ঝ বললেন, ও তো টেনশন করছে খুব। খাচ্ছে না, ঘুমাচ্ছে না। বলেছি, সিগারেট খাও, টেনশন কমবে।
জ বললেন, সিগারেট খেলে তো আরও ক্ষতি হবে। কিন্তু খাবার খাচ্ছে না কেন? –খেতে নাকি ইচ্ছে করে না। আমার এমনিতে লুকিয়ে ভাত আনতে হয়। কেউ দেখে ফেললে বলি যে ওঘরে আমি ভাত নিয়ে যাচ্ছি খেতে। এটা তো সবসময় করা যায় না। আমার ভয় হয় ওদের না আবার কোনও সন্দেহ হয়।
–কিছু বিস্কুট টিস্কুট তো এঘরে রেখে দিলে খেতে পারে। ভাত আনতে যদি অসুবিধা হয়।
ঝ বললেন, এটা ভাল কথা বলেছেন। কাল থেকে কলা বিস্কুট এসব এনে দেব।
জ বললেন, আমি জানলে কিছু নিয়ে আসতে পারতাম।
আমি শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকি দেয়ালের দিকে। জ বললেন, শোনো, কিছু খেতে তো হবে তোমাকে। শরীর তো এ কদিনে অনেক শুকিয়ে গেছে। না খেলে চলবে কি করে? বেঁচে থাকতে হবে না!
খাওয়া দাওয়ার গল্প আমার ভাল লাগে না। জর কাছে জানতে চাই ঙর সঙ্গে তাঁর দেখা বা কথা হয়েছে কি না।
জ বললেন যে একবার শুধু ফোনে কথা হয়েছে। ঙ ব্যস্ত সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট নিয়ে, আন্দোলন নিয়ে। আমাকে যে এখানে রেখে গেছেন তা জানিয়েছেন জকে। জকে বলেছেন যেন আমাকে এখানে দেখতে আসেন।
–ঙ কি আসবেন না?
জ বললেন, নিশ্চয়ই আসবেন। হয়ত সুযোগ পাচ্ছেন না, তাই আসছেন না। কখন যে কে কার পিছু নেয়, তা বলা মুশকিল। আমিই এসেছি ভীষণ ভয়ে ভয়ে। বার বার রিক্সাথামিয়েছি, কেউ আমাকে ফলো করছে কি না দেখেছি। রিক্সা ঘুরিয়ে এনেছি, সোজা আসিনি।
আমার কণ্ঠস্বরটি, বুঝি আমি, খুব ম্লান। স্বর বেরোতে চায় না। কথা বলতে নিলে খড়খড়ে হয়ে থাকা গলাটি জ্বলতে থাকে। যেন ঘা হয়ে গেছে গলনালীতে। নিজের কাছেই অচেনা লাগে নিজের স্বর।
জ আমাকে কথা দেন যে তিনি ঙর বাড়ি গিয়ে হলেও বলে আসবেন যেন তিনি একবার আসেন আমার কাছে।
ঝ তিরিশ তারিখের হরতাল সম্পর্কে জর মত জানতে চান। জ নিজের কোনও মতের কথা না বলে বললেন, আজ আওয়ামী লীগ মিছিল বের করেছে।
–সত্যি!
–সত্যি।
ঝ মুষ্ঠিবদ্ধ দুহাত ওপরে তুলে জয়ধ্বনি করলেন।
–শেখ হাসিনা ছিল মিছিলে? ঝর প্রশ্ন।
জ বললেন, না, নেত্রী ছিলেন না। তবে আবদুর রাজ্জাক, আমীর হোসেন আমু এরকম কয়েকজন ছিলেন নেতা।
–অগত্যা মধুসূদন! নামবিই যখন আগে নামলি না কেন!
জ বললেন, নামার তো ইচ্ছে ছিল না, ছাত্রলীগের নেতার খুব ক্ষেপে যাচ্ছিল, আওয়ামী লীগ সাপোর্ট করছেন যে বুদ্ধিজীবীরা, তাঁরা তো ভীষণ রাগ করছিলেন হাসিনার ওপর। হাসিনা শেষ পর্যন্ত মনে হয় বুঝেছে যে এভাবে জামাতকে নমো নমো করে খুব একটা সুবিধে করতে পারবে না। নিজেদের সাপোর্ট যে তারা অলরেডি হারাতে শুরু করেছে, টের পেয়েছে।
ঝ আমার দিকে চেয়ে হেসে বললেন, এ তো তোমার জন্য ভাল খবর। মোল্লাদের সাথে ফাইট করার দল চলে এসেছে।
জ ঠোঁট উল্টে বললেন, এখন কিছু বোঝা যাচ্ছে না অবস্থা কোথায় দাঁড়াবে। আওয়ামী লীগের মধ্যে এমন অনেকে আছে যারা চাইছে না পথে নামতে। এতে নাকি কিছু অসুবিধে আছে। প্রথম হল লোকে ধারণা করতে পারে যে আওয়ামী লীগ তসলিমার পক্ষে, এর মানে নাস্তিকতার পক্ষে। মোল্লাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামা মানে তসলিমার পক্ষ নেওয়া। আওয়ামী লীগের কেউ তসলিমা নামের সঙ্গে যুক্ত হতে চায় না। আওয়ামী লীগ বহু কষ্টে তার ধর্মনিরপেক্ষতার দুর্নাম ঘুচিয়ে এখন দিনরাত আল্লাহু আকবর জয় বাংলা বলছে। আর একটু ডোজ পড়লেই জামাতের মত বলবে নারায়ে তকবীর আল্লাহুআকবর। আমার মনে হয় না আওয়ামী লীগ দলীয় ভাবে নেমেছে আন্দোলনে, হয়ত হাতে গোনা কজন নেতা কেবল সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্রদলের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে।
ঝ বলতে নিচ্ছিলেন, মেইন তো হল জামাতকে সাথে নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করা..
জ সায় দিয়ে বললেন, হ্যাঁ জামাত আর জাতীয় পার্টিকে সাথে নিয়ে সরকার পতনের আন্দোলন বেশ জমিয়ে করার ইচ্ছে। এখন জামাতের বিরুদ্ধে নামা মানে হাত থেকে জামাত ফসকে যাওয়া। এটাতে দলের অনেকে নাখোশ।
আজ ছাত্রদের জঙ্গী মিছিলের খবর দিলেন জ। গোলাম আযমের ফাঁসি কার্যকর ও ফতোয়াবাজদের উচ্ছেদ করতে ৩০ জুন দেশব্যাপী সকাল সন্ধ্যা হরতাল/ সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্র সমাজ এই ব্যানার নিয়ে ছাত্রদের একটি মিছিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে প্রেসক্লাবের কাছে গিয়ে মুখোমুখি হয় ইয়ং মুসলিম সোসাইটির। ইয়ং মুসলিম সোসাইটি ওখানে বিক্ষোভ সমাবেশ করছিল। তখনই ছাত্ররা ধর মৌলবাদীদের, ধররাজাকারদের বলে ইয়ং মুসলিমদের ওপর হামলা চালায়। সমাবেশে যে চেয়ার ছিল, ওগুলো তুলে তুলে ছাত্ররা ইয়ং মুসলিমদের নেতাদের মারধোর করে, হঠাৎ করে ধাওয়া আর বেধড়ক মার খাওয়ার ফলে সোসাইটির লোকেরা প্রেসক্লাব চত্বর ছেড়ে সচিবালয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে। তারাও দূর থেকে ঢিল ছুঁড়তে থাকে ছাত্রদের দিকে। ছাত্ররাও পাল্টা ঢিল ছোঁড়ে। পুলিশ এসে এরপর ছাত্রদের লাঠিচার্জ করে, কিছু ছাত্রনেতাকে আহত করে, ওদিকে পুলিশের সহযোগিতায় ইয়ং মুসলিম সোসাইটির লোকেরা পালিয়ে যায়। এই সংঘর্ষের সময় ওখানে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, দোকানীরা দোকানের ঝাঁপ ফেলে দেয়, পথচারীরা নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োতে থাকে। বুধবারেও এরকম ছাত্র পুলিশ সংঘর্ষ চলেছিল, পুলিশ রমেন মণ্ডল নামের এক ছাত্রকে ধরে নিয়ে গিয়েছে। সংঘর্ষ আরেকটি প্রায় বাধে বাধে ছিল। গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করেছে, ইসলামী শাসনতন্ত্রের মিছিল থেকে শ্রমিকদের ওপর হামলা শুরু করতে নিলে পুলিশ দু দলের মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
