর্যন্ত পুলিশেরা সার্কিট হাউজে ফেরত গেছেন। পুলিশ আর মৌলবাদীতে একটা সংঘর্ষ হয়ে যায়, ১৫ জন আহত হয় ইট পাটকেলের আক্রমণে। মৌলবাদীদের হামলায় বিএনপিকর্মীরা ক্ষুব্ধ হওয়ায় শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পর শহরে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে, এবং মোড়ে মোড়ে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জে আরমানের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে গতকাল। জানাজায় কুড়ি হাজারেরও বেশি লোক অংশ নেয়। কিশোরগঞ্জ শহরে এখনও উত্তেজনাকর থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে তাৎক্ষণিক ভাবে পুলিশ সুপার ছ জন পুলিশকে সাসপেণ্ড করেছেন। শহরে ১৪৪ ধারার মেয়াদ আরও ৪৮ ঘন্টা বাড়ানো হয়েছে। ভোরের কাগজের একটি ছোট্ট খবর সবকিছুর আড়ালে পড়ে আছে, খবরটির শিরোনাম তসলিমার ছোট বোনকে টেলিফোনে হুমকি। তসলিমা নাসরিনের পারিবারিক সূষেন জানা যায় গত দুদিন থেকে টেলিফোনে কে বা কারা তাদের হত্যার হুমকি দিচ্ছে। তসলিমার ছোট বোন ইয়াসমিন জানায়, গত কয়েকদিন ধরে টেলিফোনে তাকে রাস্তায় বেরোলে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
আজকের কাগজের খবর, ধর্মব্যবসায়ী শিবির সন্ত্রাসীদের হাতে ব্যাংক কর্মকর্তা লাঞ্ছিত। গালিব রেজা নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তা ইসলামি শিবিরের সশস্ত্র লোকদের হাত থেকে প্রাণে বাঁচলেও শরীরে আটটি শেলাই ও ভাঙা হাত নিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। গত বৃহস্পতিবার সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্র সমাজ আহুত হরতাল চলাকালে গালিব রেজা হেঁটে মতিঝিলে যাচ্ছিলেন। শিবিরের ক্যাডাররা তাকে নির্মূল কমিটির লোক ভেবে পেটাতে শুরু করে। আশেপাশে সহকর্মীরা শেষ পর্যন্ত গালিবকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করান। হরতালের দিন নিরীহ পথচারীদের তো আছেই, বিভিন্ন দৈনিকের সাংবাদিকদেরও মৌলবাদীরা লাঞ্ছিত করেছে।
