–আর কি?
–প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদের উত্থান ও প্রতিকার নামে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রে একটি সেমিনার হয়েছে। সেমিনারে বক্তারা মৌলবাদের উত্থানের জন্য বিএনপি সরকারকে দায়ি করেছেন। কবীর চৌধুরী বলেছেন, মৌলবাদীরা ধর্মের স্বার্থে নয়, নিজেদের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করছে। বাইরের একটি শক্তি এদের অস্ত্র আর অর্থ দিচ্ছে। এরা মানুষের রগ কাটছে। সরকার জেনেও এদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বরং যারা মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করছে। এভাবেই মৌলবাদের উত্থান ঘটেছে এবং এরা দেশকে এক ভয়াবহ সঙ্ঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেমিনার শেষে কবীর চৌধুরী, ওয়াজেদ মিয়া, মাওলানা সৈয়দ আবদুল্লাহ আল চিশতি, হাফেজ জিয়াউল হক বিশেষ মোনাজাত করেন।
–কবীর চৌধুরী মোনাজাত করেছেন?
বিস্ময়ে আমি হাঁ হয়ে থাকি।
–হ্যাঁ করেছেন। ঝর নির্লিপ্ত উত্তর।
–না, আমার মনে হয় না।
–বললাম তো করেছেন।
— দু হাত তুলে?
–হ্যাঁ দুহাত তুলে। ছবি ছাপা হয়েছে।
–ওদিকে মোল্লারা কি করছে?
–মোল্লারা অনেক কিছুই করছে। শহরগুলোয় তো মিছিল হচ্ছে সভা হচ্ছে। গ্রামের অবস্থা খারাপ। এনজিওগুলোয় যে মেয়েরা কাজ করত, এখন করতে ভয় পাচ্ছে। যাচ্ছে না। এনজিওর ইশকুলগুলোয় ছাত্রী সংখ্যা কমে গেছে। গ্রামের সব মানুষকে নাকি খ্রিস্টান বানানোর মতলব করছে এনজিওগুলো। তিরিশ তারিখের হরতালের সময় আশংকা করা হচ্ছে এনজিওর ওপর হামলা হবে।
–আর কি?
–আরও অনেক কিছু। এত জানতে চেও না। মাথাটাকে একটু হালকা রাখো ভাই। ঝ তাঁর জ্বালানো সিগারেটটি আমার দিকে বাড়িয়ে দেন।
সিগারেট খেতে খেতে সরকারি প্রেসনোটের কথা বলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক প্রেসনোটে বলা হয়েছে, সরকার বেশ কিছুদিন যাবৎ লক্ষ করছে যে কতিপয় ব্যক্তি ও সংগঠন প্রকাশ্যে বিভিন্ন সময়ে কোনও ব্যক্তির জীবননাশের হুমকি প্রদান এবং হত্যাকারীদের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে আসছেন। এ ধরনের ঘোষণা আইনের চোখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সরকার আশা করে যে এ ধরণের বেআইনী ঘোষণা প্রদান থেকে সংশ্লিষ্ট সকলে বিরত থাকবেন এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন। অন্যথায় সরকার তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য থাকবে।
সরকারের টনক কি নড়েছে! না নড়েনি, নড়লে এ পর্যন্ত যতগুলো মোল্লা আমাকে হত্যার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছে, তাদের ধরা হত। কাউকেই ধরা হয়নি। খুলনায় দাদার করা মামলার কিছু ফল পাওয়া যেত। তাও হয়নি। আইনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলার কি দরকার। আইনের ব্যবস্থাটি নিয়ে নাও না। ভবিষ্যতের ফতোয়ার জন্য অপেক্ষা করছ কেন বাবা! বর্তমানেই তো বহাল আছে ফতোয়া। প্রতিদিন মোল্লারা মিছিল মিটিংএ এই যে বলছে তসলিমার ফাঁসি যদি সরকার না দেয়, তবে তারা নিজেরাই দেবে ফাঁসি, তাদের ধরছো না কেন! সত্যিই কি ধরতে চাইছো! আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে চাইছো! না। চাইছো না।
ঙ এসেছেন রাতে। আমি অনেকগুলো প্রশ্ন করি একদমে, জামিনের খবর কি, কর খবর কি, ক আসছেন না কেন, উকিলের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ হয়েছে কি না কারও, আমার আত্মীয়রা বেঁচে আছে কি না, হরতাল হবে কি না ইত্যাদি ইত্যাদি। ঙ বলেন, জামিনের খবর তিনি জানেন না। ক ব্যস্ত, তাঁর চাকরি বাকরি আছে, তার ওপর মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনে নিজেকে জড়িয়েছেন। কর সঙ্গে একবার তাঁর কথা হয়েছে, ক বলেছেন যে তিনি দেখা করেছিলেন আমার উকিলের সঙ্গে, উকিল বলে দিয়েছেন হাইকোর্ট থেকে জামিন হবে এমন কোনও নিশ্চয়তা তিনি পাননি। ডঃ কামাল হোসেন দেশের অনেক জায়গায় গণফোরামের সভায় বক্তৃতা করছেন, মানুষকে মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলছেন। এখন তিনি দেশের বাইরে গেছেন একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে, তিনি না ফেরা পর্যন্ত জামিনের নতুন কোনও খবর পাওয়া যাবে না। আমার আত্মীয়দের কোনও সংবাদ ঙ পাননি। তাঁরা বেঁচে আছেন কি না এ সম্পর্কে ঙ কিছু জানেন না। হরতাল হবে বলে তিনি ধারণা করছেন, এবং দুদলের সঙ্ঘর্ষে অনেকের মৃত্যু হবে বলেও তিনি আশঙ্কা করছেন। ক আর ঙ যদিও দুজনই ব্যস্ত। ঙ ব্যস্ত সাংস্কৃতিক জোটের কর্মসূচি নিয়ে, বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিচ্ছেন। আমার কথা তিনি ভুলে থাকেন না, আমাকে দেখতে আসেন না, সে আমার নিরাপত্তার কারণেই আসেন না। ক আর ঙ দুজনেই চেষ্টা করেছেন নতুন কোনও আশ্রয়ের জায়গা পেতে, দুজনই ব্যর্থ হয়েছেন। এক বাড়িতে বেশিদিন থাকা আমার উচিত নয় তাঁরা জানেন। কিন্তু নতুন কোনও আশ্রয়ের জায়গা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। চেষ্টা তাঁরা থামিয়ে দেননি। আজও একজনকে অনুরোধ করেছেন ঙ, কাল তার উত্তর পাওয়া যাবে। ঙ আমার পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়েছেন। মনে জোর রাখতে বলেছেন। বলেছেন জামিন পাওয়া যদি সম্ভব না হয় তবে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথা আমি না চাইলেও আমাকে ভাবতে হবে। দিন দিন পরিস্থিতি অস্বাভাবিক রকমের খারাপ হচ্ছে দেশে। যে কোনও সময় যে কোনও মন্দ কিছু ঘটে যেতে পারে।
৩. অতলে অন্তরীণ – ২৭
তিরিশ জুন, বৃহস্পতিবার
আজ সারাদিন ঝ বাড়িতে। খুব তাঁর ইচ্ছে ছিল বাইরে মিছিলে যাবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বের হননি। সকলে বলছে দু দলের সঙ্ঘর্ষে অনেকে মরবে। সারাদিন থেকে থেকে মিছিলের স্লোগানের শব্দ শুনেছি, রাস্তা থেকে ভেসে এসেছে স্লোগানের শব্দ, তসলিমার ফাঁসি চাই। কেবলই মনে হয়েছে, এ বাড়িতে বুঝি ঢুকে যাচ্ছে সশস্ত্র এক দল লোক। এ ঘরের দরজা ভেঙে ঢুকে যাচ্ছে ওরা। ঢুকে যাচ্ছে। ঢুকে গেল। গেল। সারাদিন গা কেঁপে কেঁপে উঠেছে। সারাদিন শ্বাস নিতে গিয়ে দেখি শ্বাস থেমে থেমে যাচ্ছে।
