ঝ দুবার ঘরে এসেছেন খাবার নিয়ে, দুবারই দেখেছেন গায়ে চাদর মুড়ি দিয়ে হাতপা গুটিয়ে শুয়ে আছি। দুবারই আমাকে তুলতে চেষ্টা করেছেন খাওয়াতে। দুবারই আমি বলেছি খাবো না। সারাদিন ধরে ঝ তাঁর পরিচিতদের ফোন করে জেনেছেন হরতালের খবর। হরতাল হয়েছে সারাদেশে। কোনও গাড়িঘোড়া চলেনি, দোকানপাট খোলেনি। হরতালের প্রতিপক্ষ সারাদিনই রাস্তায় ছিল। দু দলের সঙ্ঘর্ষে আর পুলিশি আক্রমণে পাঁচশ লোক আহত হয়েছে। বেশ কিছু পুলিশও আহত। আহতরা হাসপাতালে। অনেককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কিশোরগঞ্জে পুলিশের গুলিতে আরমান নামের একটি চৌদ্দ বছর বয়সের ছেলে মারা গেছে, গুলি খেয়েছে অনেকে, ময়মনসিংহের হাসপাতালে ভর্তি তারা। একশ দশটি ইশকুল পুড়িয়ে দিয়েছে মৌলবাদীরা, হাসপাতাল পুড়িয়েছে। ঢাকায় প্রেসক্লাব এলাকা ছিল মৌলবাদবিরোধী ছাত্রজনতার দখলে। শহরের বাকি এলাকা ছিল মৌলবাদীদের দখলে।
মধ্যরাতে ঝ আমাকে প্রায় টেনে তুললেন। ভাত খেতে দিয়ে পাশে বসে সিগারেট ফোঁকেন আর ভয়াবহ এই হরতালের কাহিনী বর্ণনা করেন। এখানে সেখানে বোমা ফেটেছে অনেক। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়েছে, লাঠিচার্জ করেছে, গুলি ছুঁড়েছে, অনেকের গায়ে গুলি লেগেছে, সচিবালয়ের সামনে ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে। হাজার হাজার পুলিশ নেমেছে রাস্তায়। আশঙ্কা করা হয়েছিল প্রচুর লোক মারা যাবে সঙ্ঘর্ষে। কিন্তু তা হয়নি। হয়নি বলে ঝ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।
–হরতালে আসলে জয় কাদের হয়েছে? প্রশ্ন করি।
ঝ অনেকক্ষণ ভেবে বলেন, সত্যি কথা বলব?
–নিশ্চয়ই।
–যদিও এই সত্যটি শুনতে ভাল লাগবে না, তবু সত্য এই যে হরতালে জয় হয়েছে মৌলবাদীদের।
–কেন, মৌলবাদবিরোধীরাও তো হরতাল ডেকেছে?
–তোমাকে তো আগেই বলেছি একথা। ছাত্ররা তা পরে হরতাল ডেকেছে না পারতে। ওদের ঠেকাতে পারবে না বলে ডেকেছে। ওদের হরতাল সিম্পলি হাইজ্যাক করেছে ছাত্ররা। সারা দেশে হরতাল পিকেটার কারা ছিল রাস্তায়? মৌলবাদীরা। কারা বড় বড় সমাবেশ করেছে? মৌলবাদীরা। মিছিল করেছে শহরের সব রাস্তায় কারা? মৌলবাদীরা। অল্প কিছু জায়গায় মৌলবাদবিরোধীরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিয়েছে শুধু। প্রমাণ করতে চেয়েছে যে তাদের ডাকা হরতালে হরতাল হচ্ছে। কিন্তু জনগণ তো জানে কাদের ডাকা হরতাল এটি। একদিকে ভালই হয়েছে, বিপক্ষ দল যে প্রথম ঘোষণা দিয়েছিল যে হরতাল প্রতিরোধ করবে যে কোনও মূল্যে। আজকে তা করতে গেলে অনেককে মরতে হত।
ঘুমোতে যাবার আগে ঝ বলেন, তসলিমা পক্ষ সংগঠনটি থেকে কিছু ছেলে মেয়ে ব্যানার নিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে এসেছিল সমাবেশে। মৌলবাদ বিরোধী ছাত্রনেতারা তসলিমা পক্ষের ব্যানার, প্ল্যাকার্ড এসব কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলেছে, ছিঁড়ে ফেলেছে, বলে দিয়েছে আমরা এখানে তসলিমার পক্ষে সমাবেশ করছি না, মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনে নামা মানে তসলিমার পক্ষে নামা নয়।
৩. অতলে অন্তরীণ – ২৮
এক জুলাই, শুক্রবার
আজ শুক্রবার। ঝ আপিসে যাবেন না। ঝ আপিসে না গেলেই যে এ ঘরে এসে দীর্ঘক্ষণ কাটাতে পারেন, তা নয়। তবু ঝ বাড়িতে থাকলে আমার স্বস্তি হয়। স্বস্তি এই জন্য নয় যে দুবেলা খাবার জুটবে আমার। স্বস্তি এই জন্য যে বাড়িতে অচেনা আততায়ী ঢুকতে নিলে ঝ বাধা দেবেন। ঝর কাছে পিস্তল থাকে আত্মরক্ষার জন্য। ঝ আদৌ গুলি চালাতে পারবেন কি না, একদল সশস্ত্র লোক ঢুকে গেলে ঝর পক্ষে সম্ভব হবে কি না থামানো সে সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েও মনে হয় বাড়িটি এখন নিরাপদ। ঝর পিস্তল যদি কাজই না করে, অন্তত ঝ তো আগেভাগে বিপদের খবর পেয়ে আমাকে ওই খোপটিতে ঢুকিয়ে রাখতে পারবেন।
মৌলবাদীরা জয়ধ্বনি করছে সারা দেশে। জনগণকে তারা অভিনন্দন জানাচ্ছে হরতাল সফল করার জন্য। হরতাল সফল। তাদের বিজয় অনিবার্য। তসলিমার ফাঁসি হবে। ব্লাসফেমি আইন হবে। নতুন কর্মসূচি দিয়ে দিয়েছে, আজ বিকেলে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জামাতে ইসলামীর সমাবেশ আর বিক্ষোভ মিছিল, আজ থেকে ১৫ই জুলাই পর্যন্ত গণসংযোগ, ১৬ থেকে ৩১শে জুলাই পর্যন্ত থানায় থানায় ইমাম ওলেমা সম্মেলন, এই সময় পর্যন্ত দাবি পূরণ না হলে পরবর্তী আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। জামাতে ইসলামীর সভায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু কোরান ও আল্লাহ রসুলের অবমাননা সহ্য করবে না। বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন তসলিমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, অথচ ১২ কোটি মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার বিষয়ে কিছুই বলেননি। শায়খুল হাদীস বলেছেন যে দাবি পুরণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঘরে ফিরবেন না।
সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্র সমাজও মাসব্যাপী আন্দোলনের নতুন কর্মসূচির কথা ভাবছে। আরেকটি সুখবর ছাপা হয়েছে পত্রিকায়, নয়াদিল্লি থেকে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এসেছেন বাংলাদেশে, আমার নিরাপত্তার ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে কথা বলতে।
খবরটি দেখে ঝ বললেন, নরওয়ে শুনেছি অনেক টাকা বাংলাদেশকে সাহায্য দেয়। খালেদা জিয়া উল্টো পাল্টা করলে বিপদ আছে। তার ওপর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট স্বয়ং বিল ক্লিনটন বলেছেন তোমার নিরাপত্তা নিয়ে তিনি ভাবছেন।
–তাহলে কি জামিন হবে আমার? সরকার আমাকে নিরাপত্তা দেবে? মামলা তুলে নেবে? কিন্তু তা করলে তো মৌলবাদীরা সরকারকে খেয়ে ফেলবে।
